ভুল গাড়িতে চড়া
একদিন গাড়ি রেখে উত্তরার মীনা বাজারে গিয়েছিলাম বাজার করতে। বাজার করা শেষ করে গাড়িতে উঠে দেখি ভেতরে থাকা এক মহিলা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলছে, ‘এক্সকিউজ মি! এটা আমাদের গাড়ি।’ ভালো করে তাকিয়ে দেখি—আরে তাই তো, ভুল গাড়িতে উঠে পড়েছি!
আরেক দিনের কথা। ভাড়া করা গাড়ি দিয়ে যাচ্ছিলাম সেদিন। গাড়িতে উঠলে ড্রাইভারের দিকে তাকানো হয় না সাধারণত। সেদিনও তাই হয়েছিল। পথে কী জন্য যেন নামতে হয়েছিল মনে নেই। কাজ শেষ করে গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বললাম, ‘যান ভাই।’ সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, ‘তাকিয়ে আছেন কেন, যান?’ ড্রাইভার আমতা আমতা করে বলল, ‘আসলে... ম্যাডাম আপনি মনে হয় ভুল গাড়িতে চড়েছেন।’ তখন ভালো করে দেখে বুঝতে পারি, আসলেই ভুলের রাজ্যে চলে গিয়েছিলাম আমি।
এ ভুল ভুল নয়, আরো ভুল আছে
ভুলে অন্য নাটকের শুটিংয়ে ঢোকার ঘটনা স্বাভাবিক। দেখা গেল ৪ তালা বাড়ি। সব ফ্লোরেই শুটিং হচ্ছে। মেকআপ রুমে ঢুকে দেখি, অন্য নাটকের অন্য আর্টিস্টরা সেখানে। তবে অসুবিধা হয়নি। কারণ, শিল্পীরা তো সব চেনাই থাকে। আমরা আমরাই তো, তাই না?
শুটিং নিয়ে কূটনীতি
একবার অনিমেষ দার একটা কাজ করতে গিয়েছি। দৃশ্যটা হলো পুকুরে ডুব দিতে হবে। গিয়ে দেখি পুকুরটা খুবই পচা। দেখেই মনে হয়, এ পুকুরে কেউ নামে না। কতটুকু নামব, কোথায় গিয়ে শট দেব, সেটা দেখতে দুজন নেমেছে আগে। তারা দেখলাম, পুকুরে নেমে নাক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ধারে কাছে দু-একটা পুকুর আছে। কিন্তু অনিমেষ দার ওই পুকুরই লাগবে। কী যে অবস্থা! এই পুকুরে যে শুধু ডুব দিতে হবে, তা না। ডুব দিয়ে উঠে আবার হাসতে হাসতে জবা ফুল দিতে হবে। শুধু যে তাই, তাও না। পুকুরে নেমে দেখি, কাদা ভরা পুকুরে হাঁটু পানি। ডুব যে দেব, সেই পানিটাও নেই। হাঁটু গেড়ে বসে ডুব দিয়ে উঠতে হবে। এটা করতে খবর হয়েছিল সেদিন।
এই নাটকেরই আরেকটা দৃশ্যের কথা বলি। শুটিং হচ্ছিল নেত্রকোনায়। আমি মরা মরা অবস্থায় পড়ে আছি একটা গর্তের মধ্যে। প্রচণ্ড গরমে সত্যিই প্রাণ যায় যায় অবস্থা। তার মধ্যে হাতে গুড় মেখে রাখা হয়েছে, যাতে পিঁপড়া আসে। দুপুরে কড়া রোদে ওই অবস্থায় বসে আছি তো আছিই। আমার আর শট নিচ্ছে না। এভাবে ঘণ্টা তিনেক যাওয়ার পর অ্যাসিস্টেন্টকে বিরক্ত হয়ে বললাম, আমাকে এভাবে কেন বসিয়ে রেখে অন্য জায়গায় শুট করা হচ্ছে?
অনেকদিন পর যখন নাটকটার শো হচ্ছে, সেদিন অনিমেষ দা বলল আসল কাহিনি। সেদিন ৩/৪ ঘণ্টা ওই অবস্থায় ফেলে রাখার কারণ হচ্ছে, যাতে ক্যামেরায় আমার আধমরা চেহারাটা আসে। অথচ একটু পর পরই বলছিল, এই তো আর একটু পরই শটটা নেব। তখন যে কেমন লেগেছিল, কী কষ্টের ছিল সময়টা। সারা শরীরে ধুলা, চোখে কালি, কাদা মাখা, ছেঁড়া কাপড়, পিঁপড়া হাঁটছে শরীরে, এ অবস্থায় ছিলাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমি কেঁদেই দিয়েছিলাম। সেসব কথা, এখন মনে পড়লে তো হাসিই আসে।
বিড়ম্বনার গল্প
মায়া ছবির কাহিনিটা ছিল একটা গরু দিয়েই আমাদের সংসার চলে। শুটিংয়ে আমাকে গরুর দুধ দোয়াতে হবে। প্রথমেই শিখে নিলাম, কিভাবে দুধ দোয়াতে হবে। কিন্তু গরুর কাছে যেতে পারছিলাম না। প্রায় ঘণ্টা খানেক ধরে ইউনিটের সবাই মিলেও গরুটাকে পজিশন মতো আনতে পারছিল না। দুধ দোয়ানো তো পরের কথা। এভাবে তো আর সারা দিন পার করে দেওয়া যায় না। ঠিক হলো আর দেরি না করে ক্লোজ শট নেওয়া হবে। শটটা হলো গরুর বাট থেকে দুধ নেওয়া হচ্ছে। তখন গরু এমন ক্ষেপা ক্ষেপল, যার গরু সেও আর কাছে যেতে পারছে না। কত জোড়া তালি দিয়ে যে শটটা করতে হয়েছিল।
গরুর গুঁতা কিংবা লাত্থি খাওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে। একবার লাভলু ভাইয়ের এক নাটকে ঘটেছিল সেই ঘটনা। নাটকটার নাম ফুলমালা। একটা গরু আমার সব সময়ের সাথি। সেই গরুটার নাম ফুলমালা। ছয়দিনের প্রতি দিনই ছিল ফুলমালার সাথে শুটিং। ওই সময় ওইটার লাত্থি খেয়েছি।
‘মায়া’ ছবির আরেকটা দৃশ্যের কথা বলি। খুবই রোমান্টিক দৃশ্য। আমার যার সাথে প্রেম, সে গরুর গোয়াল ঘরেই থাকে। ওর সাথে আমার পরকীয়ার সম্পর্ক। রাতে যাই ওর ঘরে। ঘরটা খুবই ছোট। ছোট একটা খাট। খাটের পাশেই গরু। দুজন দুজনার খুব ক্লোজ হচ্ছি। মুখের কাছে মুখ। ঠিক ওই সময় গরু দিলো হিসু করে। সেই হিসু ছিটে আমাদের গায়ে।
ছিনতাইকারী না ভক্ত!
আমি তখন উত্তরায় থাকি। একদিন রাতের বেলায় রিকসায় বাসায় যাচ্ছি। হঠাত্ একটা ছেলে দৌড়ে রিকশার সামনে এসে দাঁড়াল। ভাবলাম, ছিনতাইকারী না তো। সে সামনে এসে বলল, জ্যোতিকা আপু, আমার বাড়ি ময়মনসিংহ। আপনার নাটক আমার খুব ভালো লাগে। সেদিন আসলেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলাম।
অনুলিখন সত্যজিত্ বিশ্বাস