শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে ভাঙচুর-সংঘর্ষ চলছে

গাজীপুর মহানগর, আশুলিয়া ও ঢাকার মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে বেতনবৃদ্ধির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ, ভাঙচুর অব্যাহত রয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর থেকে গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালন করে আসছে শ্রমিকরা। গত বুধবার শ্রমিক বিক্ষোভ কিছুটা কম থাকলেও বৃহস্পতিবার তা বেড়ে যায়। এদিকে শ্রমিক আন্দোলনের মুখে গাজীপুর ও আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধের সংখ্যা বেড়েছে। গতকাল সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও গাজীপুর ও আশুলিয়ায় কমপক্ষে ৪২১টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক কারখানা গত মঙ্গলবার থেকে বন্ধ।

গতকাল বৃহস্পতিবারও সকাল থেকে শ্রমিকরা গাজীপুর মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধের চেষ্টা চালায়। তবে বিজিবি, র্যাব, পুলিশের তত্পরতার কারণে শ্রমিকরা সড়কে দাঁড়াতে পারেনি। এর মধ্যেই শ্রমিকরা বিক্ষিপ্তভাবে বেশ কিছু কারখানায় হামলা চালিয়ে জানালার কাচ ভাঙচুর করে। এ কারণে বৃহস্পতিবার অধিকাংশ কারখানা বন্ধ ছিল। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ইটাহাটা ও নাওজোর এলাকায় কোস্ট টু কোস্ট কারখানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা এলাপাতাড়িভাবে আশপাশের কারখানাসমূহে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালায়। খবর পেয়ে বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

একই সময়ে গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস এলাকার টি এম ফ্যাশন লিমিটেড, চৌধুরীবাড়ী এলাকায় বেলমন্ড গার্মেন্টস, ব্রাদার্স ফ্যাশন লিমিটেড ও রুয়া ফ্যাশন লিমিটেডসহ অন্যান্য কারখানার শ্রমিকরা বেতন বাড়ানোর দাবিতে কারখানার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এসময় বাসন সড়ক এলাকায় আলেমা ও মীম ডিজাইন কারখানার সামনে বহিরাগত শ্রমিকরা বিক্ষোভ করে। কারখানাটি বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা কিছুক্ষণ অবস্থান করে চলে যায়। এদিকে, মহানগরের চৌধুরীবাড়ী এলাকার বেলমন্ড গার্মেন্টস, ব্রাদার্স ফ্যাশন লিমিটেড, রুয়া ফ্যাশন লিমিটেডসহ আশপাশের কারখানার শ্রমিকরা বেতন বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। ভোগড়া বাইপাস এলাকার আশপাশের কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার সেল ছুড়ে মহাসড়ক থেকে তাদের সরিয়ে দেয়।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার সারোয়ার আলম বলেন, পোশাক শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে বিপুল পরিমাণ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শ্রমিকদের ভাঙচুর না করে শান্ত থাকতে অনুরোধ করা হচ্ছে।

র্যাব-১ গাজীপুরের পোড়াবাড়ি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. ইয়াসির আরাফাত হোসেন বলেন, মানুষের জানমালের ক্ষতি হয়, চলাচলে বিঘ্ন ঘটনায়, সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয় এমন নাশকতাবিরোধী সব কাজে র্যাব-১ মাঠে থেকে তা প্রতিহত করবে।

চলমান শ্রমিক অসন্তোষের পঞ্চম দিনে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় দুটি কারখানায় ভাঙচুর করেছে বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকরা। এসময় তারা কারখানার গ্যারেজে রাখা একটি প্রাইভেট কার ও একটি নোহা মাইক্রোবাসে ভাঙচুর করে। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আশুলিয়ার কাঠগড়া উত্তরপাড়া এলাকায় অবস্থিত ফ্যাশন গ্লোব গ্রুপের এ আর জিন্স প্রডিউসার লিমিটেড ও নাসা গ্রুপের সাইন অ্যাপারেলস কারখানায় এ ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

রাজধানীর মিরপুরে গতকাল সকালে ফের সড়কে অবস্থান নেয় পোশাকশ্রমিকরা। এসময় বেশ কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করা হয়। পুলিশ জানায়, রাজধানীর মিরপুর-১২ এলাকায় সকালে সড়ক অবরোধ ও দোকানপাট ভাঙচুর করেছে বিক্ষুব্ধ পোশাকশ্রমিকরা। পল্লবী থানার পরিদর্শক (অপারেশন্স) আরিফ আমিনুল জানান, বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঠেকাতে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ। এসময় মেট্রোরেলের কয়েকটি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আশুলিয়া, সাভার, মিরপুর, রামপুরা, আবদুল্লাহপুর, টঙ্গী, গাজীপুর ও কোনাবাড়ীসহ ঢাকার আশপাশের গার্মেন্টস কারখানা এবং এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

৪২১টি কারখানা বন্ধ: গতকাল সকাল থেকে শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও গাজীপুর ও আশুলিয়ায় কমপক্ষে ৪২১টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধেক কারখানা গত মঙ্গলবার থেকে বন্ধ। গাজীপুর শিল্প পুলিশ-১-এর (এসপি) মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, গাজীপুর শহরের আশপাশের এলাকা ছাড়াও কোনাবাড়ি, কাশিমপুর ও কালিয়াকৈরে ৩৮৬টি পোশাক কারখানা বন্ধ রয়েছে। কারখানা বন্ধের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। অন্যদিকে, ৩০ থেকে ৩৫টি পোশাক কারখানার ছুটির নোটিশ পেয়েছি আমরা। আবার কিছু কারখানায় বৃহস্পতিবার সকালে কাজ শুরু হলেও পরে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

 অবশ্য গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অর্ধশতাধিক কারখানা আগামীকাল শুক্রবার পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে নোটিশ দিয়েছে। গতকালও ছয়টি কারখানার শ্রমিকেরা সকালে কাজে এলেও ঘণ্টাখানেক পর কাজ বন্ধ করে তারা কারখানা থেকে চলে যান।

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় নারীপক্ষের উদ্বেগ: পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবির আন্দোলনে সহিংস ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নারীপক্ষ। একই সঙ্গে শ্রমিকেরা যেন তাদের ন্যায্য দাবিতে সোচ্চার হতে পারে এবং আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারে তার জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সরকার, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, শ্রম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানান সংগঠনের নেতারা। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো নারীপক্ষের আন্দোলন সম্পাদক তামান্না খান পপি স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।