মো. মতিউর রহমান
সান্তালবাড়ি, বিশেষ করে বক্সা ফোর্ট যাওয়ার বাসনা আমার দীর্ঘ দিনের। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে যাওয়ার পর এ বাসনাকে তীব্রভাবে জাগিয়ে তুললেন দিলীপ দাশ। ভদ্রলোক এনবিএসটিসির আলিপুর দুয়ার শাখায় বাস ডিপোর সাব ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত। গত বছরের ২ ডিসেম্বর বেলা ২টা ৫ মিনিটে এনবিএসটিসির বাসে চেপে বক্সার রোড ধরে ছুটে চললাম গন্তব্যের দিকে। পিডব্লিউডির (কনস্ট্রাকশন) উদ্যোগে দমনপুর পর্যন্ত রাস্তাটি প্রশস্ত ও মসৃণ। পিচঢালা রাস্তার দু পাশের গাছপালা ধুলায় মাখামাখি। তবু সবুজের আয়োজন চোখে পড়ে। পথে পড়ল চৌপতি রেল নর্থ পয়েন্ট স্টপেজ। সান্তালবাড়ি থেকে নেপালিরা কমলা বিক্রি করতে এখানে আসে। এর পরেই দমনপুর ফরেস্ট গেট স্টপেজ। দমনপুরের পরে বক্সা অভিমুখী রাস্তাটা স্বল্প পরিসরের। রাস্তার পাশে বনরাজি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে, তবে খুব একটা ঘন নয়। বনবস্তি লক্ষ করলাম। বস্তির অধিবাসীরা তাদের পোষা গরু ছেড়ে দিয়েছে অগভীর বনে। সেখানে তারা বিচরণ করছে অবাধে। দেখলাম গরম নদী। শীতকালের নদী শীর্ণকায়া। তবে বর্ষাকালে থাকে ফুটন্ত যৌবন। ছোট-বড় পাথরে ভরা এ অঞ্চলের সবক’টি নদী। রাস্তায় পথচারীর চলাচল কম।
আমরা পামুবস্তি পেরোলাম। বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে পৌঁছালাম রাজা ভাত খাওয়া নামক স্থানে। নেপালি ও ভুটানিদের আধিক্য লক্ষণীয়। এলাকাবাসীর জীবিকার উত্স কৃষি ও পশু পালন। সরল, সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত তারা। লোকজন বেশিরভাগই দিনমজুর। রাজনীতি করার সময় তারা পায় না। গোর্খা ল্যান্ড আন্দোলনের প্রভাব নেই। আমার সঙ্গে ছিলেন আলিপুর দুয়ার নিবাসী জ্যোতিন্দ্রনাথ ভাদুড়ী ও নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স নেওয়া কিমলা রাই। আলিপুর দুয়ার থেকে বক্সার দূরত্ব মাত্র ২৯ কিলোমিটার। রাস্তা চিরে বয়ে গেছে পার্বত্য ছড়া—বক্সা ছড়া। বর্ষায় ফুলেফেঁপে ওঠে এর সব শাখা-প্রশাখা। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনপদ। বাস ছুটে চলেছে। রাস্তার দু পাশের সমতল ভূমিতে বস্তি। কাঠের প্লাংকিংয়ের ওপরে টিন শেডের বাড়ি। এখানে শিক্ষার হার খুব কম। সম্প্রতি সান্তালবাড়ি মিশনারি মাধ্যমিক ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, নেপালি ভাষার স্কুল প্রতিষ্ঠা করার। এখানে চিকিত্সাব্যবস্থাও অপ্রতুল। ম্যালেরিয়ার প্রভাব আছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র একমাত্র সরকারি চিকিত্সালয়।
ভুটানের সীমান্তবর্তী জনপদ সান্তাবাড়ি। উত্তর ও পূর্ব দিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা। রাজাভাত খাওয়া থেকে অটোযোগে সান্তালবাড়ি এলাম রাত ১০টা ১০-এ। প্রচণ্ড শীতের প্রকোপ এখানে। ২৮ মাইলে রাস্তার বামদিকে এসএসবি ক্যাম্প। কিছু দূরে ফরেস্ট ক্যাম্প। এ দুটো ক্যাম্প ছাড়া কোথাও বৈদ্যুতিক আলো নেই। শাল, সেগুন ও বিভিন্ন গাছে সমৃদ্ধ বনে হাতি, বাঘ, হরিণ, শুকর, বুনো গাই, বুনো মোষ, ময়ুর, বাঁদর ও অজগর সাপের কোনো কমতি নেই। মাঝেমধ্যে বন থেকে হাতি বেরিয়ে এসে ক্ষেতের ফসল ভুট্টা, মাড়োয়া খেয়ে যায়। সমতল থেকে বেশ উঁচু এই সান্তালবাড়ি। ঝরনা থেকে পাইপের সাহায্যে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। আগে থেকে ঠিক করা ছিল ইন্ড থাপার রিসোর্ট-রোবার্স ইনে উঠব। রিসোর্টের পাশ ঘেঁষে সংকীর্ণ পাথুরে রাস্তা। রিসোর্টটি কাঠের দোতলা। সুন্দর ব্যবস্থাপনা। সেখানে বিশ্রাম শেষে বিকেলে রওনা হলাম বক্সা ফোর্টের উদ্দেশে। মাঝে ধোবীখোলা পেরুতে হলো। জনশ্রুতি রয়েছে, কারাগারের কয়েদি, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পোশাকাদি এখানে ধোঁয়া হতো বলে এখানকার নামকরণ হয়েছে ধোবীখোলা।
