উন্নয়ন সংস্থায় দীর্ঘ পথচলা

দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে কাজ করছি

এনজিওতে। খুবই ভালো লাগে নারীদের জন্য কাজ করতে। সর্বদা চেষ্টা করি আমি যেভাবে স্বাবলম্বী হয়েছি সেই প্রচেষ্টা কিছুটা হলেও অবহেলিত নারীদের মাঝে জীবিত থাকুক। এনজিওতে কিছু নির্দিষ্ট অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়

  ওয়াজি তাসনিম

 

ঘুটঘুটে সন্ধ্যা। বাড়ির উঠোনে ছোট্ট খোলা জায়গা। সেই সামান্য জায়গাতেই সাইকেল চালানো শিখছেন সোহেলিয়া আকতার। নতুন যোগদান করেছেন চাকরিতে। গ্রামে থেকে গ্রামে ঘুরতে হয়। সাইকেল চালানোটা তাই বাধ্যতামূলক। পিছনে তার স্বামী একহাতে সাইকেলটা ধরে ভারসাম্য রক্ষা করছেন। উঠোনের এক কোনায় দাঁড়িয়ে তা দেখছে পাঁচ বছরের ছোট ছেলে। একটু চলছেন তো পরক্ষণেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছেন ভারসাম্য হারিয়ে। জীবনের চলার পথটাও নাকি এমনই ছিল সোহেলিয়া আকতারের; এই উঠছেন তো এই পড়ছেন।

 যে সময়ের কথা বলছি সেটা ছিল ১৯৯১ সাল। আজকের আর দশটা সাধারণ নারীর মত জীবন ছিলো না সোহেলিয়া আকতারের। খুবই অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায় তার এরপরই শুরু হয় তার জীবন সংগ্রাম। নিদারুণ দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়েই চলতে থাকেন তিনি। এমনও দিন গিয়েছে যে তিনবেলা খেতেও পাননি। খুবই কষ্ট করে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন। ইতোমধ্যে তার কোল জুড়ে চলে এসেছে প্রথম সন্তান। নতুন দুশ্চিন্তার শুরু সন্তানকে নিয়ে। ভালভাবে মানুষ করতে চান সন্তানকে। এই আশায় চাকরির জন্য আবেদন করেন কেয়ার বাংলাদেশ নামক একটি এনজিওতে। সংস্থাটি নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করে। ক্ষুদ্র ঋণ কিংবা সঠিক পরামর্শ দিয়ে প্রতিনিয়ত অবহেলিত নারীদের সাহায্য করে কেয়ার বাংলাদেশ। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল সোহেলিয়া আকতারের। প্রাথমিকভাবে বগুড়ায় কেয়ার বাংলাদেশের একটি প্রজেক্টে কাজও শুরু করেন। এরপর তাকে পাঠানো হয় গাইবান্ধায়। কাজের তাগিদে একে একে বাইসাইকেল এবং পরবর্তীতে মোটরসাইকেল চালাতে হয় তাকে। কিন্তু সমাজ ছিল তার বিপক্ষে। সেসময় এনজিও কর্মীদের বাঁকা চোখে দেখা হত। অনেকের মত উপেক্ষা করে একরকম জোর করেই যোগদান করেন চাকরিতে। এরপর কাটিয়ে দিয়েছেন ২৭টি বছর। মটরসাইকেলে করে ঘুরেছেন গ্রামের পর গ্রাম। আর পিছনে তাকাতে হয়নি সোহেলিয়াকে।

খুব অল্প সময়ের মধ্যে সংসারকে বলতে গেলে একাই দাঁড় করিয়েছেন তিনি। অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিলেন গ্রামের আরো অনেকের কাছেই। নিতান্তাই জীবনের তাগিদে ঘরের বাহিরে কাজ করা শুরু করলেও কিছুদিন যেতেই নতুন উপলদ্ধি আসে তার মধ্যে। তিনি বুঝতে শেখেন শুধু জীবিকা নির্বাহই নয় একজন নারীর জীবনে সাবলম্বী হওয়াটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

