সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনায় জন-অংশগ্রহণ

মানুষের মৌলিক মানবিক চাহিদার আওতাধীন সুনির্দিষ্ট কাঠামোর অন্তর্গত অন্যতম একটি বিষয় হলো সবার জন্য পর্যাপ্ত ও সমতাভিত্তিক স্যানিটেশন। এজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যবিধিসম্মত জীবনরীতিতে অভিগম্যতা নিশ্চিত করা। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)-এর ১৭টি অভীষ্টের ষষ্ঠ অবস্থানে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের কথা সবিস্তারে বিধৃত রয়েছে। সেখানে সবার জন্য পানি ও স্যানিটেশনের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে। আটটি উপলক্ষ্য মাত্রার সঙ্গে সঙ্গে কর্মসম্পাদন পরিমাপকল্পে প্রস্তাবিত আটটি বৈশ্বিক সূচকের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সেগুলো বিশেষ তাত্পর্য ও গুরুত্ব বহন করে।

আমাদের চারপাশের পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে পানির প্রয়োজনীয়তা যেমন অপরিহার্য, তেমনি জীবনের সর্বত্র পানির ব্যবহার অনস্বীকার্যভাবে বর্তমান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের জীবনের অত্যাবশ্যকীয় ও জরুরি এই উপাদান আজ হুমকি ও বিপর্যয়ের মুখে।

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে বর্ষা মৌসুমে পানির আধিক্যে জলাশয়গুলো টইটুম্বুর থাকে; কিন্তু শুষ্ক সময়ে পানির অভাবে আবার কৃষিকাজ ব্যাহত হয়। নদনদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়ে সারা বছর ধরে কমবেশি পানি বিদ্যমান থাকলেও, সেই পানি একটুও সুপেয় নয়। ফলে আমাদের খাবার ও কৃষিকাজে ব্যবহার্য পানির প্রধান উত্স হয়ে পড়েছে ভূগর্ভস্থ পানি। বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় বড় শহরই এই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল।

ভূপৃষ্ঠের নিচের পানি উত্তোলন করেই কেবল ঢাকা শহরের ৭৮ শতাংশ পানির চাহিদা মেটানো হয়। ২০২১ সালের একটি মাঠ জরিপ অনুসারে ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ সাপ্লাই, ৫ দশমিক শূন্য শতাংশ নলকূপ, ৬১ দশমিক শূন্য শতাংশ সাবমার্সিবল পাম্প এবং শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বোতলজাত প্রভৃতি উত্স থেকে পানির ব্যবহার হয়েছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক যে পানি আইন গৃহীত হয়েছে, সেখানে পানির তিনটি উেসর কথা উল্লেখ করা হয়েছে–১. বৃষ্টির পানি; ২. ভূ-উপরিস্থ পানি ও ৩. ভূগর্ভস্থ পানি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, পানির প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে বিরূপ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। সে কারণে যে পরিমাণ বৃষ্টির পানি পাওয়ার কথা, সেই পরিমাণ পানি আমরা পাচ্ছি না।

নেত্রকোনা-সুনামগঞ্জ অঞ্চলে ৮০০ ফুট গভীরেও পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর পানিতে ক্লোরিনের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে গভীর নলকূপ স্থাপনের কয়েক বছরের মাথায় সেখানে লবণাক্ত পানি উঠছে।

বর্তমানে শহরাঞ্চলে সরবরাহকৃত পানির প্রায় ৮০ শতাংশই যথাযথভাবে পরিশোধন করা হয় না। পরিণামে নগরবাসীর জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির দিকে চলে যাওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও হুমকি ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে যাচ্ছে। নিরাপদ ও দূষণমুক্ত বিশুদ্ধ পানি পাওয়া একটি মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রায় ৪ কোটি জনগোষ্ঠী আজও সেই নিরাপদ পানির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবাহিত ২৪ হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীর পানি ব্যবহারোপযোগী ছিল। কিন্তু গভীর পরিতাপের বিষয় হলো, মানুষের বাছবিচারহীন ও যাচ্ছেতাই কর্মকাণ্ডের দরুন সেই নদীর পানিও দিনে দিনে দূষিত হয়ে যাচ্ছে। এখন একের পর এক জলাশয়সমূহ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কোথায় কী হবে, তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো।

