ফুটবল পায়ে মাঠে অভিষেক হওয়ার পর থেকেই দর্শকদের মাতিয়ে চলছেন আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি। তার জাদুকরী ফুটবল প্রদর্শনীতে অগণিত ভক্ত তৈরি করেছেন গোটা বিশ্ব জুড়ে। সেই তালিকায় রয়েছে অনেক কিংবদন্তি ফুটবলারও। এবার সেখানে যুক্ত হল জিনেদিন জিদানের নামও। ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী এই মিডফিল্ডার মাঠের লড়াইয়ে কখনো একে অপরের মুখোমুখি না হলেও আফসোস করেন তার সঙ্গে খেলতে না পারার।
এর আগেও বিভিন্ন সময়ে মেসিকে নিয়ে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করতে দেখা গেছে জিদানকে। ২০১৬ সালে যখন রিয়াদ মাদ্রিদের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন সেসময় প্রতিপক্ষ দলের খেলোয়াড় মেসিকে নিয়ে প্রায় সময়ই তাকে দেখা যেত প্রশংসা করতে। ফুটবলার হিসেবে দুজনের ক্যারিয়ারই বেশ সমৃদ্ধ। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ব্যালন ডিঅ’র জেতা খেলোয়াড়দের ছোট যে তালিকা, সেখানে আছেন জিদান ও মেসি দুজনই। আরেকটা জায়গাতেও তাদের মিল আছে, সেটা হলো এই দুই তারকাই বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করেছেন (জিদান ১৯৯৮ সালে এবং মেসি ২০২২ সালে)।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিখ্যাত জার্সি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান প্রথম মুখোমুখি আলাপচারিতায় বসেছিলেন দুই প্রজন্মের ফুটবলের দুই জাদুকর লিওনেল মেসি ও জিনেদিন জিদান। পরে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সেই আলাপচারিতায় মেসিকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন ৫১ বছর বয়সি জিদান। ভিডিওর শুরুতেই জিদান মেসিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘এটা বেশ দুঃখজনক যে, আমরা একসঙ্গে খেলতে পারিনি। আমি অনেকটা দূর থেকে এসেছি। তবে তোমার সঙ্গে ফুটবল সম্পর্কে কিছু কথা বলতে পারাটা আনন্দদায়ক। কারণ সবাই এটা শুনতে চায়।’ এরপর মেসিও ফরাসি কিংবদন্তি জিদানের প্রতি তার ভালোলাগার বিষয়টি তুলে ধরেন।
বলেন, ‘প্রথমত এটা আমার জন্যও আনন্দের। কারণ আপনি জানেন, আমি আপনাকে কত শ্রদ্ধা করি। আমার কাছে তিনি ইতিহাসের সেরাদের একজন, আমি আপনাকে অনেক সম্মান করি, একসঙ্গে খেলার জন্য ভাগ্য আমাদের সহায় হয়নি। তবে আমরা একে অপরের বিপক্ষে কিছুটা খেলেছি। তিনি সবার চেয়ে ভিন্ন ছিলেন, লম্বা, জাদুময়, তার মধ্যে সবকিছুই ছিল।’
একপর্যায়ে জিদানকে বলা হয় কয়েক শব্দে মেসিকে বর্ণনা করতে। কিন্তু ফরাসি কিংবদন্তি কেবল একটি শব্দই উচ্চারণ করলেন। বলেন, ‘জাদু। মেসি আর আমি প্রতিদিন একসঙ্গে থাকি না। তাই আজকের দিনটি আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ, আমি বলতে পারি, তাকে কতটা ভালোবাসি। এবং আমি মনে করি, এটা জাদু, খাঁটি জাদু। বল রিসিভ করার আগেই সে জানে কী করতে হবে এবং বিশেষ করে আমার জন্য যে কি না ফুটবল বোঝে। আমি প্রায়ই জানতাম তুমি কী করতে চলেছ। জিনিসটা একটি সংযোগের মতো। তবে সে যা করে সেটা দেখার পর আমি বলি, ঠিক এমনটাই হওয়ার ছিল। এটাই তো মানুষ দেখতে চায়। এমন ফুটবলার খুব কমই আছে। কিন্তু কেউই তার মতো নয়।’
একই ভাবে জিদানকে বর্ণনা করতে গিয়ে মেসি বলেন, ‘তিনি শুধু আমার সামনে বসে আছেন বলে বলছি না। তাকে আমি সবসময়ই বেশ শ্রদ্ধা ও পছন্দ করি। মাদ্রিদে থাকতে তাকে প্রচুর অনুসরণ করেছি আমি এবং তিনি আমাকে প্রচুর ভুগিয়েছেনও। কারণ, আমি বার্সেলোনা থেকে এসেছি। তিনি সবসময়ই একজন ভিন্ন ধরনের খেলোয়াড়। সৃজনশীলতা, শিল্প, জাদু- সবকিছুই তার মধ্যে ছিল। আমি বিশ্বাস করি, তিনি ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়। তাকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি আছে।’ এসময় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মেসি বলেছেন, ‘চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে লেভারকুসেনের বিপক্ষে তিনি বাঁ পায়ে যে গোলটি করেছিলেন, বিশ্বকাপ ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই গোল দুটো, সেই রুলেট ড্রিবলিং, ভ্যালেন্সিয়ার মাঠে বাঁ পায়ের সেই গোলটি; আমরা যারা ফুটবল ভালোবাসি তাদের কাছে এসব ছিল উপভোগের। আমিও প্রচুর উপভোগ করেছি। এমনকি এটা আমার জন্য হজম করা কিছুটা কঠিনও ছিল। কারণ আমি একজন বার্সা ভক্ত। তবে কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের জার্সি-দেশ এসব দিয়ে বিবেচিত করা হয় না, তারা এরও ঊর্ধ্বে।’
ভিডিওতে মেসি জিদান দুজনই আর্জেন্টিনার প্রয়াত কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনাকে স্মরণ করতে দেখা যায়। মারাদোনাকে নিয়ে মেসি বলেন, ‘আমাদের পুরো জীবনে আমরা যারা ফুটবল খেলে বড় হয়েছি, তারা তার (মারাদোনা) মতো হতে চেয়েছিলাম। যদিও কেউ তার মতো হতে পারেনি, এটি আমাদের স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা ছিল। তিনি যা করেছিলেন তা অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম।’ ভিডিওর শেষ মুহূর্তে দুজন দুজনকে নিজেদের স্বাক্ষর করা জার্সি বদল করেন।