ব্যাংকিং মাধ্যম ও কার্ব মার্কেট প্রসঙ্গ

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা শুরু হয়েছিল। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ব্যাপক আকার ধারণ করে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। এটা ছিল বিগত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতেও মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক উচ্চতায় উপনীত হয়েছিল। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যে মডেল অনুসরণ করে মূল্যস্ফীতি কমিয়েছে, আমরা সেই মডেল অনুসরণ করিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এত দিন বলে এসেছেন, আমরা মূল্যস্ফীতি আমদানি করেছি। কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী পণ্য পরিবহনব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ যেহেতু একটি আমদানিনির্ভর দেশ। তাই বিশ্ববাজারের গতি-প্রকৃতি দ্বারা আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রভাবিত হয়ে থাকে। বিশ্ববাজার থেকে আমাদের উচ্চমূল্যে পণ্য আমদানি করতে হয়েছে। উচ্চমূল্যে আমদানিকৃত সেই পণ্য আমাদের দেশের মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা মূল্যস্ফীতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। তার বক্তব্য আংশিকভাবে সত্য।

আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে বৈদেশিক মুদ্রা, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের সংকটও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলা না করতে পারার পেছনে আমাদের অদক্ষতা অনেকটাই দায়ী। আমরা প্রায়শই বলে আসছি, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক। কিন্তু বাস্তবে তা বাজারভিত্তিক নয়। এই বাজারব্যবস্থা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। যদি বাজারের চাহিদা মোতাবেক বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ না করা যায়, তাহলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। যেমনটা ডলারের বিনিময় হারের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ করছি। আনুুষ্ঠানিক ও অ-আনুুষ্ঠানিক বাজারে ডলারের দুই ধরনের বিনিময় হার অনেক দিন যাবত্ বিরাজ করছে। অ-আনুুষ্ঠানিক বাজারের বিনিময় হার আনুুষ্ঠানিক বাজারের বিনিময় হার অপেক্ষা অনেক বেশি।

ব্যাংকিং (আনুুষ্ঠানিক) মাধ্যমের তুলনায় কার্ব মার্কেটে (অনানুুষ্ঠানিক) ডলারের মূল্যের এই বিরাট পার্থক্যের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিটেন্স না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে তা দেশে পাঠিয়েছেন। মানুষ যখন কোনো আর্থিক লেনদেন করে, তখন তার উদ্দেশ্য থাকে কীভাবে সেখান থেকে বেশি অর্থ পাওয়া যায়। এখানে নৈতিকতার প্রশ্নটি গৌণ। বৈদেশিক মুদ্রার মালিক চিন্তা করবেন না যে তার এই অর্থ কার্ব মার্কেটে বিক্রি করলে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হবে। সে তার নিজের লাভের বিষয়টিতেই বেশি গুরুত্ব দেবে। আমাদের দেশে সেই ব্যাপারটিই ঘটেছে।

নীতি-নির্ধারকেরা যদি ডলারের বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিতেন, তাহলে সমস্যা এতটা জটিল হতো না। আবার কোনো কারণে বাজার যদি অস্বাভাবিক অবস্থার দিকে চলে যেত, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক তখন হস্তক্ষেপ করতে পারত। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তা না করে কৃত্রিমভাবে ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং সংকট তীব্রতর হয়েছে। বাজারে ডলারের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। আমাদের সেই বাড়তি মূল্যে ডলার কিনে তা দিয়েই পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। ফলে প্রতিটি আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য অনেক বেড়ে গেছে। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে।

তাছাড়া বাজার পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষেত্রবিশেষে বাজার পর্যবেক্ষণে সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। বাজারে একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করে। সেই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রায়শই সম্ভব হয় না। কারণ এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতরা অনেকেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী অথবা প্রভাবশালীদের আশ্রয়ী। ক্ষেত্রবিশেষে রাজনীতি-ব্যবসায় একাকার হয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার লোকজন অনেক সময় বাজার পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এসব রাঘববোয়লের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

যারা বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন, তারা মাঝেমধ্যে বেফাঁস মন্তব্য করেন। এতে বাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তারা যখন বলেন, বাজারে আর কোনো পণ্যের দাম বাড়বে না, দেখা যায় তার পরদিন থেকেই সেই পণ্যের দাম বাড়তে থাকে। কর্তাব্যক্তিদের কথার প্রতিক্রিয়া হয় উলটো।

অনেকেই বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ কমে গেছে। আসলে এটা ঠিক নয়। কারণ আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর যে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান উপলক্ষ্যে বিদেশে যাচ্ছেন, তারা প্রায় সবাই প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ। তাদের পরিবার-পরিজন এ দেশেই থাকে। দেশে থাকা পরিবারের জন্য প্রবাসীরা সব সময় অর্থ পঠিয়ে থাকেন। তার অর্থ হচ্ছে, রেমিট্যান্স ঠিকই দেশে আসছে, কিন্তু তার একটা বড় অংশ অবৈধ মাধ্যমে আসছে।

