২ ডিসেম্বর আবারও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬। এদিন সকাল ৯টা ৩৫ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে নগরবাসী।
ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পরিমাপক কেন্দ্র থেকে ৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ অঞ্চলে। ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। এই জোনে যে বিপুল শক্তি প্রায় হাজার বছর ধরে সঞ্চিত হয়ে আছে, তাতে যে কোনো সময় ৮ দশমিক ২ থেকে ৮ দশমিক ৯ মাত্রা পর্যন্ত ভূমিকম্প হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা আরো বলছেন, উপত্তিস্থল যত কম গভীরে হবে, বড় ভূমিকম্পের শঙ্কা ততই বেশি।
এবারের ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হওয়াটা স্বস্তির বিষয়। তবে পূর্বাপর ঘটনা আমলে নিলে স্বস্তির কোনো কারণ নেই। বিশেষ করে ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল দেশের অভ্যন্তরে এবং ঢাকার খুব কাছে হওয়ায় চিন্তার ভাঁজ বিশেষজ্ঞদের কপালে। বড় ধরনের ভূমিকম্প যেন আমাদের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে! এজন্য আমাদের করণীয় এবং প্রস্তুতির কথাটিও বারবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু আমরা তো ঘাড়ে এসে না পড়লে সেটির দিকে নজর দিই না! কিন্তু ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ, যার পূর্বাভাস জানার সুযোগ কম।
প্রকৃতি আমাদের বারবার সতর্ক করছে। কিন্তু আমরা সাবধান হচ্ছি না। ফলে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আমাদের ঘিরে রাখছে। বিল্ডিং কোড মেনে না চলা, বন উজাড়, পাহাড় কেটে ধ্বংস করাসহ নানা উপায়ে আমরা যেন ভূমিকম্প নামক মহাবিপদকে ডেকে আনছি।
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা লক্ষাধিক। একই সঙ্গে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট ভূকম্পনেও বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলেও বিশ্লেষকরা বলছেন।
রাজধানীতে দিনদিন বাড়ছে আকাশচুম্বী অট্টালিকার সংখ্যা। অল্প জায়গায় এত বড় বড় স্থাপনা ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি করা হচ্ছে ভবন। এতে স্বল্পমাত্রার কম্পনেই ভেঙে পড়তে পারে অনেক ভবন।
এছাড়া ভূমিকম্প-পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায়ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। তৈরি করতে হবে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। জনসচেতনতার জন্য চালাতে হবে ব্যাপক প্রচারণা। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভূমিকম্প রোধ করা সম্ভব নয়, তবে আমরা নিজেরাই যেন ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি না বাড়াই, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার কোনো বিকল্প নেই।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পে বড় মাত্রার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। না হলেও দেশের চারদিকে ভয়াবহ ভূমিকম্পবলয় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অঞ্চল আমাদের জন্য জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এসব এলাকা থেকে প্রায় সময়ই মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উত্পত্তি হচ্ছে। এর আঘাত সরাসরি এসে পড়ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর।
অতীতের মতো সাম্প্রতিক কালেও এসব এলাকা থেকে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি হওয়ার নজির রয়েছে। বিশেষ করে সিকিম, উত্তর-পূর্বে আসাম ও এর আশপাশের এলাকা থেকে এখন প্রায়ই ভূমিকম্প সৃষ্টি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘনঘন ভূমিকম্পের কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার জন্য দেশের ভেতরে ও বাইরে ভূ-অভ্যন্তরে অধিক শক্তি জমা হয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে ভূমিকম্পের মাধ্যমে তা বের হয়ে আসতে পারে।
ভূমিকম্প এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যাকে আটকানোর কোনো পথ নেই। এ অবস্থায় সচেতনতা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। বিশেষ করে সময় থাকতেই এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। লালনের গানের শরণ নিয়ে বলতে হয়—‘সময় গেলে সাধন হবে না।’
বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ অনেক দূর অগ্রসর হলেও এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ভূমিকম্পকে মোকাবিলা করার মতো প্রস্তুতিতে আমাদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকলে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমানো যায় আর এজন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। জাতীয় উদ্যোগ নিতে হবে ভূমিকম্পের সময় ও তারপর কী করণীয়, সে সম্পর্কে মানুষকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগ্রহণে।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারাভিযান। সরকারি উদ্যোগে ফায়ার সার্ভিস, ভূমিকম্প ব্যবস্থাপনা বাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সব সময় প্রস্তুত রাখতে হবে। ভূমিকম্পের সময় দালান ভেঙে পড়ে বেশি মানুষের ক্ষতি হয়। তাই নির্মাণাধীন বাড়িগুলো বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি করা হচ্ছে কি না, কর্তৃপক্ষকে সে ব্যাপারে তদারকি জোরদার করতে হবে।
উপকূলীয় এলাকা, যেখানে সুনামি, ভূমিকম্প সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির আশঙ্কা বেশি থাকে, সেখানে তৈরি করতে হবে অনেক আশ্রয়কেন্দ্র, যাতে মানুষ বিপদের সংকেত পাওয়ামাত্রই আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতে পারে। যদিও অনেক আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে এবং ইতিমধ্যেই ঝড় জলোচ্ছ্বাসে তার সুফল পাওয়া গেছে। তবু আরো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
লেখক :সাংবাদিক, কলামিস্ট