জলাবদ্ধতা নিরসন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্যোগ

রাজধানী ঢাকা সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে ঢাকার জনসংখ্যা দ্রুতহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে বর্ধনশীল জনসংখ্যাকে ঘিরে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসস্থান গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে। এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে উঁচু জায়গা ব্যবহারের পাশাপাশি নিচু জলাশয়সমূহ ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করায় বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক নিম্নগামী ও পার্শ্বীয় প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে বছরের যে কোনো সময়ে অল্প বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। আর এই জলাবদ্ধতায় জনজীবন প্রায়শই দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। নগরজীবন থেকে শুরু করে উত্পাদনমুখী কৃষিক্ষেত্রেও জলাবদ্ধতার প্রভাব প্রকট।

ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণটি মূলত প্রাকৃতিক। পূর্বাঞ্চলীয় ফোল্ড বেল্ট ব্যতিরেকে পুরো বাংলাদেশের সমতল প্লাবনভূমির ভূগর্ভস্থ প্রধান জলাধারটি ডুপিটিলা ফর্মেশনের বালিস্তর দ্বারা গঠিত, যা প্রাকৃতিকভাবে পানি শোষণ, ধারণ ও উত্তোলনে সহায়ক। এই ডুপিটিলা ফর্মেশন বাংলাদেশের বেশির ভাগ সমতল অঞ্চলে সচ্ছিদ্র অ্যালুভিয়াল পললের নিচে অবস্থান করে। তবে ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ জলাধার প্রায় ২০ ফুট থেকে ২৫ ফুটের মতো পুরু মধুপুরগড়ের নিরন্ধ্র ও অভেদ্য আস্তরণে আবৃত থাকায় পানির স্বাভাবিক নিম্নগামী প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, ফলে মাটির উপরিভাগে যে পানি জমা হয়, তা ভূগর্ভস্থ জলাধারে প্রবেশ করতে পারে না।

শুধু রাজধানীতেই এই সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে, এমনটা নয়। ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, খুলনাসহ প্রতিটি মেগাসিটিতেই রয়েছে এই সমস্যা। এমনকি দক্ষিণাঞ্চলের উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও জলাবদ্ধতার প্রভাব প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়। জলাবদ্ধতায় একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হচ্ছে, একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়ছে বাস্তুতন্ত্রেও। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা জরিপে জানা যায়, শুধু যানজটের কারণে ঢাকা শহর প্রতি বছর প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। আর এই যানজটের প্রধান কারণ হলো জলাবদ্ধতা। অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে উন্নত দেশগুলো যানজটের অন্যতম কারণ তথা ‘জলাবদ্ধতা’ রোধে ইতিমধ্যেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং তারা এখন জলাবদ্ধতা থেকে অনেকটাই মুক্ত। তবে আমাদের দেশে এখনো এই সমস্যা সমাধানে তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। এ কারণে মসজিদের শহর, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের শহর ঢাকাকে এখন সবাই জলাবদ্ধতার শহর হিসেবেও চিনে নিচ্ছে।

ঢাকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা জলাবদ্ধতার এই সমস্যা বহু দিনের পুরোনো। বিগত শতকের আশির দশককে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা গড়ে ওঠার একটা ট্রানজিশন পিরিয়ড বলে ধরে নেওয়া যায়। অতীতে ঢাকা শহরে প্রায় ৬৫টি খাল, ২ হাজার পুকুর এবং ২ হাজার ৫০০ ক্যাচপিট ছিল পানি নিষ্কাশনের জন্য। জলাধারগুলো যথেষ্ট পরিমাণে প্রশস্তও ছিল। ফলে শহরের পানি নিষ্কাশনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। দুঃখজনক বিষয়, বর্তমানে ঢাকার মোট ৬৫টি খালের মধ্যে ৪৩টি খালই অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে এবং ২৪টি খাল আংশিকভাবে প্রবাহিত হচ্ছে। একদিকে শহরের আভ্যন্তরীণ খালগুলোর বেহাল দশা, অন্যদিকে আশপাশে থাকা নদীগুলো প্রতিদিন অধিকতর জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় সমস্যা আরো গুরুতররূপ নিচ্ছে।

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন কল্পে ১৯৮৯ সালে ঢাকার পানি নিষ্কাশনের দায়িত্বভার ন্যস্ত করা হয় ঢাকা ওয়াসার ওপর। এরপর প্রায় ৩৩ বছর কেটে গেলেও আশানুরূপ সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয় ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে। কিন্তু জলাবদ্ধতার জুতসই সমাধান হয়নি। এসবের মধ্যে আশার কথা, অধুনা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কয়েকটি বিলুপ্ত ও মৃতপ্রায় খালের পুনরুদ্ধারের কাজে হাত দিয়েছে এবং দু-একটি উদ্ধারও হয়েছে। এসব কাজ সাভাবিকভাবেই ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা জলাবদ্ধতা থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটাতে পারি? এই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে পরিচালিত ‘ওয়াটার লগিং রিস্টোরেশন’ নামক একটি গবেষণা প্রকল্পের কথা উল্লেখ করতে হয়। নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক চালানো প্রযুক্তি ‘রেইনগার্ডেন’ থেকে উত্সাহিত হয়েই মূলত এই প্রকল্পের পরিকল্পনা।

