বৈশ্বিক সংঘাতের যুগে বাস করছি আমরা—এতে কোনো সন্দেহ নেই। চ্যালেঞ্জিং বিষয় হলো, ঠিক কোন রাস্তায় হাঁটছে বিশ্ব, তা কারো জানা নেই। আসলেই, কোন দিকে যাচ্ছে বিশ্বব্যবস্থা! এমন এক সময় পার করছি আমরা, যেখানে বহু মতাদর্শের উদয় ঘটতে দেখা যাচ্ছে। একটা শ্রেণি রয়েছে, যারা বিশ্বব্যবস্থাকে দেখেন সাদা-কালো চোখে। তাদের দৃষ্টিতে, যোগফলশূন্য খেলার (জিরো-সাম গেম) পরিণতি হিসেবেই সংঘাতের পীঠভূমি হয়ে উঠেছে বিশ্ব। মূলত, এটা সেই ধরনের চিন্তাভাবনা, যা অনিবার্যভাবে বিশ্বকে পরিচালিত করে বাইপোলার ওয়ার্ল্ড অর্ডারের (দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা) দিকে।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে বাস্তববাদীর দল। এদের ভাষ্য, বৈশ্বিক শক্তিগুলোর (গ্লোবাল পাওয়ার) প্রতিযোগিতাই বিশ্বকে যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করতে কাজ করছে। এতে করে অবধারিতভাবে তৈরি হবে বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা (মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড)।
তৃতীয় পক্ষে রয়েছে সেই গোষ্ঠী, যারা আপাতত বুদ্ধি খাটিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে, বাস্তবিক অর্থেই কী ঘটছে বা ঘটতে চলেছে। বুদ্ধির রাজ্যে অবগাহন করা এই শ্রেণি কল্পনায় এমন এক ন্যায়নিষ্ঠ পৃথিবীর স্বপ্ন বুনছে, যেখানে মানবতাই সবকিছু। এই বিশ্ব প্রতাপশালীদের তাবেদারি করবে না, শক্তিধরদের স্বার্থ পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের শিকারে পরিণত হবে না। অর্থাত্, এটা হবে মূল্যবোধসম্পন্ন এক মানবিক বিশ্ব।
মানবিক বিশ্বের সূত্র ধরে হিসাব শুরু করা যাক। মূলত এমন চিন্তা থেকেই একটা সময়ে আত্মপ্রকাশ করে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (নন অ্যালাইন মুভমেন্ট—ন্যাম)। বস্তুত, মানবিক চিন্তাধারার মডেল হিসেবে বিশ্বব্যবস্থার দরজায় কড়া নেড়েছিল ন্যাম—এমন দাবি একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। তবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পালটে দিয়েছে সব হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে, বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) দেশগুলোর জন্য সমীকরণ কঠিন করে তোলে ইউক্রেনের মাটিতে চালানো রুশ বাহিনীর সামরিক আগ্রাসন। একই সঙ্গে কিছু দেশ সাড়া দেয় নতুন সমীকরণের হাতছানিতে। এক্ষেত্রে তিন ধরনের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয় দেশগুলোর আচরণে।
প্রথমত, এমন কিছু দেশ, যারা বছরের পর বছর মার্কিন তথা পশ্চিমা বিশ্বের আধিপত্যের কাছে নতি স্বীকার করে চলছিল, অন্যায় আচরণ হজম করে চলছিল, তারা নড়েচড়ে বসে। ভেনেজুয়েলা, কিউবা কিংবা আলজেরিয়ার মতো দেশগুলো এর টাটকা উদাহরণ। মস্কো-কিয়েভ সংঘাতের পটভূমিতে মহান মিত্র রাশিয়ার প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাতে ছুটে আসতে দেখা যায় এ ধরনের দেশকে। পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার পুনরুদ্ধারে যে মিশনে নামেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তাতে সহচরের কাতারে দেখতে পাওয়া যায় কারাকাস, হাভানা, আলজিয়ার্সের মতো পক্ষগুলোকে।
দ্বিতীয়ত, কিছু দেশ ‘বিশেষ পথ’ ধরে চলতে থাকে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। মালি, বুরকিনা ফাসো ও নাইজার রয়েছে এই তালিকার একেবারে ওপরের দিকে। এই দেশগুলো রুশ বলয়ে যোগদানের আশায় পশ্চিমা মিত্রদের ত্যাগ করতেও যেন প্রস্তুত! এদের চিন্তাভাবনা এমন, উন্নত বিশ্বব্যবস্থার অবারিত পথ তাদের সামনে!
তৃতীয়ত, এমন কিছু দেশ রয়েছে, যারা এখনো সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এসব দেশ একধরনের ঘোরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বলা যায়। আসলে, নিজ বাসভূমের রাজনৈতিক সংগ্রামই নিশ্চল করে রেখেছে এসব দেশকে। উদাহরণ হিসেবে সুদানের কথা বলতে হয়। ঘরের ঝামেলাই জ্বালিয়ে মারছে, হিসাব কষার সময় কোথায় খার্তুমের?
