‘মাটির দেয়াল তুলে ঘরটি নির্মাণ করছিলাম। কাজ প্রায় শেষের দিকে। কিন্তু টাকার অভাবে টিন দিতে পারিনি। ওপরে প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে কোন রকম থাকছিলাম। রাতে খাওয়া শেষে আমার স্ত্রী ও তিন সন্তান এক কক্ষে ঘুমায়। আমি আরেক কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তখন প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। রাতে হঠাত্ ঘরের দেয়াল ভেঙে পড়ে আমার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে মাটির নিচে চাপা পড়ে ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যায়। আমার ছেলে দিনমজুরি কাজ করে সংসার চালাত। কল্পনাও করিনি এভাবে একসঙ্গে পরিবারের সবাইকে হারাতে হবে। আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম।’
স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে হারিয়ে বিলাপ করছিলেন ফকির আহমদ। ঘূর্ণিঝড় ‘মিধিলি’র প্রভাবে অতি বর্ষণে কক্সবাজারের টেকনাফে নির্মাণাধীন ঘরের মাটির দেয়াল চাপায় এই পরিবারের ৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার ভোরে উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড মৌলভীবাজারের মরিচ্যাঘোনায় এ ঘটনা ঘটে।
এদিকে গতকাল শুক্রবার ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশ স্থলভাগ অতিক্রম কালে উপকূলজুড়ে ভারী বর্ষণ হয়েছে। উপকূলের ১০ জেলায় বাতাসের গতিবেগ ছিল গড়ে ৮০ কিলোমিটার। চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলে ডাল ভেঙে আরো দুই জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় রেললাইনে গাছ পড়ে চট্টগ্রাম-সিলেট ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হয়। বিভিন্ন স্থানে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে। বিদুিবহীন ছিল বহু এলাকা।
টেকনাফের হ্নীলা ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদ মোহাম্মদ আলীর বরাত দিয়ে ইত্তেফাকের কক্সবাজার প্রতিনিধি ও টেকনাফ সংবাদদাতা জানান, নিম্নচাপের প্রভাবে বুধবার রাত থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সারাদিন এবং রাতেও অব্যাহত ছিল বৃষ্টিপাত। শুক্রবার ভোরের দিকে মরিচ্যাঘোনায় ফকির আহমেদের মাটির তৈরি ঘরের দেয়াল ধসে তার পরিবারের চারজন মারা গেছেন। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় এলাকার সড়কটি কাদায় ভরে ছিল। ফলে দুর্ঘটনাস্থলে যেতে বেগ পেতে হয়।
নিহতরা হলেন, ফকির আহমদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৫০), ছেলে সাইদুল মোস্তফা (২০) ও দুই মেয়ে নিলুপা বেগম (১৮) ও সাদিয়া বেগম (১১)। স্থানীয় ইউপি মেম্বার বশির আহমদ বলেন, ঘটনা জানার পর আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে নিহতদের মাটিচাপা থেকে উদ্ধারের কাজ শুরু করেন। সবাইকে বের করা গেলেও তারা ঘটনাস্থলেই মারা যান বলে তিনি উল্লেখ করেন।
টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী জানান, একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু খুবই মর্মান্তিক। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের জনপ্রতি ২৫ হাজার করে ১ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এছাড়া তাদের দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
আঘাত হেনে দুর্বল ‘মিধিলি’: এদিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘মিধিলি’র কারণে কক্সবাজার সমুদ্র উপকূলে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখানোর পর উত্তাল হয়ে উঠে সাগর। বিকেলে ‘মিধিলি’ বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানার পর দুর্বল হয়ে পড়ে। গতকাল শুক্রবার বেলা চারটার দিকে দেওয়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। ‘মিধিলি’ দুর্বল হয়ে যাওয়ায় মোংলা ও পায়রা বন্দরে দেওয়া সাত নম্বর এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বন্দরের ৬ নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ঘণ্টায় ৮৮ কিলোমিটার গতির বাতাসের শক্তি নিয়ে শুক্রবার বেলা ১টার দিকে উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ‘মিধিলি’। পরের দুই ঘণ্টায় বৃষ্টি ঝরাতে ঝরাতে বেলা ৩টার দিকে তা পুরোপুরি স্থলভাগে উঠে আসে। এরপর ধীরে ধীরে তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এর আগে বুধ ও বৃহস্পতিবার কক্সবাজারে কখনো গুঁড়ি আবার কখনো মাঝারি বৃষ্টিপাত হয়। শুরু হয় বাতাসও। সবার মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়লেও গতকাল সন্ধ্যার আগেই স্বস্তি নেমে আসে । তবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বৃহস্পতিবার থেকে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় সেন্টমার্টিনে আটকা পড়েছে ৪ শতাধিক পর্যটক।
