মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশব্যাপী ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আরো অনেক উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে। তবে দেশের এসব উন্নয়ন ছাপিয়ে সম্প্রতি আলোচনায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার আন্তরিক চেষ্টার পরও কতিপয় ব্যবসায়ী মহল নিজেদের মধ্যে সিন্ডিকেট ও কারসাজি করে দ্রব্যমূল্যের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি বজায় রাখছে। এতে সাধারণ জনগণ ও নিম্নবিত্তদের সংসার চালাতে নাভিশ্বাস উঠেছে। এমনকি মধ্যবিত্তরাও দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে টানাপড়েনে সংসার চালাচ্ছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সন্নিকটে। এই সময় সরকারের উচিত বাজারের এই অস্থিরতার কারণ উদ্ঘাটন করে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে সাধারণ জনগণের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে। দেশে এত সব উন্নয়ন সংঘটিত হওয়া সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক বিরোধীদের একটা অংশ বর্তমান সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা তৃণমূলে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত এই ব্যাপারে কঠোর ও আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
‘A hungry man is an angry man.’ ক্ষুধার্ত মানুষের প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা হচ্ছে খাদ্য। আপামর জনসাধারণের কাছে অবকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কম দামে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেলে খেটে খাওয়া গরিব মানুষজন চলাফেরা করে না। এটা দীর্ঘ মেয়াদে উন্নয়ন ও অগ্রগতি আনলেও সাধারণ মানুষ তাত্ক্ষণিক কিছু পেতে চায়। তারা জিডিপি, এমডিজি, এসডিজি, রিজার্ভ বোঝে না, বুঝতে চায় না। কম দামে জিনিসপত্র কিনতে চায়। ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় কে থাকল আর গেল তা নিয়ে গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষের কোনো মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা দ্রব্যমূল্যের আকাশছোঁয়া দাম। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজনীতি এবং ভোটের চেয়ে ভাত তাদের কাছে অধিক তাত্পর্যপূর্ণ।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধসহ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্থিরতা এবং অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ জনগণ আজ দিশেহারা। বিরোধী দল ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি’ ইস্যুকে পুঁজি করে সরলপ্রাণ জনসাধারণকে উসকানি দিয়ে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার অপচেষ্টায় লিপ্ত।
মিছিল-মিটিং, প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশ করে যতই উন্নয়নের কথা বলা হোক না কেন, গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষ এগুলো আমলে নেয় না। তারা দেখতে চায় চাল, ডাল, আলুসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কম কি না? আয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে কি না? চিকিত্সাব্যয় কম কি না? গবেষণায় দেখা গেছে, দ্রব্যমূল্যের দাম কমলে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের আন্দোলন-সংগ্রামে যে ভাটা পড়বে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। এর প্রভাব পড়বে ভোটব্যাংকে। জনগণই বর্তমান সরকারকে রাষ্ট্রক্ষমতায় রাখার জন্য ভোট দেওয়ার জন্য আরো বেশি মাত্রায় ঐক্যবদ্ধ হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার সমাধান এবং জনপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধিতে সরকার এই মুহূর্তে যা করতে পারে—
অনেকগুলা পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে আমদানিনির্ভর করে ফেলছে। এর কারণে ডলারের মজুত কমে যাচ্ছে এবং ডলার পাচার বাড়ছে। ডলার পাচার হলে রিজার্ভ কমবে। রিজার্ভ কমলে আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য নষ্ট হবে। সরকারকে সঠিক মজুত ও বণ্টনব্যবস্থাকে গতিশীল করতে হবে। যেসব পণ্যের মজুত কম তা টিসিবির মাধ্যমে আমদানি করে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় দোকান খুলে সরবরাহ করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যে সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে টিসিবির মাধ্যমে সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে বাজার স্থিতিশীল হবে ও অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে যাবে।
ব্যবসায়ীরা সরকারের কথা শুনছেন না। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, সরকার ডিম ও আলুর দাম নির্ধারণ করে দিলেও ব্যবসায়ীরা তা শুনছেন না। আলুর দাম খুচরা বাজারে কেজি-প্রতি ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও খুচরা দোকাদাররা ৬০ থেকে ৭০ টাকা দামে বিক্রি করছেন। মূল্যবৃদ্ধির জন্য খুচরা ব্যবসায়ীরা দোষ দেন পাইকারের, পাইকাররা দোষ দেন মজুতদারের। গুটিকয়েক অসাধু মজুতদার, লোভী ব্যবসায়ী ও তাদের মদতদাতাদের জন্য সমগ্র জাতি দুর্ভোগ পোহাতে পারে না এবং বর্তমান সরকারের যে বিশাল অর্জন তা ম্লান হতে পারে না। অনতিবিলম্বে এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই বাজারব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সেল গঠন করে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সমন্বিত করে Supply Chain Management, অর্থাত্ বাজারে সরবরাহব্যবস্থা সঠিকভাবে অব্যাহত রাখতে হবে।
শুধু ব্যবসায়ীদের প্রতি নির্ভরশীল না হয়ে সরকারকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতায় অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ জনগণের কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে হবে। দুস্থদের খাদ্যসহায়তা (ভিজিএফ) এবং খাদ্য ও অর্থসহায়তা (জিআর) কর্মসূচির আওতা আরো বাড়াতে হবে ও তদারকি জোরদার করতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষদের প্রশাসন ও ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে সহযোগিতা করতে হবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও কৃষক লীগকে আন্তরিকভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুস্থ ও হতদরিদ্র মানুষের প্রতি সেবা, সহমর্মিতা এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
প্রয়োজনে এই মুহূর্তে কিছু বৃহত্ ও ব্যয়বহুল প্রকল্প স্থগিত রেখে সে অর্থ দিয়ে দ্রব্যমূল্যে ভর্তুকির মাধ্যমে দাম কমানো যেতে পারে। দ্রব্যমূল্যের কম দাম ও এর সঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো ভোটের রাজনীতিতে ইতিবাচকভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বাংলাদেশ এখন ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আজ আমাদের সবার আরাধ্য।
লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক; প্রেসিডিয়াম সদস্য—বঙ্গবন্ধু পরিষদ।