আগেই বলা হয়েছে, সমস্যার অন্যতম একটি বড় কারণ হচ্ছে, ঢাকার ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগ মধুপুরগড়ের লালমাটির অভেদ্য একটি স্তর দ্বারা গঠিত, যেটা ভেদ করে জমে থাকা জলাবদ্ধতার পানি নিচে প্রবেশ করতে পারে না এবং অন্যদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় পানির প্রাকৃতিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন ভূপ্রাকৃতিক অবস্থার এই ভিন্নতা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দূষণের মাত্রা অত্যধিক বেশি হওয়ার কারণে ‘রেইনগার্ডেন’ প্রযুক্তিকে সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব হবে না। তাই আমাদের পরিকল্পনা হলো, যদি আমরা ভূপৃষ্ঠে জমে থাকা এই পানিকে মধুপুরগড়ের লালমাটি পার করিয়ে তার ঠিক নিচে থাকা ডুপিটিলা ফরম্যাশনে পাঠিয়ে দিতে পারি, যেটা ভেদ্য এবং পুরো বেঙ্গল বেসিনে পানিপ্রবাহী একমাত্র স্তরবিন্যাস নামে পরিচিত, তাহলে এই সমস্যার একদিকে যেমন সমাধান হবে, অন্যদিকে ঢাকার পানির স্তর নিচে নেমে শুকিয়ে যাওয়া অংশেও নতুন করে পানি দিয়ে পূর্ণ হবে, যা পানির সমস্যারও সমাধানে কাজে আসবে। সেটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে আমরা খুব সহজেই শহরের কোন কোন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে, তা নির্ণয় করতে পারি। গত দুই বছর আগে আমরা এ ধরনের একটি স্টাডি করেছিলাম। বর্ষা মৌসুমে ঢাকা শহরের কোন কোন এলাকায় জলবদ্ধতা সৃষ্টি হয়, তার একটি মানচিত্র তৈরি করি। আমরা লক্ষ করলাম, আমাদের নিজেদের আবাসন এলাকা শহিদুল্লাহ্ হলই বৃষ্টি হলে পানির নিচে তলিয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষার জন্য জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ্হল প্রাঙ্গণকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যেখানে একটি কূপ স্থাপন করা হয় পরীক্ষামূলকভাবে।

শহিদুল্লাহ্ হলকে আমরা একটি মডেল হিসেবে গ্রহণ করি। যেখানে সবচেয়ে বেশি পানি জমে, সেখানে সঠিক ডিজাইন দিয়ে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি কূপ খনন করা হয়। প্রায় ১ লাখ লিটার পানির প্রবাহ দিয়ে হলপ্রাঙ্গণে একটি কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করা হয়। উপরে যে অভেদ্য মধুপুর ক্লে বিদ্যমান, তাকে পার করিয়ে দিয়ে ডুপিটিলা জলাধার পর্যন্ত পানি পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে দেখা গেল ভালো কাজ হচ্ছে। এভাবে আমরা একটি পাইলট প্রজেক্টের প্রাথমিক ধাপ অতিক্রম করালাম।

এর আগে ভূতত্ত্ব বিভাগে ভূপৃষ্ঠের সম্পূর্ণ স্তরবিন্যাসকে অনুসরণ করে মডেল তৈরি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন মাপের মোট চারটি কূপ ও নালা বসানো হয়েছে জমে থাকা পানিকে সরাসরি ডুপিটিলা একুইফারে প্রবেশ করানোর জন্য। নালা ও কূপের মধ্যে দেওয়া হয়েছে নুড়ি পাথরের প্যাকিং, যেটার জন্য পানি নিচের স্তরে যাওয়ার আগেই পরিশোধিত হয়ে যাবে অনেকটাই। কৃত্রিম পরীক্ষা শেষে আশাব্যঞ্জক ফলাফল পাওয়া যায়। তবে এটাকে আরো টেকসই করার জন্য প্রয়োজন হবে নিয়মিত মনিটরিংয়ের। শহুরে বৃষ্টির পানিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ কাদামাটি থাকে, যেটা বছরে অন্তত কয়েক বার পরিষ্কার না করলে আবদ্ধ করে ফেলতে পারে পানি নিচে যাওয়ার পথ। এজন্যে আলাদা ফিল্টার নিয়মিত বিরতিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যবহার করে ফিরে পাওয়া যাবে আগের কার্যক্ষমতা।

ভূপৃষ্ঠের ওপরিস্থিত পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবহীন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে রাজধানীর জলাবদ্ধতা আক্রান্ত যে কোনো জায়গাতেই। এমনকি দেশের অন্যান্য অধিকাংশ স্থানেই করা যাবে এটার ব্যবহার। জমে থাকা পানি সরাসরি প্রবেশ করানোর জন্য একুইফারে পানির গুণাগুণে এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ জমে থাকা পানিতে অনেক দূষণীয় পদার্থ ও ভারী দ্রবণীয় পদার্থ থাকতে পারে। সেজন্যে কূপে ব্যবহূত ফিল্টারের গুণগত পরিবর্তন করার প্রয়োজনীয়তাও বিবেচনায় রয়েছে।

শহরের জলাবদ্ধতাআক্রান্ত জায়গাগুলোতে যেখানে বিকল্প কোনোই সমাধান নেই, সেখানে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ সর্বোচ্চ ফলাফল বয়ে আনতে পারে। একদিকে যেমন গড়ে ওঠা পরিবেশও তার জায়গাতেই থাকবে, তেমনি সমস্যার কার্যকর সমাধানও পাওয়া যাবে এই ব্যবস্থায়। শহরের জলাবদ্ধ এলাকাসমূহ চিহ্নিত করে এই মডেল প্রয়োগ করে জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। এজন্য যে ব্যয় হবে, সেটাও আমাদের সাধ্যের মধ্যেই থাকবে।

লেখক: প্রফেসর, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন: এম এ খালেক