ডাল ভেঙে মাথায় পড়ে ব্যবসায়ী ও শিশুর মৃত্যু:বাসাইল (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দমকা হাওয়ায় টাঙ্গাইলের বাসাইলে গাছের ডাল ভেঙে মাথায় পড়ে আব্দুর রাজ্জাক (৪০) নামের এক ব্যবসায়ীর মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে উপজেলা পরিষদ গেটের সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত রাজ্জাক উপজেলার মিরিকপুর গ্রামের কুসুম মিয়ার ছেলে। তিনি বাসাইল বাজারের কোটিপতি মার্কেটে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার পাপিয়া আক্তার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘আমরা নিহতের পরিবারের পাশে আছি।’
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় ‘মিধিলি’র প্রভাবে দমকা হাওয়ায় গাছের ডাল ভেঙে মাথায় পড়ে সিদরাতুল মুনতাহা নামের তিন বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিকেলে উপজেলার জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের মহানগর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। মুনতাহা ওই গ্রামের হাসমত আলী ভূঁইয়া বাড়ির আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়ার কন্যা।
ঝড়ে রেললাইন ভেঙে পড়লো গাছ, ঢাকা থেকে চট্রগাম-সিলেটগামী ট্রেন চলাচল বন্ধ
রেল লাইনে গাছ, ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত:ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, বৈরী আবহাওয়ায় সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে জেলার সদর উপজেলায় কালিসীমা নামক এলাকায় রেললাইনের ওপর একটি গাছ পড়ে যায়। এর ফলে ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম ও সিলেটগামী ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। চট্রগ্রামগামী ননস্টপ সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেন আশুগঞ্জের তালশহর রেলস্টেশনে সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্টপেজ দিতে হয়েছে বলে জানান ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশনের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার জসিম উদ্দিন।
বন্দরে হ্যান্ডলিং ব্যাহত: চট্টগ্রাম অফিস জানায়, শুক্রবার বিকালে ঘুর্ণিঝড়টি উপকূল অতিক্রমকালে চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে প্রায় এক ঘন্টা থেমে থেমে অস্থায়ী ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। সন্ধ্যা নাগাদ কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর মেলেনি। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক উইং কমান্ডার তাসনিম আহমেদ বিকালে ইত্তেফাককে বলেন, বিমানবন্দরে সারাদিন সব ধরনের বিমান উঠানামা স্বাভাবিক ছিল। কোনো কিছু ব্যাহত হওয়ার খবর নেই। চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ঝড়ো বাতাস ও বৃষ্টিপাতের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য হ্যান্ডলিং কার্যক্রম কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে। বহির্নোঙরে এরকম আবহাওয়ায় কখনো লাইটারিং কার্যক্রম চলে না, সুতরাং প্রবল ঢেউ-বৃষ্টি-বাতাসে গতকালও চলে নি।
মেঘনায় ২ ট্রলার ডুবি : মনপুরা (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, বিকালে মেঘনায় ২টি মাছ ধরার ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। ৩ জেলে নিখোঁজ হওয়ার ৩ ঘন্টা পর উদ্ধার করেছেন স্থানীয় হাজিরহাট ইউনিয়নের দাসেরহাট গ্রামের জেলেরা। উদ্ধার হওয়া জেলেদের মনপুরা সদর হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে।
বরিশালে জলাবদ্ধতা, সাপ আতঙ্ক :বরিশাল অফিস জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বরিশালে মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। এতে নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের সকল রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। নগরবাসী বিপাকে পড়ে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চলাচলের প্রধান সড়কগুলোতে হাঁটু পানি জমেছে। বিভিন্ন এলাকায় সাপ আতঙ্ক দেখা দেয়। নগরীর ১নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার গলিতে রীনা বেগমকে (৬৫) বিকেল ৪টার দিকে নিজ বাড়িতে সাপে কামড় দিলে দ্রুত তাকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বরিশালের অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লা রুটে সকল ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল।
গাছ ভেঙে সড়কে: নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জেলার উপকূলজুড়ে সড়কের বিভিন্ন অংশে গাছ ভেঙে পড়ে। এতে সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিদ্যুত্ সংযোগ। হাতিয়ার প্রায় ২০ শতাংশ আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠে থাকা শীতকালীন সবজিরও ক্ষতি হয়েছে।