রাশেদ ভাইয়ের নামে ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন

সুদিপ্ত কুমার নাগ

 

রাশেদ আমাদের ব্যাচমেট কিন্তু তাকে সবাই মিলে একটু মজা করে রাশেদ ভাই বলে ডাকি। ‘ভাই’ ডাকলে সে খুব খুশি হয়। আর এই খুশিতেই সে ট্রিট দেয়। ভার্সিটি জীবনে বড় ভাইদের কাছ থেকে ট্রিট নেওয়াতে যত মজা তার থেকে বেশি মজা ব্যাচমেটদের কাছ থেকে ট্রিট নেওয়াতে। আর আমাদের ব্যাচের সবার টার্গেট রাশেদ ভাই।

যখন আমরা তৃতীয় সেমিস্টারে উঠলাম, তখন ক্যাম্পাসে আমাদের নতুন জুনিয়র এল। নতুন জুনিয়রদের নিয়ে শুরু হলো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের রিহার্সেল। এই রিহার্সেলে বিভিন্ন নাচের গান সাউন্ড বক্সে বাজানোর দায়িত্ব ছিল রাশেদ ভাইয়ের। আমরা প্রতিদিন রিহার্সেলে সাধারণ জামা পরে যেতাম কিন্তু রাশেদ ভাই যেত পাঞ্জাবি পরে অথবা ফরমাল ড্রেস পরে। আমরা বন্ধুরা মিলে সেসময় রাশেদ ভাইকে নিয়ে আমাদের ভার্সিটির ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন পেজে কনফেশন বের করলাম। রাশেদ ভাই খুশিতে ট্রিট দিল। তারপর সে খুঁজে বেড়াতে লাগল যে, কোন মেয়ে তার নামে ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন লিখেছে, কিন্তু সে কিছুই খুঁজে পায় না। আর খুঁজে পাবেই বা কিভাবে? কারণ এটা তো আর মেয়েরা লিখেনি। এটা লিখেছিলাম আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে। রাশেদ ভাই যখন মেয়ে খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছে, সেসময় আমি তার পাশে দাঁড়াই। আমি তাকে বললাম, ‘যে মেয়ে আপনার নামে ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন লিখেছে, তাকে খুঁজে দিব, কিন্তু তার আগে আমাকে চাইনিজ খাওয়াতে হবে।’ শর্তানুযায়ী সে আমাকে চাইনিজ খাওয়াল। আমিও রাশেদ ভাইকে আমাদের দেশের তদন্ত কমিটির মতো আশ্বাস দিতে লাগলাম যে, কাজ চলছে এবং অতি দ্রুত তাকে খুঁজে বের করা হবে। আমাদের দেশের তদন্ত কমিটির মতো এরকম বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বারবার তার কাছ থেকে সময় বাড়িয়ে নিতে লাগলাম আর ট্রিট নিতে লাগলাম। শেষে আমি তাকে একজন জুনিয়র মেয়ের নাম বললাম। এরপর রাশেদ ভাই প্রপোজ করার সঙ্গে সঙ্গে সেই মেয়েটা তাকে ব্লক মারল। আমি রাশেদ ভাইকে বললাম, ‘সরাসরি প্রপোজ করলে তো ব্লক মারবেই। আগে ধীরে সুস্থে আলাপচারিতা করেন, তারপর প্রপোজ করবেন।’ এভাবে তৃতীয় সেমিস্টারে থাকা অবস্থায় আরো কয়েকবার রাশেদ ভাইকে নিয়ে আমরা সবাই ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন বের করে মজা নিলাম।

 

দুই.