বৈধ মাধ্যমে রেমিট্যান্স দেশে না আসার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। কিছু কারণ দীর্ঘদিনের আর কিছু তাত্ক্ষণিক। তাত্ক্ষণিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মার্কিন ডলারের একাধিক হার। প্রবাসী বাংলাদেশিরা যখন দেখছেন হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠালে বেশি টাকা পাওয়া যাবে, তখন তারা এই মাধ্যমকেই বেছে নেবেন। আমরা রেমিট্যান্সের যে হিসাব পাচ্ছি, প্রকৃত রেমিট্যান্স তার চেয়ে অনেক বেশি। আমাদের এখন উদ্যোগ নিতে হবে কীভাবে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের অপতত্পরতা কমিয়ে আনা যায়। কারণ এই ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গমন করেন, তাদের একটি অংশ অবৈধ শ্রমিক। তারা চাইলেই বৈধ মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠাতে পারেন না। তাই অবৈধ শ্রমিক বিদেশে থাকলে হুন্ডি ব্যবসা থাকবেই।

যারা বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন, তারা যদি বৈধ মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে চান, তাহলে কর্মস্থলের আশপাশে কোনো ব্যাংকের শাখায় যেতে হবে। অধিকাংশ দেশেই ব্যাংকের শাখা থাকে কর্মস্থল থেকে অনেক দূরে। এ জন্য বেশ কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু হুন্ডির ক্ষেত্রে যে সময়টুকুও ব্যয় করতে হয় না। এছাড়া বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি হচ্ছে শুক্র ও শনিবার। আর বিশ্বের অনেক দেশেই সাপ্তাহিক ছুটি শনি ও রবিবার। কাজেই প্রবাসীরা দেশে অর্থ পাঠাতে চাইলে সপ্তাহে তিন দিন তা পাঠাতে পারেন না। কিন্তু দেশে যদি টাকার জরুরি প্রয়োজন হয়, তাহলে তারা কী করবেন? নিশ্চিতভাবেই তারা হুন্ডির মাধ্যমেই তা পাঠাবেন।

হুন্ডি ব্যবসা সুদীর্ঘকাল ধরেই চলমান। এই ব্যবসা অবৈধ, কিন্তু রমরমাভাবেই চলছে। যদিও হুন্ডি ব্যবসা চলে কোনো ধরনের লিখিত প্রমাণপত্র ছাড়াই, তার পরও হুন্ডি ব্যবসায়ীরা তাদের গ্রাহকের কাছে আস্থা তৈরি করতে পেরেছেন। এই মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে প্রেরণকারী নিশ্চিত থাকেন যে তার টাকা মার যাবে না এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রাপকের কাছে পৌঁছে যাবে। হুন্ডি ব্যবসা যদি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তাহলে বৈধ মাধ্যম এবং হুন্ডির মধ্যে বিনিময় হারের যে ব্যবধান, তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে। সরকার হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের জন্য কতটা আন্তরিক, সে বিষয়টি পরিষ্কার নয়। এর সঙ্গে গরিব মানুষ জড়িত নয়। সমাজের একশ্রেণির বিত্তবান মানুষ হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। কাজেই সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে সংশয় রয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের কোনো সরকারই হুন্ডি ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

আমাদের দেশের রপ্তানিকারকদের একটি শ্রেণি রপ্তানি আয় স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দেশে আনছেন না। তারা বিদেশেই রপ্তানি আয় রেখে দিচ্ছেন। তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে ডলারের দাম আরো বাড়বে। তখন রপ্তানি আয় দেশে আনলে বেশি টাকা পাওয়া যাবে। এ ধরনের মনোভাব ডলারের সংকট আরো বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় বিদেশে আটকে আছে বলে একটি সূত্র দাবি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি এক নির্দেশনায় বিদেশে থাকা রপ্তানি আয় দ্রুত দেশে নিয়ে আসার জন্য ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পরামর্শ অত্যন্ত ভালো একটি পদক্ষেপ, কিন্তু তা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা সময়ই বলে দেবে। আন্ডারইনভয়েসিং (রপ্তানির ক্ষেত্রে) এবং ওভারইনভয়েসিংয়ের (আমদানির ক্ষেত্রে) মাধ্যমে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। এটা নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যেমন বাড়বে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারও স্থিতিশীল হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যবসায়ের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অংশীজনদের চাহিদা পুরণের মাধ্যমে সম্পদ সর্বাধিকরণ করা, মুনাফা সর্বাধিকরণ নয়।

লেখক: অধ্যাপক, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

অনুলিখন: এম এ খালেক