প্রতিভাবান কৌশলবিদ হেনরি কিসিঞ্জার

হেনরি কিসিঞ্জার সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে, যা ১০০ বছর বয়সে এসে তার মৃত্যুবরণ উপলক্ষ্যে এই অনন্য ব্যক্তিকে বোঝার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রতি আনুগত্য ছিল তার ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটা বড় অংশজুড়ে। ছিল অভাবনীয় কৌশল এবং কিছুটা হাস্যরসবোধ। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় প্রতি সপ্তাহে, কিসিঞ্জার সাবেক রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল ব্রেন্ট স্কোক্রফটের সঙ্গে চলমান বিশ্বরাজনীতি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ফোনে আলাপ করতেন। স্কোক্রফটের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলেও তাদের আলাপ চলত নিয়মিত। এটার সমাপ্তি ঘটে, যখন ২০১৯ সালের আগস্টে স্কোক্রফট মৃত্যুবরণ করেন।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কিসিঞ্জারের অবদান সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে এসব গল্প উল্লেখ না করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আটলান্টিক কাউন্সিলে তিনি যতবারই উপস্থিত হয়েছিলেন, ততবারই ভূরাজনৈতিক জ্ঞানের পাশাপাশি তার অসাধারণ হাস্যরসের আভাস পাওয়া গিয়েছিল। বিশেষ করে, ২০০৯ সালে আটলান্টিক কাউন্সিলের এক বক্তৃতায় হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘আমার যে অনেক শত্রু আছে, তা কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকতে চাইলেও ব্রেন্ট তা হতে দেয় না। কারণ আমার আর ব্রেন্টের মধ্যে যখনই কথা হয় তখনই সে এসব বিষয় তুলে নিয়ে আসে।’

রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার প্রশাসনের শুরুতে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা সবার এক বার হলেও শোনা উচিত। কারণ তিনি সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে তথাকথিত আদর্শবাদী এবং বাস্তববাদীদের যে বিতর্ক রয়েছে, তা নিয়ে তিনি তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী একজন বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতির প্রতিনিধি হিসেবে হেনরি কিসিঞ্জারের সুখ্যাতি রয়েছে। অধিকাংশ বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘আদর্শবাদীদেরকে বৈদেশিক নীতি গঠনে মহত্ মনোভাবের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আর বাস্তববাদীদের বলা হয়, তারা ক্ষমতায় আচ্ছন্ন এবং যে কোনো ধরনের কৌশলগত পরিকল্পনায় তারা ক্ষমতার প্রয়োগ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না।’

পরস্পরবিরোধী এই দুটি ধারণার পরিবর্তে কিসিঞ্জার আন্তর্জাতিক রাজনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক আবেগ বোঝার জন্য একটি বিকল্প উপায়ের ধারণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একজন আমেরিকান হিসেবে গণতন্ত্র ব্যতীত অন্য কোনো নীতিতে বিশ্বাস করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমার মতো একজন অভিবাসী আমেরিকার আদর্শগত গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছে। কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ককে বুঝতে হবে জাতির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে তিনি যে নীতি গ্রহণ করেছেন, তা কতটুকু সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সময়সীমার মধ্যে যেসব রাষ্ট্রীয় উদ্দেশ্য অর্জন করা যায় না, তা কোনোভাবেই আদর্শবাদী নীতি হতে পারে না। বৈদেশিক নীতি যদি আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণে জাতীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, এমনকি এটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষের দিকেও নিয়ে যেতে পারে।’

তিনি বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কখনোই একজন প্রেসিডেন্টের সময়সীমার মধ্যে পুরো বিশ্বকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে পারবে না। সবাইকে জানাতে হবে যে, আমরা বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। কিন্তু চাপ প্রয়োগ করে কিংবা সংঘাত সৃষ্টি করে একটা প্রেসিডেন্টের নির্দিষ্ট মেয়াদে চীন বা রাশিয়ার মতো বড় বড় দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। রাশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা শত শত বছর ধরে বিবর্তিত হয়ে আসছে। আমরা তাদেরকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান করতে পারি কিন্তু কোনোভাবেই চাপ প্রয়োগ করতে পারি না। বিশ্বব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। চাপ প্রয়োগ করে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব।’

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একজন বিদেশি সংবাদদাতা এবং পরবর্তীকালে একজন কূটনৈতিক সংবাদদাতা হওয়ার কারণে কিসিঞ্জারকে কাছ থেকে জানার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সময়ে সময়ে তার সঙ্গে বিভিন্ন পাবলিক কনফারেন্সে সরাসরি কথা হয়েছে। আমাদের আটলান্টিক কাউন্সিল বোর্ডের সদস্য ছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের মহান কৌশলবিদদের মধ্যে কিসিঞ্জার, স্কোক্রফট এবং প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেবিগনিউ ব্রজেন্সকি ছিলেন অন্যতম। তারা সবাই বুঝতে পেরেছিলেন, ট্রান্সআটলান্টিক সম্প্রদায় সব সময়ই আমেরিকার স্বার্থ এবং বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। ২০১৫ সালে গ্লোবাল সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে কিসিঞ্জার বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতিসংঘ এবং অন্যান্য ইউরোপীয়ান সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা আসলে কী অর্জন করার চেষ্টা করছি? আমরা কী প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছি? আমাদের লক্ষ্য অর্জনে আমরা কি ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত? কারণ ভবিষ্যতের প্রয়োজনে বর্তমানে সাময়িক ত্যাগ ছাড়া মহান কিছু অর্জন করা সম্ভব নয়।’ 

তার দীর্ঘ রোমাঞ্চকর কর্মজীবনে নিক্সনের শাসনামলে হোয়াইট হাউজে কিসিঞ্জারের অবদান অনস্বীকার্য। আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণে কিসিঞ্জারের উপস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহু সমস্যার সমাধান করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক স্থাপনে এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধের অবসান থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি ও পারমাণবিক উত্তেজনা কমিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তার অপরিহার্য অবদান রয়েছে। নিক্সন ও রাষ্ট্রপতি জেরাল্ড ফোর্ডের মন্ত্রিসভায় থাকাকালীন কিসিঞ্জার অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। বিশ্বকে সমুন্নত রাখার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। যে কোনো ধরনের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার এক অভাবনীয় ক্ষমতা ছিল তার।

এই বছরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে তার প্রাক্তন ছাত্র, হার্ভার্ডের প্রফেসর গ্রাহাম অ্যালিসনের সঙ্গে একটি কথোপকথনে কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার প্রতিবাদে রাশিয়া যে ইউক্রেন আক্রমণ করেছে, তাতে রাশিয়ান আক্রমণ প্রতিরোধে ইউরোপ আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তিনি ইউক্রেনকে সহায়তা করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের প্রশংসাও করেছেন। কিসিঞ্জার সর্বদা ট্রান্সআটলান্টিক আদর্শ লালন করতেন। তিনি একজন অতুলনীয় চিন্তাবিদ ছিলেন, যার অভাবনীয় দক্ষতা ও অন্তর্দৃষ্টি তাকে অন্যসব কৌশলবীদ থেকে পৃথক করেছে।

২০১৫ সালে আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল সিটিজেন অ্যাওয়ার্ডের বক্তব্যে স্কোক্রফট বলেন, হেনরি কিসিঞ্জার এমন একজন ব্যক্তি, যিনি জানেন কীভাবে ক্ষমতা ও নীতিকে যথাযথ অনুপাতে একত্র করে সমস্যার সমাধান করতে হয়।

লেখক : আটলান্টিক কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)

আটলান্টিক কাউন্সিল থেকে অনুবাদ : আব্দুল্লাহ আল মামুন