দরকার বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক বিবেচনা

দারিদ্র্য একটি দেশের উন্নতির প্রধান অন্তরায়। সেটি মাথায় রেখে বাংলাদেশ সরকার দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচী হিসেবে শিক্ষা উপবৃত্তি, কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভালনার্যাবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) কর্মসূচী, মাতৃত্বকালীন ভাতা, কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ ভাতা, শিক্ষা ও উপবৃত্তি প্রশিক্ষণ, ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার সিরোসিস রোগীদের সহায়তা, চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচী প্রভৃতি বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু গ্রামীণ ও নগরাঞ্চলে বিদ্যমান দারিদ্র্য রোধে উক্ত কার্যক্রমসমূহের সব কটির প্রভাব দৃশ্যমান নয়। ভাতাগুলোর পরিমাণ বর্তমান বাজারমূল্য ও জীবনধারণে নিতান্তই অপ্রতুল এবং প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া দুর্নীতিগ্রস্ত বলে সামাজিক সুরক্ষা খাতের বহু কর্মসূচি মিলেও দারিদ্র্য বিলোপ কর্মসূচীতে টেকসই সাফল্য আনা যাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ দারিদ্র্য মূল্যায়নের প্রতিবেদনে (২০১৯) বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনকে ‘উদ্দীপনামূলক গাথা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ২০০০ সালের পরে গত দেড় দশকে আড়াই কোটিরও বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে চলে এসেছে। বস্তুতপক্ষে, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচকের মাধ্যমে ব্যক্তিপর্যায়ে সব বঞ্চনা (খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান প্রভৃতি) বিবেচনায় দারিদ্র্য মূল্যায়ন করা উচিত্ এবং এতে কে দরিদ্র ও কী কারণে দরিদ্র , সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।

৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সময়ে বহুমাত্রিক সূচক গঠনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার বহুমাত্রিক দারিদ্র্য মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং এমইপির কথা আলোচিত হয়। আমাদের দেশে আয়-ব্যয় ভিত্তিক দারিদ্র্যের পাশাপাশি বহুমাত্রিক দারিদ্র্য পরিমাপের সময় এসেছে। মধ্য আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে হলে আমাদের শুধু আয়ভিত্তিক দারিদ্র্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। যেহেতু এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য দারিদ্র্য নিরসন অপরিহার্য, তাই বহুমাত্রিক দারিদ্র্য নিরসনের মাধ্যমে কার্যত আমরা বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নচিত্র দেখার প্রয়াস পাবো। কতিপয় বঞ্চনার সমন্বয়ে বহুমাত্রিক দারিদ্র্য পরিমাপ করা হয়। যে দেশের মৌলিক অধিকারে বঞ্চনা বেশি, সে দেশের বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের হার তত বেশি হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর খানা ও ব্যয় জরিপ-২০২২ অনুসারে, বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮.৭%। অতি দরিদ্র বা দরিদ্র কেউ ঢাকা কিংবা বড় কোনো শহরে এসে রিকশা চালানো বা অন্য কোনো কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে। এতে তাদের প্রতিদিনের খাবারের অর্থের জোগাড় হচ্ছে। কিন্তু বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিত্সাসহ অন্যান্য সামাজিক অধিকারসমূহ পূরণ করা তাদের জন্য ঠিকই চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে যাচ্ছে। এভাবে তারা একটা ভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকায় এখনো প্রায় দুই কোটি হতদরিদ্র রয়েছে আর এই সংখ্যাটি এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। এ দেশের নগর অঞ্চলগুলোতে রেললাইনের পাশে পলিথিন টানিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেওয়া জনগোষ্ঠীর পরিমাণটাও উল্লেখযোগ্য রকমেরই। তাই এ কথা বলাই যায় যে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার কমলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক অবস্থান এখনো বদলায়নি।

