৭১ এ গুরুদাসপুরের যে ২৩ শহীদকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, তাদের কেউই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি গণকবরগুলোও। গণহত্যার শিকার পরিবারের অর্থায়নে নির্মিত শহীদদের স্মৃতিফলকও এখন নষ্টের পথে। মুছে যাচ্ছে স্মৃতিফলকে লেখা শহীদদের নামও।
কেবল শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এলেই, গণহত্যার শিকার শহীদদের স্মৃতিফলকে ফুল দিয়েই সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস চলে গেলে আর গণহত্যায় শহীদদের স্মৃতিফলক রক্ষণাবেক্ষণে কেউ এগিয়ে আসে না এমন অভিযোগ শহীদ বিষ্ণুপদ ঘোষের স্ত্রী সুনীতি ঘোষের।
তিনি ইত্তেফাককে জানান, পাকিস্তানি সেনারা তার স্বামীকে হত্যার পর বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল। একসঙ্গে ১৬ জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল পাকবাহিনী। সেদিন স্বামীকে হারিয়েছিলেন। হারিয়েছিলেন সর্বস্ব। তবুও যুদ্ধপরবর্তী স্বাধীন দেশে দেবার মতো কোনো পরিচয় পাননি তারা। অনেক কষ্টে শহীদ স্বামীর স্মৃতি রক্ষায় তারা স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছিলেন বছর বিশেক আগে। কিন্তু অর্থাভাবে ঠিক মতো রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেননি। সরকারিভাবেও এগুলো রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন স্মৃতিফলকে লেখা স্বামীর নামটা মুছে যাওয়ার পথে।
সেদিন যা ঘটেছিল
১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের কথা। হঠাৎ পাকিস্তানি সেনাদের গাড়িবহর। একসঙ্গে ১৮ জনের জটলা দেখে গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়েন পাকবাহিনী। প্রত্যক্ষদর্শী সুনীল কুমার গুহ’র মতে, সময় তখন দুপুর ১২টা হবে। উত্তর নাড়ীবাড়ি এলাকায় লাইনে দাঁড় করিয়ে ১৬ যুবককে এবং এবং পাটপাড়ায় ৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি এবং শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, একে একে ২৩টি লাশ মাটি চাপা দেওয়া হয় ঘটনাস্থলেই। এরপর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় নিহতদের বসতবাড়ি। লুটে নেওয়া হয় সর্বস্ব।
গণহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন যারা
পাকবাহিনীর চালানো গুলিতে সেদিন শীতানাথ হালদার, বলরাম হালদার, নীল রতন সরকার, নবরাম মজুমদার, ডা. মনীন্দ্র নাথ সরকার, দীলিপ কুমার সরকার, সুরেশ চন্দ্র মালাকার, মানিক চন্দ্র মালাকার, বিষ্ণুপদ ঘোষ, সুধীর চন্দ্র হালদার, সুবোধ চন্দ্র হালদার, যদুনাথ কর্মকার, দুখুরাম হালদার, দুলাল মালাকার, গেদু মালাকার ও বাদল চৌধুরী প্রাণ হারান।
মুছে যাওয়ার পথে স্মৃতফলকে লেখা শহীদদের নাম
গণহত্যায় নিহত শহীদ দিলীপ কুমার সরকারের পিতা সুধীর চন্দ্র সরকার শহীদ পরিবারগুলোর সহায়তায় সন্তানসহ ২৩ শহীদের স্মৃতিরক্ষায় পৃথক চারটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত সেই স্মৃতিফলকেই প্রতিবছরের শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবসে চলছে শ্রদ্ধা নিবেদন। নতুন করে স্মৃতিফলক নির্মাণ বা পুড়নো স্মৃতিফলক রক্ষণাবেক্ষণে সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
নাটোর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিত কুমার দেব ইত্তেফাককে জানান, বছরখানেক আগে গুরুদাসপুরের তিনটি বদ্যভূমিতে স্মৃতিফলক নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পুড়নো স্মৃতিফলক থাকায় প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
শহীদ পরিবারগুলোর অভিযোগ
শহীদ বিষ্ণুপদ ঘোষের স্ত্রী সুনীতি ঘোষ জানান, স্বামীকে হত্যার পর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। সব হারিয়ে তিনি ছোট দুই ছেলে কৃষ্ণপদ ঘোষ ও বলরাম ঘোষকে নিয়ে পালিয়ে যান। দেশ স্বাধীনের পর এলাকায় ফিরে আসেন। বড় ছেলে কৃষ্ণপদ ঘোষ প্রতিবন্ধী। ছোট ছেলে বলরাম এখন সাইকেল মেকার। এখানো তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। দেশের জন্য সব হারিয়ে কিছুই পাননি তারা।
শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানান, গণহত্যায় নিহত শহীদদের মর্যাদা ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তাদের। একইসঙ্গে স্মৃতিফলকগুলো নতুন করে নির্মাণের দাবিও তাদের।
গুরুদাসপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার ফারুক আহম্মেদ ইত্তেফাককে বলেন, গণহত্যায় নিহতদের তথ্য নিশ্চিত করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি তার।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা আক্তার ইত্তেফাককে জানান, গণকবরগুলো ব্যক্তিগত জায়গায় রয়েছে। এসব পরিবারগুলো রাজি থাকলে স্মৃতিফলকগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেবেন তিনি।