মানুষের শ্মশ্রুমুণ্ডন ও দাঁত মাজা-পরবর্তী মুখ ধোয়ার পেছনে সারা বিশ্বে প্রতি মিনিটে জনপ্রতি দুই গ্যালন পানি খরচ হয়। বাথরুমে ব্যবহার্য পানির ঝরনার গতি কমিয়ে প্রতি মাসে ৮০০ গ্যালন পানি অপচয় রোধ করা যেতে পারে। একইভাবে ছিদ্র হওয়া পাইপ মেরামত করে প্রতি সপ্তাহে পরিবারপ্রতি ১৪০ গ্যালন পানি বাঁচানো যেতে পারে। বাংলাদেশের নগরাঞ্চলের লোকজন বৈশ্বিক গড় হিসাবের চেয়ে বেশি পরিমাণে পানি ব্যবহার করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বের মাঝারি জলবায়ুপ্রবণ দেশগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ লিটার পানি ব্যবহার করা হয়। প্রকারান্তরে, বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের দৈনিক ব্যবহূত পানির গড় পরিমাণ ২৯১.৮১ লিটার, যেখানে টেকসই পানি ব্যবহারের নির্ধারক ২২০ লিটার। কাজেই দেখা গেল, আমাদের নগরাঞ্চলের লোকজন দৈনিক ৭৮.৮১ লিটার বা তার চেয়েও বেশি পরিমাণ পানি অপচয় করে।

নগরাঞ্চলে বস্তিবাসী জলাশয়ের পানি ব্যবহার করে আর বিত্তবানেরা লেকে স্যুয়ারেজের লাইন সংযুক্ত করে। গরিব মানুষ মুখ ধোয়ার সময় এক মগ পানিই নেয় আর ধনী লোক বেসিনে ট্যাপের পানি ছেড়ে দাঁত ব্রাশ করে। অর্থাত্, পানির প্রাপ্যতা ও ব্যবহারে এমন বৈষম্যের পেছনে পানির সু্ষ্ঠু ও সমন্বয়হীন অব্যবস্থাপনা এবং জনগণের জবাবদিহির অভাবই দায়ী, যা থেকে জরুরি উত্তরণ দরকার।

পানির সংকট তৈরিতে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় রেখে জন অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণসহ সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষ ও অংশীদারদের ভূমিকা পালন করা উচিত। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ও কৃষি অধিদপ্তরের যূথবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ও কর্মকৌশল এক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার মূল স্লোগান হলো :‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’; অর্থাত্ ‘কাউকে পিছিয়ে রাখা যাবে না।’ সুতরাং, আমরা যদি এসডিজি অর্জন করতে চাই, তাহলে জনগণের অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। আর পানি ব্যবস্থাপনায় আমাদের দেশে কমবেশি ১৩টি মন্ত্রণালয় সম্পৃক্ত। কৃষি মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়সহ আন্তঃমন্ত্রণালয়সমূহের মধ্যে সমন্বয় না হলে এসডিজি-৬ (নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন) অর্জন সুদূর পরাহতই থেকে যাবে।

নাগরিক হিসেবে আমাদের সবাইকে এ ব্যাপারে যত্নবান হওয়া উচিত। পানির অপচয় রোধ করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভশীলতা কমিয়ে এবং দূষিত পানি পরিশোধন ও রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে আমরা পুনর্ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে পারি। শিল্প কারখানাসমূহে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহার করতে পারলে ব্যাপক মাত্রায় পানির সাশ্রয় হবে। কলকারখানাগুলোতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অনেক জায়গা থাকে, সেগুলোতে বৃষ্টির পানি আটকে রাখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পানি প্রবাহের যে পাইপলাইন আছে, সেগুলো নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে আরো কর্তব্যপরায়ণ হতে হবে। আমাদের পানির ১০ শতাংশ খাবারের ক্ষেত্রে আর ৯০ শতাংশ যদি কৃষি, কলকারখানা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করি, তাহলে পানির সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন ও প্রাপ্যতা তথা সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়িত হতে পারে।

যদি সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে ওঠে, তাহলে ব্যাপক হারে এর সুফলও পাওয়া যাবে। খুলনার কয়েকটি এলাকায় বছরে একটি ফসলও হতো না। সুষ্ঠু পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হওয়ার পরে সেখানে এখন ফি বছর তিন-তিনটি ফসল হয়। পাইকগাছায় এখন সেচ দিতে গভীর নলকূপের দরকার হয় না। বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেই অঞ্চলের লোকজন তাদের সেচকাজ চালাতে শুরু করেছেন। আর এ সবই সম্ভব হয়েছে পানির সুষ্ঠু ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের ফলে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়