একজন নারীর জীবনে স্বাবলম্বী হওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা জানতেন সোহেলিয়া আকতার। তাই প্রতিটি সময় তার কাজ ছিল নারীদের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। কেয়ার বাংলাদেশেও তার কাজ করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল অবহেলিত সকল নারীদের পাশে দাঁড়ানো। সংস্থার সাহায্যে হলেও তাদের উপকার করতে পারাটা বেশ ভালো লাগতো সোহেলিয়ার। কেয়ার বাংলাদেশের প্রজেক্ট শেষ হয়ে হওয়ার পরে মেরিসটোপস বাংলাদেশে কাজ করেন তিনি। কাজ করেছেন গ্রামীণ আলো ও এসকেএফ ফাউন্ডেশনেও। তার সর্বক্ষণিক কার্যব্যস্ত ছিল নারীদের স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করা।

বর্তমানে সোহেলিয়া কাজ করছেন এসকেএফ ফাউন্ডেশনের একটি পাওয়ার প্রকল্পে। যেখানে মূলত আর্থিক ভাবে নারীদের ক্ষমতায়ন করা হয়। নারীদের উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হতে সাহায্য করে সংস্থাটি। সেই সাথে উদ্যোগতা হতে নারীদের সুযোগ করে দেয় এসকেএফ।

নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করণে দেশের বিভিন্ন জেলায় কাজ করেছেন সোহেলিয়া আকতার। বর্তমানে কাজ করছেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায়। তার সম্প্রতি ইচ্ছে নিজ জেলা বগুড়ায় কাজ করা। বগুড়ার অবহেলিত নারীদের সাহায্য করতে আগ্রহী সোহেলিয়া। একজন নারী হয়ে নারীদের ক্ষমতায়নে কাজ করার অনুভূতি জানতে চাইলে সোহেলিয়া বলেন ‘দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে কাজ করছি এনজিওতে। খুবই ভালো লাগে নারীদের জন্য কাজ করতে। সর্বদা চেষ্টা করি আমি যেভাবে স্বাবলম্বী হয়েছি সেই প্রচেষ্টা কিছুটা হলেও অবহেলিত নারীদের মাঝে জীবিত থাকুক। এনজিওতে কিছু নির্দিষ্ট অর্থ সহায়তা দেয়া হয়। আমি পরিপূর্ণ চেষ্টা করি তা অবহেলিত নারীদের সাহায্যের কাজে লাগানোর। তবে আমার এখন তীব্র ইচ্ছে করে নিজে অর্থ দিয়ে নারীদের সহায়তা করি। তবে এখন পর্যন্ত তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। আমি চাই দেশের প্রতিটি নারী স্বাবলম্বী হোক। আর্থ-সামাজিক ও পরিবারেও নারীদের পরিপূর্ণ ভূমিকা থাকা উচিত্। তবে স্বাবলম্বী হতে নারীদের নিজ ইচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রথম বাঁধা আসবে পরিবার থেকেই তবে পরিবারের বাঁধা প্রতিরোধ করতে পারলে সামাজিক ব্যাঘাতগুলো প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় না, লক্ষ্য স্থির থাকলে একজন অবহেলিত নারীর দ্বারা অনেক কিছুই সম্ভব। আমার ধারণা নারীদের অনপেক্ষিত সাফল্য অর্জন এই দেশে অনেক কঠিন, সংগ্রাম করাটা আবশ্যক। নিজের প্রচেষ্টা থাকতে হবে পরিপূর্ণ তবেই সম্ভব সাফল্য অর্জন’।

সামাজিক কিছু বাঁধা থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে বাবা-মার থেকে পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন সোহেলিয়া। পরিবারেও খুব বেশি বাঁধার সম্মুখীন হননি তিনি। বর্তমানে একটি টার্কি খামার করেছেন। যেখানে কাজ করছে তিনজন নারী। নিজ এলাকায় বেশ সুপরিচিত সোহেলিয়া আকতার। দিন শেষে তার প্রাপ্তির স্থান খুব বাড়তি    কিছু নয়। তবে ২৭ বছরের নিজ কর্ম ও প্রতিষ্ঠিত সন্তান নিয়ে বেশ গর্বিত এই মা।