মূল্যস্ফীতি, বাজার ও নির্বাচনপূর্ব সরকার

নানা কারণেই একটি দেশের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। তবে একটি দেশের গ্রস ডমেস্টিক প্রোডাক্ট বা জিডিপি সাপেক্ষে মুদ্রা সরবরাহ কতটা আছে, তার ওপর নির্ভর করে মূল্যস্ফীতি কতটা ঘটবে। সাধারণ মানুষের ধারণা হচ্ছে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা অপরিবর্তিত থেকে শুধু অর্থের জোগান বাড়লেই মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। কিন্তু মূল্যস্ফীতি জিডিপির হ্রাস-বৃদ্ধির ওপরও অনেকখানি নির্ভর করে। যেমন, কোনো একটি নির্দিষ্ট বছরে হয়তো জিডিপির প্রবৃদ্ধি হলো ১০ শতাংশ। অন্যদিকে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি পেল ৫ শতাংশ। সেক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি না ঘটে মূল্য সংকোচনই ঘটবে। দুই-এক বছর আগেও সারা বিশ্ব করোনা দ্বারা আক্রান্ত ছিল। করোনা থেকে উত্তরণ ঘটার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলো। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী প্রতিটি দেশেই কমবেশি উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সারা বিশ্বের সাপ্লাই চেইন কিছুটা হলেও ভেঙে পড়ে বা বিপর্যস্ত হয়। তা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী খাদ্য উত্পাদন মোটামুটিভাবে স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু উত্পাদিত খাদ্যপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হয়। খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলো তাদের উত্পাদিত খাদ্য যুদ্ধের কারণে স্বাভাবিকভাবে রপ্তানি করতে পারেনি। আবার একই সময়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এ কারণে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্য রপ্তানি ব্যয় বেড়ে যায়। এসব হচ্ছে বৈশ্বিক বাস্তবতা।

বর্তমান সময়ে কোনো দেশই বিশ্বব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর দেশ। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হলে বাংলাদেশও তা দ্বারা প্রভাবিত হয়। তবে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার অনেক দেশের তুলনায় কম ছিল। কারণ বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা করোনা বা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আমাদের পণ্য রপ্তানি খাতও তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে। করোনার কারণে আমাদের সাপ্লাই চেইন কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে, শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ এবং শিল্পে ব্যবহূত পণ্য আমদানিব্যয় বৃদ্ধি পায়। জ্বালানি তেল আমদানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। যার অনিবার্য প্রভাব পড়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে। শিল্পের মোট উত্পাদন অনেকাংশে কমে যায়। বিভিন্ন পণ্যের মূল্য অনেকাংশে স্থানীয় বাজারে বৃদ্ধি পায়। তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির হার তুলনামূলকভাবে কম। দুইটি আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ে যে প্রক্ষেপণ করেছিল, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার তার চেয়ে বেশ কম। আমাদের দেশের মূল্যস্ফীতির হার অবশ্যই বেশি। কিন্তু যতটা বেশি হবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা হয়নি।

সরকার কিছু মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু একই সময়ে যদি আমাদের উত্পাদন তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পেত, তাহলে মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে প্রভাব কম পড়ত। এটাও ঠিক যে, বর্তমান সরকার যেহেতু তার বর্তমান মেয়াদের শেষের দিকে চলে এসেছে, তাই বাজেটে বড় ধরনের ঘাটতি নথাকবে। সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করবে, তার চেয়ে উন্নয়ন ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয় বেশি করবে। সরকার নির্বাচনের আগে দৃশ্যমান বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে, এটাই স্বাভাবিক। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হয়তো থাকবে। আবার অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা ভালো করার জন্যও কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এসব কারণে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেশি আছে এবং থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির হার ডাবল ডিজিটের নিচে রয়েছে। তবে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সাধারণ মূল্যস্ফীতির চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বর্তমানে ১২ শতাংশের ওপরে রয়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সাধারণ দরিদ্র মানুষ বেশ অসুবিধার মধ্যে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের মূল্য কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারকে আরো সক্রিয় হতে হবে। কিন্তু বাজারে যে ব্যাবসায়িক সিন্ডিকেট আছে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কিছুদিন আগে একজন মন্ত্রী, যিনি এই বিভাগের দায়িত্বে আছেন, তিনি তার অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য একই সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই মন্ত্রীর কথায় বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তার অর্থ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবেই ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব মেনে নিতে ইচ্ছুক নন। বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বাজারে সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বাহ্যিকভাবে মনে হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার কোনো কমতি নেই। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং তারা কোনো না কোনোভাবে সরকারের সাহচর্যে থাকার চেষ্টা করে। তাই সরকার চাইলেই তাদের রাতারাতি দমন করতে পারবে বলে মনে হয় না।

বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দিলে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ব্যাংক রেট (শিডিউল ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পকালীন ঋণ গ্রহণের সময় যে সুদ প্রদান করে) বাড়িয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাজারে অর্থের জোগান কমানো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) গত দেড় বছরের ব্যাংক রেট অন্তত ১৩ বার বৃদ্ধি করেছে। বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ব্যাংক রেট বাড়িয়েছে। ব্যাংক রেট বাড়ানো হলে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও আনুপাতিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এতে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ আগের চেয়ে ব্যয়বহুল হয়। সাধারণ ঋণগ্রহীতারা ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণের মাত্রা কমিয়ে দেয়। এতে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ কমে যায়। ব্যাংক রেট বাড়ানো হলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মন্থরতা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলেও মূল্যস্ফীতি কমে আসে। যেসব দেশ ব্যাংক রেট বাড়িয়েছে তাদের অধিকাংশই মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও গত দেড় বছরের মধ্যে ব্যাংক রেট বেশ কয়েক বার বাড়িয়েছে। আগে ব্যাংক রেট ছিল ৫ শতাংশ। এখন তা সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক রেট বৃদ্ধি করা হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) ব্যাংক রেট বাড়ালেও ব্যাংক ঋণের সুদের হার (শিডিউল ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে ঋণদান কালে যে সুদ চার্জ করে) অনেক দিন পর্যন্ত ৯ শতাংশে নির্ধারণ করে রাখে। ফলে ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে ঋণদান কালে আগের তুলনায় বেশি সুদ ধার্য করতে পারেনি। এতে ঋণ গ্রহণ আগের তুলনায় সহজ এবং সাশ্রয়ী হয়ে পড়ে। অনেকেই এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা অন্য খাতে প্রবাহিত করেছে। এই ঋণের অর্থ কোনো না কোনোভাবে বাজারে চলে এসেছে। এমনকি উক্ত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে ব্যাংক রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে কৌশল গ্রহণ করেছে, তা ততটা ফলপ্রসূ হয়নি। আগের এক মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। অথচ গত বছর আগস্ট মাসে ব্যক্তি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অথচ একই সময়ে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল ও শিল্পে ব্যবহূত পণ্য আমদানি কমেছিল আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ শতাংশ। আর ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি কমেছিল ৭৬ শতাংশ। তাহলে ব্যক্তি খাতে দেওয়া ব্যাংক ঋণের অর্থ কোথায় গেল? ব্যাংক রেট বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি ব্যাংক ঋণের ‘আপার ক্যাপ’ (৯ শতাংশ) প্রত্যাহার করা হতো, তাহলে হয়তো মূল্যস্ফীতি এতটা ঊর্ধ্বমুখী হতো না।

নির্বাচনপরবর্তী সরকার হয়তো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করবে। আমাদের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রাসংকট সাম্প্রতিক সময়ে তীব্রভাবে বেড়েছে। ফলে বিভিন্ন পণ্য এবং শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি ব্যয় অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার পরিণতিতে সামগ্রিকভাবে উত্পাদন ব্যয় অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আর মূল্যবৃদ্ধির অর্থই হচ্ছে ভোক্তাকে সেই বর্ধিত মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। নানা কারণেই ভোক্তার আয় এবং ক্রয়ক্ষমতা সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমেছে। এতে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক চিন্তা করা ঠিক হবে না। বরং নির্বাচনপরবর্তী সরকারের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

আমাদের দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে। আমি মনে করি, অর্থ পাচার রোধ করার জন্য আমাদের আরো কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের আরো তত্পর হতে হবে। উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্নীতিকে সহনীয় বা সীমিত পর্যায়ে রাখার জন্য আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে দুর্নীতি এবং করপোরেট সুশাসনের অভাব নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে হচ্ছে অর্থ পাচার। এটা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে অর্থ পাচার রোধ করা যায় বা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়।

বাজার সিন্ডিকেট নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়। বাজারে এক বা একাধিক শক্তিশালী সিন্ডিকেট তত্পর রয়েছে। এটা আজকের সমস্যা নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এই সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যাদের বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তাদের একটি অংশই এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। যারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বে আছেন, তাদের নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে। এটা করা গেলে মূল্যস্ফীতির অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব হবে।

লেখক: অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

অনুলিখন: এম এ খালেক