যখন আমরা পঞ্চম সেমিস্টারে উঠলাম, তখন আবারও একটা নতুন জুনিয়র ব্যাচ এল। আবারও সেই রিহার্সেল শুরু হলো এবং যথারীতি রাশেদ ভাইকে নিয়ে ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন বের করা হলো এবং বড়সড় আকারের ট্রিট নেওয়া হলো। এবার রাশেদ ভাই আমাকে দায়িত্ব দিয়ে বলল, ‘তুই এবার খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সেই মেয়েকে খুঁজে দিবি যে আমার নামে ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন লিখেছে।’ আমি বললাম, ‘তাহলে কিন্তু আগের থেকে আরো বড় আকারের ট্রিট লাগবে।’ যথারীতি একনাগাড়ে কয়েকদিন রাতে রাশেদ ভাইকে ভেঙে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে চাইনিজ আর বিরিয়ানি খেলাম। তারপর আবারও জুনিয়র একজন মেয়েকে দেখিয়ে দিলাম এবং সেই মেয়ের বয়ফ্রেন্ড আছে সেটা রাশেদ ভাই ছাড়া ক্যাম্পাসের সবাই জানে। এবার সে ওই মেয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে চ্যাট শুরু করল এবং কিছুদূর এগোনোর পরেই ব্লক খেল। ব্লক খাওয়ার পর মনখারাপে রাশেদ ভাই কয়েকদিন ক্লাসে আসা বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপরে আমরা আবারও তার নামে ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন বের করলাম এবং এবার সে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলো। যথারীতি সে আমার কাছে এল এবং আমি তাকে বললাম যে, এবার নিজ দায়িত্বে খুঁজে নিতে হবে এবং এই সামান্য কাজ যদি না পারেন তাহলে ভবিষ্যতে বিয়ের পর বউকে সামলাবেন কিভাবে? রাশেদ ভাই মেয়ে খুঁজতে খুঁজতে আরেকটা সেমিস্টার চলে গেল কিন্তু সে আমাদের দেশের তদন্ত কমিটির মতো কিছুই অনুমান করতে পারল না!

 

তিন.

কয়েকদিন আগে দেখি যে, হঠাত্ করে রাশেদ ভাইয়ের নামে ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন এসেছে। এবার তো আমরা সবাই অবাক! প্রতিবার আমরা এই ভুয়া কনফেশন লিখে পাঠাই, কিন্তু এবার কে এই কাজ করল? বন্ধুরা মিলে ক্যাফেটেরিয়াতে যেয়ে দেখি যে, ফার্স্ট সেমিস্টারের জুনিয়র মেয়েরা রাশেদ ভাইয়ের কাছ থেকে ট্রিট নিচ্ছে। পরে জানতে পারলাম যে, জুনিয়ররাও জেনে গেছে যে, রাশেদ ভাইয়ের নামে এরকম ভুয়া ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন বের করে ট্রিট নেওয়া যায়। সেমিস্টার ফাইনাল শেষে আমরা সবাই বাড়ি চলে এলাম কিন্তু রাশেদ ভাই বাড়ি এল না। সে ক্যাম্পাসে বসে আমাদের দেশের তদন্ত কমিটির মতো ভুয়া ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। আমরা সব বন্ধুরা বাসায় আসার সময় রাশেদ ভাইকে বলে এলাম, ‘ভাই, আপনি সেই মেয়েকে খুঁজতে শুরু করেন এবং বাসায় যাওয়ার কোনো দরকার নেই। আর মাথায় রাখবেন যে, একবার না পারিলে দেখ শতবার। আপনি খুঁজতে শুরু করেন, অবশ্যই সেই মেয়েকে খুঁজে পাবেন।’ আশা রাখা যায়, রাশেদ ভাই ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশনের লেখককে খুঁজতে খুঁজতে শার্লক হোমস ও মাসুদ রানার থেকেও বড় মাপের গোয়েন্দা হয়ে যাবে কিন্তু এর কোনো কূল-কিনারা বের করতে পারবে না!

আমরা সবাই এখন বাসায় বসে মুভি দেখে সেমিস্টার ফাইনাল শেষ হওয়ার ছুটি কাটাচ্ছি এবং ভালোমন্দ খাচ্ছি আর রাশেদ ভাই ক্যাম্পাসে বসে ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন নিয়ে তদন্ত করছে এবং ডাইনিংয়ের পাতলা ডাল খেয়ে স্বাস্থ্য বৃদ্ধি করছে!