যাহোক, চুলচেরা ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণে এটাই উঠে আসবে, বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য একধরনের জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা। অস্বীকার করার উপায় নেই, এটাই আজকের বিশ্বে বড় বাস্তবতা। অনেকে একে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে দেখতে চাইবেন, কিন্তু এই নতুন সমীকরণ ভূরাজনীতিতে যে কতটা তাত্পর্যপূর্ণ, সে কথা বলাই বাহুল্য।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার, বৈশ্বিক সম্পদের (গ্লোবাল রিসোর্সেস) পুনর্বণ্টন তথা ভাগাভাগি আজকের যুগে মহত্ ধারণা বলে মনে হতে পারে, কিন্তু এর ফলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা যে হারে বাড়বে, তার ধকল সইবে কে? বিশেষভাবে লক্ষণীয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে—যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে ওপরে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত পরিধি ক্রমাগত প্রসারিত করতে ব্যস্ত চীন ও রাশিয়া। অর্থাত্, প্রকাশ্য মুখোমুখি প্রতিযোগিতা চলছে। অবশ্য এ ধরনের প্রবণতা ছাড়া আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ সম্ভবও নয়। সুতরাং, সহজ হিসাব দাঁড়ায়, নতুন শক্তি সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং পুরোনো শক্তিগুলো তা আটকানোর জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
আমরা লক্ষ করে আসছি, ওপরে উল্লিখিত অবস্থার মধ্যভাগে দাঁড়িয়েও অতীতের মতো করেই জিরো-সাম গেমের পথ ধরে হেঁটে চলেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাম্প্রতিক বক্তব্য-বিবৃতির দিকে তাকালে সে রকমটাই মনে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এখনো বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে সহাবস্থানের বিপক্ষে!
ওপরের কথার পক্ষে যুক্তি আছে বইকি। গত ২০ অক্টোবর ওভাল অফিসে বক্তৃতার মাঝে বাইডেন এমন একটা বাক্য উচ্চারণ করেছেন, যার মর্মার্থ সম্ভবত কেবল আমেরিকানরাই বুঝতে পারবেন। বাইডেনের বক্তব্য, ‘একটা জিনিস সব সময় মনে রাখতে হবে, ঈশ্বরের কসম, এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আমরা এই ভূখণ্ডের বাসিন্দা। সর্বদা মাথায় রাখবেন, আমরা মার্কিন।’
বাইডেনের এ কথা কী ইঙ্গিত দেয়? বাকি বিশ্বের জন্য এর অর্থ কী? সম্ভবত এর অর্থ কেবল এটাই হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তাবত্ দুনিয়াকে নিছক মার্কিন আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করেই চলতে হবে! যদিও এ ধরনের বাস্তবতা বিভিন্ন জাতির জন্য কেবল অকল্পনীয়ই নয়, অসম্ভব চিন্তাও বটে।
খেয়াল করলে দেখা যাবে, শুধু বাইডেন নয়, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টগণ, পররাষ্ট্রসচিব এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বহু শীর্ষ কর্মকর্তা বছরের পর বছর একই ধরনের বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে আসছেন। সবার কথার ধরন একই—‘আমরা অপরিহার্য জাতি এবং একমাত্র অপরিহার্য জাতি।’
মার্কিন শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ নিজেদের এই যে ‘অপরিহার্য জাতি’ হিসেবে দাবি করছেন, এর পেছনে আসলে কী বিষয় রয়েছে? প্রকৃত অর্থেই এর মর্মার্থ বোঝা কঠিন।
বাস্তবতা হলো, শক্তিমানদের জন্য পৃথিবী ‘স্বার্থের জায়গা’—স্বীয় সুবিধাই তাদের কাছে প্রধান বিবেচ্য। পক্ষান্তরে, দুর্বলদের জন্য ‘সংহতি পোষণ’ করে চলার বিকল্প নেই। আশ্চর্যজনকভাবে এই নীতির সঙ্গে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের কথার মিল খুঁজে পাওয়া যায়! তিনি প্রায়শই বলতেন, ‘আমেরিকার কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই। আমেরিকার জন্য একামাত্র বিবেচ্য হলো স্বার্থ।’
ফিরে আসি শুরুর দিককার কথায়। স্বার্থের বিশ্বের এমন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই সম্ভবত মার্কিন মিত্ররা—হোক তা ফরাসি কিংবা ব্রিটিশ—ন্যামের প্রতি আগ্রহ হারাতে থাকে। ভেতরে ভেতরে তাদের ধারণা হয়তোবা এমন হয়, ন্যামের মতো জোট জাতীয় স্বার্থ বা জনগণের মঙ্গলের জন্য ততটা অপরিহার্য নয়, যতটা মুখে বলা হয়।
দেখার বিষয়, মার্কিন ধ্যানধারণার বিপরীতে রাশিয়া তথা পুতিনের অবস্থান কী? নাইজার, ব্রাজিল কিংবা ইরাকের মতো দেশ আমেরিকার কথাকে কীভাবে নেয়, তা সম্ভবত ভালোই বুঝতে পারেন পুতিন। আর এ কারণেই ২০২২ সালের মস্কো কনফারেন্স অন ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিতে এক বক্তৃতায় রুশ প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, যে নতুন ‘মালটিপোলার ওয়ার্ল্ড’ সৃষ্টি হতে চলেছে, তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইন মোতাবেক ন্যায্য সম্পর্ক ও সুযোগ-সুবিধার ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হবে। সাধারণ হুমকি মোকাবিলার প্রশ্নে এর মধ্য দিয়েই কেবল নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।’
যাহোক, মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা ব্লকের রাজনীতি—গ্লোবাল সাউথ এসব কথার অর্থ সঠিকভাবে বোঝে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে কেউ বুঝুক আর না বুঝুক, নতুন বিশ্বব্যবস্থা যে সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে, তথা বিশ্বব্যবস্থা আমূল বদলে গেছে, দিন শেষে বাস্তবতা এটাই।
লেখক: সাংবাদিক ও গ্রন্থ রচয়িতা
গালফ নিউজ থেকে অনুবাদ: সুমৃত্ খান সুজন