শিশুদের ঠাঁই কেন পথে  

সারা বিশ্বে আজ ২০ নভেম্বর পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশু দিবস। শিশুদের মধ্যে বোঝাপড়া বৃদ্ধি করা, জাতিসংঘ সনদের মূল্যায়ন ও শিশুদের কল্যাণে পদক্ষেপ গ্রহণে সারা বিশ্বে দিবসটি পালন করা হয়। 

শিশু শব্দটি নিষ্পাপ, ভালোবাসার ও মমতার। এক শ্রেণির অশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষের অপরিকল্পিত জন্মদানের ফল পথশিশু। অবহেলায় জন্ম নেওয়া এই শিশুরা বেড়ে উঠেও অবহেলায়। এসব শিশুদের পথশিশু, টোকাই, রাস্তার ছেলে ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। 

শিশুদের বিভিন্ন সমস্যা সম্ভাবনা নিয়ে সরকারি বেশ কিছু দপ্তর কাজ করলেও এসব প্রতিষ্ঠানের কাজে কিছুটা সমন্বয়হীনতা রয়েছে। যার ফলে শিশুরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

রাজধানীর কাওরান বাজার ঘুরে রাজন (১৫) নামে এক শিশুর দেখা মেলে। প্লাস্টিক কুড়িয়ে পেট চালায় সে। রাজন জানায়, প্লাস্টিক কুড়িয়ে কেজি প্রতি ২০টাকা দামে বিক্রি করে। দিন শেষে ৬০-৭০ টাকা আয় করে। তবে এ দিয়ে তার দিন চলে না। 

পড়াশোনার কথা জানতে চাইলে সে বলে, ‘পেটই চলে না, পড়ালেখা আমাদের মতো গরিবদের জন্য না।’

পথশিশু। ছবি: ইত্তেফাক

ছোট্ট জাহানারার (৬) পরিবারসহ ঠাঁই হয়েছে কাওরান বাজারের একটি ভ্যানে। তার বাড়ি রংপুরে। উন্নত জীবিকার উদ্দেশ্যে ঢাকায় চলে আসে তার পরিবার। জাহানারার স্বপ্ন সে বড় হয়ে শিক্ষক হবে। কিন্তু তার মা রজনী জানান, টাকার অভাবে জাহনারাকে এখনো স্কুলে ভর্তি করতে পারেননি।

অন্যদিকে জামাল (১৬) নামে এক শিশু কাওরান বাজারে মাছের আঁশ পরিষ্কার করার কাজ করে। একটি মাছের আঁশ পরিষ্কার করে ১০ টাকা পায়, দিন শেষে ৮০-৯০ টাকা আয় করে। কিন্তু দুর্ঘটনায় অসুস্থ বাবা-মা আর ছোট দুই বোন নিয়ে এই টাকায় তাদের সংসার চলে না।

১৯৫৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ শিশু অধিকার ঘোষণার স্মরণে বিশ্ব শিশু দিবস পালিত হয়। শিশু অধিকার ও সুরক্ষায় প্রত্যেকের অবস্থান থেকে নজর দেওয়া জরুরি। এর পাশাপাশি সাংবিধানিক অঙ্গীকার অনুযায়ী, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে শিশুর সৃজনশীলতার বিকাশ এবং আনন্দময় পরিবেশে শিশুকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমুখী শিক্ষায় গড়ে তোলাও জরুরি।

শিশু অধিকার আদায়ে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় অনেক উন্নয়ন সংস্থা রয়েছে। এই সংস্থাগুলো হলো-ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ড ভিশন, সেভ দ্য চিলড্রেন, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল। বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটির বেশি শিশু-কিশোর রয়েছে। এদের সবার জন্য মৌলিক অধিকারগুলোও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা সহিংসতার শিকার হয় বেশি। শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, তাই এ থেকে তাদের রক্ষা করতে মা-বাবাকে সচেতন থাকতে হবে।

পথশিশু। ছবি: ইত্তেফাক

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সমন্বয়ক শাফিয়া সামি বলেন, ‘জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটির কাছে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ২০১৫ সাল থেকে শিশুবিষয়ক কোনো প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। যার ফলে শিশু অধিকার পরিস্থিতির উন্নতি করার জন্য বাংলাদেশকে জাতিসংঘের ওই কমিটি সমাপনী পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন দেয়নি।’ 

তিনি বলেন, ‘শিশুদের বিভিন্ন সমস্যা সম্ভাবনা নিয়ে বিচার বিভাগ, পুলিশ বিভাগ, সমাজসেবা অফিস ও মহিলা অধিদপ্তর সরাসরি কাজ করছে। এর পাশাপাশি সরকারি আরও বেশ কিছু দপ্তর শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু এসব সংস্থা, প্রতিষ্ঠানের কাজে কিছুটা সমন্বয়হীনতা আছে।’ 

শিশুদের সুরক্ষার জন্য সবার মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার উল্লেখ করে শাফিয়া সামি বলেন, ‘আমাদের শিশুদের সুরক্ষার জন্য সবার মধ্যে সমন্বয় দরকার। আমরা ফিল্ড লেভেল থেকে শিশু সুরক্ষা প্রতিবেদন নিয়মিত পাঠাই। এখন রাষ্ট্র যদি জাতিসংঘে প্রতিবেদন না পাঠায় তাহলে সেই দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে।’

(প্রতিবেদনে শিশুদের গোপনীয়তা রক্ষায় ছবিতে তাদের মুখ ঝাপসা করা হয়েছে।)