ফোর্টে ঢুকার মুখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার দুটি চয়ণ পাথরে খোদাই করা। এখন তা অনেকটাই নিষ্প্রভ। আর কিছুদিন পর এই অস্তিত্ব থাকবে কি না সন্দেহ। বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই শেষ চিহ্নটুকু নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে অথচ তা সংরক্ষণে সরকারের কোনো আগ্রহ নেই। স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমে দুর্গ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব পালন করে। দুর্গ সংস্কার ও সংরক্ষণের জন্য তারা গঠন করেছে ‘ফোর্ট বাঁচাও’ কমিটি। এ কমিটি দুর্গ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে সরকারের কাছে। বক্সা ফোর্ট দক্ষিণে অবস্থিত। এর দক্ষিণে ভুটান এবং পূর্বে আসাম। পোর্টের সামনে খেলার মাঠ। একসময় এখানে পুকুর ছিল। জনশ্রুতি আছে, দুটি পুকুরে দুটি সোনার হাঁস ছিল। একটি জয়ন্তী পুকুরে এবং অপরটি আত্মা রায় মাটাং পুকুরে। বক্সা ফোর্ট পাথরেরা উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি প্রাচীর এবং সেই সঙ্গে পোর্টের জরাজীর্ণ দশা। বক্সা ফোর্ট এরপর চুন-সুরকি দিয়ে গাঁথা পাথরের তৈরি জেলের মধ্যে সেল দেখলাম। সেলের ওপরে এখন আর ছাদ নেই। সাধারণ সেলের মতো তিনটি ভিআইপি সেলেরও একই দশা। ভিআইপি সেলগুলোর একটিতে রাখা হয়েছিল নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে। স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রমোদনাথ লাহিড়ীও এই কারাগারে ছিলেন।
তখন যাতায়াতব্যবস্থা না থাকায় সান্তাবাড়ি থেকে ঘোড়া অথবা হাতির পিঠে হাতকড়া পরিয়ে বক্সা ফোর্টে নিয়ে আসা হতো বলে কথিত আছে। সেলের পিছনে কারাগারের সামনে লং টেনিস কোর্ট। ভিআইপি বন্দি এবং কারাগারের কর্মকর্তারা এখানে টেনিস খেলতেন। বঙ্গাব্দ ১৩৮২-র ২৫ বৈশাখ বক্সা বন্দি শিবিরে পালিত হয়েছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী। বিশ্বকবির চরণকমলে নিবেদিত হয়েছিল ঐ অনুষ্ঠান। কবি ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৮ সনে এর প্রত্যাভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন দুই চরণের কবিতায়।
ফোর্ট দেখার পর ইন্দ্রর রিসোর্টে ফিরে এলাম। রিসোর্টের পাশেই ডুকপা জনজাতির লোকেরা নৃত্যগীতের আয়োজন করেছে। এই বক্সাদুয়ার এলাকা বিভিন্ন জনজাতির। এরা হলো :ডুকপা, মঙ্গর, লেপচা ও নেপালি। মঙ্গরদের নিজস্ব লিপি, ভাষা এবং সংস্কৃতি আছে। অন্যান্য জনজাতির সঙ্গে এদের সংস্কৃতির মিল নেই। এরা ধর্মে বৌদ্ধ। তবে বর্তমানে এদের অনেকেই হিন্দু ধর্মের অনুসরণ করে।
ইন্দ্রশংকর ধাপা বংশানুক্রমে শতবর্ষ ধরে এখানকার বাসিন্দা। জানালেন, এখানে যাতায়াতের সুব্যবস্থা নেই। চিকিত্সা ও শিক্ষাব্যবস্থাও তথৈবচ। বর্ষকালে কখনো কখনো একটানা ৭ দিন ধরে বৃষ্টি হয়। ক্ষুব্ধ নদীর উন্মত্ততা তলিয়ে দেয় গ্রাম, জনপদ ও সড়ক। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এলাকাটিতে রয়েছে ১২টি গ্রাম। এগুলো হলো :সদর বাজার, ডাঁড়াগাঁও, খাটা লাইন, লেপচায়া, চুনাভাটি, ওর চিলুম, লাল বাংলা, অসিগাঁও, নামলা, সেউগাঁও, আত্মা ও ফুলবাড়ি সাঁতোথা। জনসংখ্যা ৩ হাজার। ৪টি প্রাথমিক স্কুল আছে। তার মধ্যে আত্মাগ্রামে ও চুনাভাটিতে শিক্ষক নেই। প্যারাটিচারের মাধ্যমে শিক্ষাদানের কাজ চলে।
রাতে রিসোর্টের মালিক ইন্দ্রশংকর থাপা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করলেন। আমরা বিমুগ্ধ হয়ে দেখলাম অভিনয়, গান ও আবৃতিতে তার সমান পারদর্শিতা। পরদিন ফিরে চললাম আলিপুর দুয়ারের দিকে। পথে বারবার মনে পড়েছে পাহাড়ি মানুষ ইন্দ্রর কথা, তার প্রতিভার কথা। তার মতো লুকিয়ে থাকা প্রতিভা বিকাশের উদ্যোগ নিলে সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটে যেতে পারে।
লেখক :মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক