চলতি বছরের শুরু থেকেই ১৩তম ওয়ানডে বিশ্বকাপ নিয়ে দেশের ক্রিকেট সমর্থকদের মধ্যে অনেক আলাপ-আলোচনা চলতে থাকে। দলের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে স্বপ্ন দেখতে থাকে গোটা দেশ। এরপর গেল ৭ আগস্ট, যখন দুই দিনের সফরে বিশ্বকাপ শিরোপা আসে বাংলাদেশে, তখন তো সমর্থকদের উত্তেজনার পারদ আরো চূড়ায় উঠে যায়। কেউ কেউ তো সে সময় বলেই দিয়েছিল যে ‘এবার ট্রফিটি এসেছে শুধু ভ্রমণে, আগামী ১৯ নভেম্বর আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি ক্রিকেট স্টেডিয়াম থেকে এই ট্রফি হাতে নিয়ে ঢাকায় ফিরবেন সাকিবরা।’
তবে এ কী! ট্রফি তো দূরের বিষয়, সেমিফাইনালের লড়াইয়েও নিজে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়ে সবার আগে ভারতের বিশ্বকাপ থেকে দেশে ফেরার টিকিট কেটেছে টাইগাররা। গত পরশু কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৭ উইকেটে হারার মধ্য দিয়ে সাকিবদের শেষ হয়েছে এবারের বিশ্বকাপ যাত্রা।
ভারতের বিশ্বকাপের প্রথম পর্বের এখনো বাকি রয়েছে দশের অধিক ম্যাচ। এর মধ্যে বাংলাদেশের রয়েছে দুটি ম্যাচ। তবে তার আগেই আসর থেকে ছিটকে গেছে টাইগাররা। এবারের আসরে সেমিফাইনালের স্বপ্ন নিয়ে ভারতে পা রাখলেও বাংলাদেশ সাত ম্যাচে হেরেছে ছয়টিতে। এক ম্যাচে কেবল ২ পয়েন্ট নিয়ে ১০ দলের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৯ নম্বরে। বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে আছে ইংল্যান্ড, যারা গত বার জিতেছিল শিরোপা।
টাইগারদের থেকে এবার তাদের অবস্থা বেগতিক। তবে তাতে কী, তাদের তো রয়েছে শিরোপা। বাংলাদেশ ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বকাপ খেলেও কোনো আসরেই এখন পর্যন্ত সেমিফাইনাল খেলতে পারেনি। এবার আশা জাগিয়ে গিয়েছিল সেই অভাবটাই পূরণ করতে, কিন্তু ফিরতে হচ্ছে বিশাল ব্যর্থতার ব্যথা বুকে নিয়ে।
এবারের বিশ্বকাপে ভালো উইকেটে খেলে ব্যর্থ বাংলাদেশ। শুধু ব্যর্থ বললেও ভুল হবে, তাদের ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং; তিন বিভাগেই বাংলাদেশের করুণ দশা। কোনো বিভাগেই নেই দলগত সাফল্য। ব্যাট হাতে দলের বাতিলের খাতায় থাকা অভিজ্ঞ ব্যাটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ বাদে নেই কারো ব্যক্তিগত অর্জনও। তাতে ব্যাটিং ও বোলিং দুর্দশার চিত্রই এঁকেছেন ক্রিকেটাররা। কেন বাংলাদেশের পারফরম্যান্স বের হচ্ছে না, কেন ব্যাটসম্যানরা রান পাচ্ছেন না, কেন বোলারা দিতে পারছেন না সাফল্য? উত্তর নেই অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের কাছেও। যত বারই তাকে ব্যর্থতার কারণ জিজ্ঞেস করা হয়, ততবারই তার জবাব,‘আমরা উত্তর খোঁজার চেষ্টায় আছি, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না।’ কিন্তু কেন?
গেল আসরে (২০১৯ বিশ্বকাপে) যেই আফগানিস্তান দ্বিতীয় বারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে এসে আসরের সব কটি ম্যাচ হেরে আসর শেষ করেছিল। তারাও এবারের আসরে লড়াই করছে সেমিতে যাওয়ার জন্য। ইতিমধ্যে ছয় ম্যাচ খেলে তিনটি জয় ও তিনটি হার নিয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে অবস্থান করছে পয়েন্ট তালিকার ষষ্ঠ স্থানে। তিন ম্যাচের মধ্যে তারা হারিয়েছে বড় তিন দলকেই (ইংল্যান্ড-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা)।
তাদের পরবর্তী ম্যাচ আগামীকাল নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। আফগানরা যেই ফর্মে রয়েছে, তাতে বলা যায় এই ম্যাচে ফেবারিট তারাই। আফগানরা যদি তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলতে এসে সেমিফাইনালে খেলার লড়াই করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের সমস্যা কোথায়? তারা তো এবার গিয়েছিল নিজেদের সপ্তম বিশ্বকাপ খেলতে। তাহলে কি আমরা এখনো আফগানদের থেকেও অনেকটা পিছিয়ে রয়েছি?
বলা যায়, এবারের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের এমন পারফরম্যান্স দেশের ক্রিকেটকে আরো কয়েক বছর পিছিয়ে দিল। আসর শুরুর আগে স্কোয়াড ঘোষণার পর থেকেই বিতর্ক। তা-ও হয়েছিল দেশের সেরা ওপেনার তামিম ইকবাল খানকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে না রাখার কারণে। টাইগারদের বিদায়ের পরও অনেকের ধারণা, তাকে না রাখার কারণেই দল এমন বাজেভাবে ভারতে আত্মসমর্পণ করেছে। তবে বিষয়টি কি আসলেও এমন? তামিম ছাড়াও এবারের দল খারাপ ছিল না।
বছরের শুরু থেকে ব্যাট হাতে দারুণ প্রদর্শনী করা নাজমুল হোসেন শান্ত, অভিষেকের পর থেকে ধারাবাহিক ছন্দে থাকা তাওহিদ হূদয়, অভিষেকের আগে ব্যাট হাতে রানের বন্যা বইয়ে দেওয়া তানজিদ তামিম, অভিজ্ঞ মুসফিকুর রহিম, অধিনায়ক সাকিব আল হাসান, চোখ ধাঁধানো ব্যাটার লিটন কুমার দাস—সবাই তো ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন দলের ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার হাওয়া মেহেদী হাসান মিরাজও। তবে এমন কী হলো যে মিরপুরের বাইরে গিয়ে একসঙ্গে সবাই অফ ফর্মে চলে গেলেন? গোটা দলের এমন রানখড়াই তো ডুবিয়ে দিল এবারের আসর।
তবে বিশ্বকাপ গেলেও লড়াই শেষ হচ্ছে না টাইগারদের। আসরের শেষ দুই ম্যাচে জয় পেতেই হবে, এরপর তাকিয়ে থাকতে হবে ডাচদের দিকে, তাদেরও হারতে হবে। না হলে আগামী ২০২৫ সালে পাকিস্তানে যেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আয়োজন করা হবে, সেখানে খেলতে পারবে না বাংলাদেশ।
পরবর্তী দুই ম্যাচে টাইগারদের দুই প্রতিপক্ষ যথারীতি শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া। দলের আত্মবিশ্বাস যেই তলানিতে রয়েছে, তাতে এ দুই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াই করাটা সহজ ব্যাপার হবে না। তার পরও আশা রাখতেই হবে। শুরুটা যেমন জয় দিয়ে হয়েছিল, শেষটা যেন জয় দিয়েই হয়। ভারতে সেমি তো হলো না, ’২৫-এ যেন পাকিস্তানে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে—এটাতেই এখন টাইগারদের পুরো নজর।