পূর্ব লন্ডনে হতাশা ক্ষোভে অনুষ্ঠিত হলো বৈশাখী মেলা

টাওয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিলের বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেন নিকটস্থ উইভার্স ফিল্ডস (Weavers Fields) পার্কে রবিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলা নববর্ষের বৈশাখী মেলা।

তবে কয়েক বছর আগে মেলা কেন্দ্র করে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ আজো তদন্ত না হওয়ায় কমিউনিটিতে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন কমিনিটির নেতৃবৃন্দ। নানা দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৫ সালে কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়রের পদ থেকে লুৎফুর রহমান বরখাস্ত হলেও বর্তমান মেয়র জন বিগস একই দুর্নীতি লালন করছেন বলে বাঙালি কমিউনিটিতে সৃষ্টি হয়েছে হতাশা।

এ প্রসঙ্গে কাউন্সিলের সাবেক নির্বাহী ডেপুটি মেয়র ওহিদ আহমেদ  বলেন, ‘বর্তমানে মেলা পরিচালকদের বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় বৈশাখী মেলা নামেমাত্র অনুষ্ঠিত হচ্ছে।’ সংস্কৃতি বিচারে এটাকে বৈশাখী মেলা বলা যায় না- উল্লেখ করে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘এমনকি এ মেলায় গণমাধ্যমের কোনো অংশগ্রহণ নেই। কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ সংবাদপত্রের নজর কাড়তে ব্যর্থ হয়েছে। আগে যেভাবে মেলা উদ্যোক্তা পক্ষ বিজ্ঞাপন দিয়ে নানাভাবে  প্রচারণা চালাতেন এবং সাংবাদিকদের সম্পৃক্ত করতেন বর্তমানে তা করা হচ্ছে না।ফলে মানুষ জানতেই পারছেন মেলা সম্পর্কে’

আরও পড়ুন:  ‘ইমান’ রক্ষায় অভিনয় ছাড়লেন বলিউড অভিনেত্রী

এদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রতিকূল আবহাওয়া ও রমজান মাসের কারণে এপ্রিল মাসে মেলা আয়োজন করা সম্ভব না হওয়ায় বিগত প্রায় দেড়যুগ ধরে মে-জুন মাসের মধ্যে কোনো একটি রৌদ্রুজ্জ্বল দিনে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

অবশ্য মেলা শুরুর ইতিহাস প্রায় দুইযুগ আগে।তখন কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে কমিটি গঠন করে অথবা কাউন্সিলের আংশিক বা সম্পূর্ণ সহযোগিতায় মেলা উদযাপন করা হতো।তখন ৭০-৮০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটতো মেলায়।এসময়ে মেলার খবর সংস্কৃতি সংবাদ হিসাবে বিবিসি সহ ব্রিটেনের মূলধারার সংবাদ মাধ্যমে স্থান পেতো।

একপর্যায়ে মেলা লাভজনক দেখে বৈশাখী ট্রাস্ট নামের একটি বেসরকারি কোম্পানির নামে মেলা পরিচালনার দায়িত্ব দখলে নিয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সিরাজ হকের নেতৃত্বে মেলা অনুষ্ঠিত হয়।তার বিরুদ্ধে মেলাকে কেন্দ্র করে মানব পাচার সহ কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড তসরূপের মারাত্মক দুর্নীতির অভিযোগে উঠলে  টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ  ২০১৬ সাল থেকে মেলা আয়োজনের  দায়িত্ব হাতে নেয়। সে থেকেই কাউন্সিলের সম্পূর্ণ তত্ত্বাবধানে মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে মূলধারার ইংরেজি সংবাদপত্রে বলা হয়, নির্লজ্জ দুর্নীতি এবং কমিউনিটির অভ্যন্তরীণ নানা কোন্দলে এই ঐতিহ্যবাহী মেলার প্রতি অন্তত ৫ লক্ষ মানুষের আকর্ষণ হারিয়েছে।বহুজাতিক সংস্কৃতি প্রেমী ব্রিটিশ মূলধারার জনগোষ্ঠীর কাছেও বৈশাখী মেলা ছিল অনন্য বিনোদনের মেলবন্ধন।আজ সকলেই নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে মেলা থেকে।

