খাগড়াছড়ির প্রবেশদ্বার মনিকছড়ির মং রাজবাড়িতে এক সময় রাজা ছিলেন, সৈন্য-সামন্ত, হাতি-ঘোড়া সবই ছিল। রাজকীয় কাজকর্মে মুখর ছিল রাজবাড়ি। এখন বাঘের নখ বাঁধানো শত বছরের পুরোনো দৃষ্টিনন্দন রাজ সিংহাসন আছে, আছে কারুকার্য খচিত কাঠের রাজপালঙ্কসহ নানা নির্দেশনা। কিন্তু নেই শুধু রাজা।
৩২ বছর আগে মং রাজবংশের সর্বশেষ রাজা নীহার দেবীর মৃত্যুর পর শুরু হয় শূন্যতা। ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সব রাজকীয়তা, জৌলুস। এখন নিষ্প্রাণ এ রাজবাড়িটি লালন করে চলেছে মং রাজবংশের দুই শতাধিক বছরের ইতিহাস। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা যুদ্ধে এ রাজ পরিবারের অবদান অবিস্মরণীয়। তত্কালীন রাজা মংপ্রু সেইঁ মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্র, গাড়ি বা অর্থ-সামগ্রী দিয়ে শুধু সহায়তাই করেননি, প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন যুদ্ধে।
ঐতিহাসিক মং রাজবাড়ি সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রায় ৫ একর আয়তনের এ রাজবাড়ির সর্বত্র সুনসান নীরবতা। রাজবাড়ির মূল ভবনে সংরক্ষিত আছে রাজ সিংহাসন। বাঘের পায়ের আদলে তৈরি সিংহাসনের কাঠের পায়ায় বাঁধানো রয়েছে বাঘের নখ। অপূর্ব সুন্দর কারুকার্যে কাঠের তৈরি রাজপালঙ্ক, বিশালাকারের হাতির দাঁত, তলোয়ার, বন্দুক, তীর-ধনুক, রাজপোশাকসহ বিভিন্ন মূল্যবান নিদর্শন। রাজবাড়িতে পুরোনো স্থাপনার মধ্যে রয়েছে আকর্ষণীয় শৈল্পিক কারুকার্যে তৈরি শতাধিক বছরের পুরোনো নানুমা দেবী হল, রাজ জেতবন বৌদ্ধ বিহার, অতিথিশালা ইত্যাদি। রাজবাড়ির পাশে মহামুনিতে রয়েছে প্রয়াত মং রাজা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মঠ। এখানে রয়েছে শতাধিক বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির। ১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ মন্দিরে রয়েছে বার্মা (বর্তমান মায়ানমার) থেকে আনা অষ্ট ধাতুর তৈরি ভগবান বুদ্ধের বিশালাকারের মূর্তি। সে সময় থেকে প্রতি বছর চৈত্র্য-সংক্রান্তিতে এ মহামুনিতে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী মহামুনি মেলা। হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় মেলায়। আগে প্রতি বছর রাজবাড়িতে মহাধুমধামে রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো।
রাজ পরিবারের প্রয়াত সদস্য রাজীব রায়-উনিকা দেবী দম্পতির মেজ কুমার সুইচিং প্রু এখন রাজবাড়ির তত্ত্বাবধান, রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তার উদ্যোগে নিষ্প্রাণ রাজবাড়িতে কিছুটা প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। কুমার সুইচিং প্রু বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতি মং রাজা তথা রাজ পরিবারের সমর্থন ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কারণে সে সময়ে রাজবাড়িটি শত্রুপক্ষের চরম আক্রোশের শিকার হয়। মূল্যবান সম্পদ লুণ্ঠন এবং মারাত্মক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় এখানে। রাজবাড়ির ২২টি হাতি, ৩০টি ঘোড়া, ১৭০টি মহিষ, ১ হাজার ৬৬৩টি গরু, চিড়িয়াখানার রয়েল বেঙ্গল টাইগার, জিরাফ, জেব্রাসহ বিভিন্ন পশু-পাখির কিছুই রক্ষা পায়নি তাদের হাত থেকে। আর এ লুটপাট ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানিদের দোসর স্থানীয় রাজাকার-আলবদররা। ১৯৯১ সালে রানি নীহার দেবীর মৃত্যুর পর থেকে এখনো শত প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়িটি রক্ষা করা হচ্ছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মং রাজা মংপ্রু সেইঁ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কুমার সুইচিং প্রু আরো বলেন, এ বছর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে নানুমা দেবী হল ও রাজ জেতবন বৌদ্ধ বিহারসহ রাজবাড়ির উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজ করা হয়। এর আগে ২০২২ সালে নিজস্ব উদ্যোগ ও ভক্তদের সাহায্য-সহযোগিতায় মহামুনি বৌদ্ধ মন্দির ও মঠের সংস্কার করা হয়।
মং রাজা পরিবারের ইতিহাস থেকে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে নানা প্রেক্ষাপটে মং রাজ্যের রাজধানী চট্টগ্রামের রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি এবং সর্বশেষ ১৭৯৪-৯৫তে মানিকছড়িতে স্থানান্তরিত হয়। মানিকছড়ি রাজবাড়িতে রাজা খেদু মৃত্যুবরণ করার পর ১৭৯৬ সালে রাজার উত্তরাধিকারী লাভ করেন তার ছেলে কংজয়। তার আমল থেকেই রাজকীয়তা রূপ পায় মানিকছড়ি রাজবাড়ি। ১৭৯৫ হতে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ২০১ বছরে মানিকছড়ির মং রাজবাড়িতে খেদু, কংজয় ধামাই, কিওজা সেইঁ, নরবধি, কিও জা প্রু, নেপ্রু সেইঁ, নানুমা দেবী, মংপ্রু সেইঁ ও নীহার দেবী—এ ৯ জন রাজা রাজকার্য পরিচালনা করেন।