আবার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘দ্য গ্লোবাল ২০২১ মাল্টিডাইমেনশনাল পোভার্টি ইনডেক্স’ (এমপিআই) জরিপে উঠে এসেছে যে, দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য উল্লেখযোগ্য হলেও দেশের ২৪.১ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন। আর এটিকে বলা হয়েছে এভাবে যে, দেশের ২৪.১% বা ৩.৯২ কোটি মানুষ বহুমাত্রিকভাবে দরিদ্র। জরিপে ‘বহুমাত্রিক’ দরিদ্র বলতে বোঝানো হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মানদ্লে একটি পরিবারের সার্বিক পরিস্থিতি। এ তিনটি বিষয়ে মোট দশটি সূচক রয়েছে। যদি কোনো পরিবারে দশটি সূচকের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ ঘাটতি থাকে, তাহলে তাকে বহুমাত্রিক দরিদ্রতার শিকার বা গরিব পরিবার বলে বিবেচনা করা হবে। স্বাস্থ্য সূচকের মধ্যে রয়েছে পুষ্টি ও শিশুর মৃত্যুহার। মানসম্পন্ন জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন, নিরাপদ পানি, বিদ্যুত্ ও সম্পদের মালিকানা। আর শিক্ষার মধ্যে রয়েছে স্কুলে উপস্থিতির হার ও প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করা।

বাংলাদেশের বহুমাত্রিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ১০টি মানদ্লের মধ্যে স্কুলে ভর্তির হার ২৫.৩ শতাংশ এবং স্কুলে উপস্থিতির হার ৯.৫ শতাংশ, যা আরও কম। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুমৃত্যুর হার ১.৩ শতাংশ ও পুষ্টিগ্রহণের হার ৮.৭ শতাংশ। এর মধ্যে ৪.৬ শতাংশ মানুষ বিদ্যুত্ ও ১.৪ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি সুবিধা পেয়ে থাকেন। উক্ত জরিপ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, অতি প্রয়োজনীয় এ সব মানদ্লেরও আশানুরূপ প্রতিফলন ঘটছে না। আর এ জন্য শুধু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নীতি নির্ধারণী মহলকে একতরফাভাবে দোষারোপ করাটাও যৌক্তিক হবে না। কেননা, আলোচ্য জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য একটি অংশের মধ্যে অংশগ্রহণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ব্যাপারে তীব্র অনীহা ও অনাগ্রহ কাজ করে। এ সব কারণে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সব কাজে অগ্রসর হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না-ও করতে পারে। কিন্তু আমাদের এই চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতাকে আমলে নিয়েই নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।

জাতিসংঘ ঘোষিত ১৭টি টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচীর প্রথম অভীষ্টেই দারিদ্র্য বিলোপের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে সর্বত্র সব ধরণের দারিদ্র্যের অবসানের কথা বলা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বিকভাবে ও পরিপূর্ণ মাত্রায় দারিদ্র্যের অবসান ঘটাতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা একটি সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপই বটে। কর্মসূচীর ১.খ.১ নং উপ-ধারায় বর্ণিত হয়েছে যে, নারী, দরিদ্র ও অরক্ষিত (সংকটাপন্ন) জনগোষ্ঠীকে অসামঞ্জস্যভাবে সেবা প্রদান যাতে না করা হয় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট খাতসমূহের সরকারি রাজস্ব ও মূলধনী ব্যয়ের অনুপাতের কথা উঠে এসেছে।

নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে বিদ্যমান দারিদ্র্যের প্রবণতা হ্রাসকল্পে সর্বক্ষেত্রে সম্পদের সুষম বণ্টন, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমসমূহে যুবসমাজের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ, সামাজিক সমতা বিধান, সঞ্চয় বৃদ্ধি, কৃষি উন্নয়ন, শিল্পায়নের দিকে মনোযোগ বৃদ্ধি, কুটির শিল্পের প্রসারকল্পে উদ্যোগ গ্রহণ, বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ, গণমুখী প্রশাসনিক কাঠামো সৃষ্টি, স্বেচ্ছাসেবী কার্যাবলির তত্ত্বাবধানসহ স্থানীয় পর্যায়ে কর্মমুখী পরিকল্পনা প্রভৃতি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য দারিদ্র্যসীমা ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার, সম্পদ ও পরিষেবা পাওয়ার সুযোগও বাড়াতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়