নূতন ভাইরাসের আশঙ্কা: আমরা কি সতর্ক হইব না?

করোনা মহামারির কথা আমরা যখন ভুলিতে বসিয়াছি, তখন সারা পৃথিবীতে আবার করোনার সংক্রমণ বাড়িতেছে বলিয়া কিছুদিন আগেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হইয়াছে। বিশেষ করিয়া জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া প্রভৃতি দেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বাড়িতেছে বলিয়া জানা যায়। যদিও তাহা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত রহিয়াছে এবং আবার ব্যাপকভাবে ছড়াইয়া পড়িবার আশঙ্কা তেমন একটা নাই। করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং ইহার আরো উন্নত সংস্করণের সহজলভ্যতা এই রোগ নিয়ন্ত্রণে আমাদের সক্ষমতাকে বৃদ্ধি করিয়াছে।  কিন্তু করোনার উত্পত্তিস্থল চীনে নূতন করিয়া যে অজানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়াছে, তাহাতে আমাদের কপালে ভাঁজ বাড়িতেছে  বইকি। শুধু তাহাই নহে, গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু (ডব্লিউএইচও) স্বয়ং এই ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করিয়া দিয়াছেন। করোনার বেলায়ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সতর্কতামূলক প্রতিবেদন ছাপানো হইয়াছিল শুরুর দিকেই। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অনেক উন্নয়নশীল, এমনকি কোনো কোনো উন্নত দেশও এই বিষয়টি আমলে না নেওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়া যায়। এইবারও কি আমরা অবহেলা ও অসতর্কতার পরিচয় দিয়া নিজেদের বিপদ ডাকিয়া আনিব?

চীনের নূতন ভাইরাসের এই সংক্রমণকে অজানা নিউমোনিয়া হিসাবে দেখানো হইতেছে। এমনিতেই করোনা মহামারির ধাক্কা আমরা এখনো কাটিয়া উঠিতে পারি নাই। ইহার অভিঘাতে বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে মারাত্মকভাবে। এখন আবার এই নূতন আপদ ও বিপদে উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠা দেখা দিয়াছে। খবরে প্রকাশ, অজানা ও রহস্যজনক এই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হইতেছে বেইজিং ও লিয়াওনিংয়ের শত শত শিশু। হাসপাতালগুলিতে তিল  ধারণের ঠাঁই নাই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিপ্রেক্ষিতে চীনা নাগরিকদের শ্বাসযন্ত্রের অসুস্থতার ঝুঁকি কমাইতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাইয়াছে। অনেক তথ্য না পাওয়ার কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক অবগত হওয়া যাইতেছে না। তবে পরিস্থিতি যাহাই হউক, বাংলাদেশকে আগেভাগেই সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া বিমানবন্দর, স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও নৌবন্দরগুলিতে এখন হইতেই নজরদারি বৃদ্ধি করিবার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হইবে। কথায় বলে, সাবধানের মাইর নাই। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলির ইহাই সবচাইতে জরুরি কর্তব্য। গত ১৩ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে এক প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের প্রতিনিধিরা সেই দেশটিতে শ্বাসকষ্টজনিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির বিষয়টি অকপটে স্বীকার করেন। জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থা এক্স-এ পোস্ট করা এক বিবৃতিতে বলা হইয়াছে, আগের তিন বত্সরের একই সময়ের তুলনায় চীনের উত্তরাঞ্চলে অক্টোবরের মাঝামাঝি হইতে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো অসুস্থতা বাড়িয়া গিয়াছে আশঙ্কাজনকভাবে। এখানকার শিশুদের মধ্যে ইহার আগে নির্ণয় করা হয় নাই, এমন নিউমোনিয়ার ক্লাস্টার রিপোর্ট প্রকাশিত হইয়াছে। চীনা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য হইল, শ্বাসকষ্টের অসুস্থতার স্পাইকটি কোভিড-১৯ বিধিনিষেধ তুলিয়া নেওয়া এবং পরিচিত প্যাথোজেনগুলির সঞ্চালনের কারণে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও সাধারণ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বাড়িতে পারে। এমন মুহূর্তে প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব এবং চিকিত্সাবিজ্ঞানীদের নেটওয়ার্ক বাড়ানো উচিত, যাহাতে দ্রুত এই ভাইরাসটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা, সারস-কোভ-২, আরএসভি ও মাইকোপ্লাজমা নিউমোনিয়াসহ পরিচিত প্যাথোজেনগুলির সঞ্চালনের সাম্প্রতিক প্রবণতা ও তাহা মোকাবিলায় বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানানোটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতির কারণে আবার মাস্ক পরিধানসহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের তাগিদ আমরা অনুভব করিতেছি। চীনের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেই ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশেষভাবে নজর দিতে হইবে। যাহারা অসুস্থ তাহাদের হইতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা আবশ্যক। ইহা ছাড়া আবার নিয়মিত হস্ত ধৌত করিবার অভ্যাস আমাদের রপ্ত করিতে হইবে। চীনের নূতন ভাইরাস সম্পর্কে রহস্য উদ্ঘাটন ও সেই অনুযায়ী নূতন টিকার প্রচলন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সজাগ ও সতর্ক থাকিতে হইবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে এখনই এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হইবে।