এ প্রসঙ্গে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সাংবাদিক ও সাপ্তাহিক জনমত পত্রিকার অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, বর্তমানে কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত বৈশাখী মেলায় বাঙালি কমিনউনিটির কোনো সম্পৃক্ততা নাই।আমাদের সংস্কৃতির কোনো আমেজ  পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রকৃতঅর্থে এ মেলার প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতি। তার কোনো  প্রতিফলন না থাকায় এ মেলা আকর্ষণ হারিয়েছে সকলের কাছে।এই মেলাকে সর্বজনের কাছে জনপ্রিয় করতে মেলার শুরুর কর্তৃপক্ষ বাঙালি কমিউনিটি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি সকল গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।আগে বাংলা ভাষার প্রিন্ট মিডিয়া ও কমিউনিটি টেলিভিশনের ভূমিকা ছিল অসধারণ। টেলিভিশনগুলো নিজস্ব অর্থায়নে মেলার সম্পূর্ণ কার্যক্রম লাইভ দেখাতো।ফলে সকলেই মেলায় চলে আসতো।এখন মিডিয়া অবহেলিত বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, বৈশাখী মেলার শোভাযাত্রা মোটামুটি ঠিক থাকলেও মূল অনুষ্ঠানের ব্যাপারে পুরোটাই আমি হতাশ।

উল্লেখ, ঢাকায় যুক্তরাজ্য দূতাবাসে ২০১২ সালে মেলাকে কেন্দ্র করে বিজনেজ ভিজিট ভিসার আবেদন করলে ১৯ জনকে ঢাকা পুলিশ গ্রেপ্তার করে।এসময়ে পুলিশের কাছে তারা স্বীকার করেন যে  স্পনসর লেটারের জন্য তারা মেলার আয়োজক  সিরাজ হককে ১ মিলিয়ন পাউন্ড প্রদান করেছে। এসময়ে এবিষয়ে হোম অফিস, স্থানীয় তৎকালীন পার্লামেন্ট মেম্বার, কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ এই দুর্নীতি ও ভুয়া শিল্পী-পারফর্মারদের ভিসা পেতে সহায়তার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এ মর্মে তখন সংবাদপত্রে খবর প্রকাশ হয়।এসব কারণেই কমিনিউটির মানুষ  মেলা থেকে মুখ ফিরিয়েছে। যা আজো মেলাকে সার্বজনীন করা সম্ভব হয়নি এমনটি বলছেন, লন্ডন মহানগর বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও ব্রিকলেলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সামসুদ্দিন শামস। এসত্বেও অনেকের কাছেই বৈশাখী মেলা প্রাণের উচ্ছাস বলে মনে করেন কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ।

এবারের মেলার মূল স্টেইজে উপস্থনায় ছিলেন লন্ডন ভিত্তিক শিল্পী রোনি মির্জা এবং বিবিসি এশিয়া নেটওয়ার্কের নাদিয়া আলী।সংগীত পরিবেশন করেন ব্যান্ড সংগীত শিল্পী ইমরান, লোকসংগীত শিল্পী লাভলি দেব ও বেলি আফরোজ।

এনিয়েও দর্শক শ্রোতাদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।মেলায় আগত অনেকেই বলছেন, সিরাজ হক এর আগে ইন্ডিয়ার হিন্দি গানের শিল্পীদের দিয়ে হিন্দি গান পরিবেশন করতেন।এর পরিবর্তে অন্তত কয়েকজন বাংলাদেশি শিল্পী এসেছেন। তারা ক্ষোভের সাথে বলেন, বাংলাদেশে বিশ্বমানের অনেক শিল্পী রয়েছেন।এমনকি লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটিতে বাংলা গানের অনেক শিল্পী রয়েছেন। যারা বিশ্বমানের সংগীত পরিবেশন করেন।তারা কেনো এই মেলায় আমন্ত্রণ পেলেন না তা আমাদের বোধগম্য নয়।

ইত্তেফাক/এমআরএম