অনিশ্চয়তা। হতাশা। ব্যবসায় মন্দা। তারপর বৈশ্বিক মহামারি, করোনা। সিনেমা হলে কী আর মানুষ যাবে? দর্শকের হাততালি আর শীষ মারার শব্দ কী শোনা যাবে?
সিনেমার বিরতিতে এই ঠাণ্ডা, ঠাণ্ডা, ঠাণ্ডা বলে কোমল পানীয়র কাচের বোতলে বোতলের বারি খাওয়ার শব্দ কী শোনা যাবে? কিংবা মাল্টিপ্ল্যাক্সে পপকর্ন নেওয়ার জন্য লম্বা লাইনের দৃশ্য কী দেখা যাবে?
সিনেমা শুরুর আগে সিঙ্গেল থিয়েটারে টিকিট কাউন্টার বন্ধ, হাউজফুল লেখা, কালাবাজারীদের হাক‘ এই ডিসি ডিসি ডিসি, রিয়াল রিয়াল রিয়াল’ শব্দগুলো কী শোনা যাবে? অথবা মাল্টিপ্ল্যাক্সে কী টিকিটের জন্য দীর্ঘ সাড়ি দেখা যাবে?
এই আশংকা যে শুধু বাংলাদেশ নিয়ে ছিল, তা কিন্তু নয়। হলিউড-বলিউড সকলেইর একই অবস্থা ছিল। করোনা আমলে শুরু হলো ঘরে বসে ছবি দেখা । মানে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এ বড় বড় ছবি দেখার সুযোগ। মেেন হচ্ছিল, তামাম দুনিয়ার প্রেক্ষাগুলো বুঝি মাঠে মারা গেল। তবে না। ধারনা বদলাতে শুরু করলো ২০২২ আর ২৩ এ। দেশের কথাই বলি। পরান আর হাওয়া সিনেমা দুটিই আসলে বেড়ালের গলায় ঘন্টাটা বেঁধেছিল। সকল বাঁধা দুর করে অন্ধকারে আলো জেলে দিয়েছিল পরান আর হাওয়া। ব্যবসায়িক দিক থেকে হাওয়া, পরানকে ছাড়িয়ে গেল অনেকদূর।
এরই মধ্যে দেশের বাইরে বাংলা ভাষাভাষি যেখানে আছে আমেরিকা-কানাডা-ইউরোপ, অষ্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য সব জায়গায় ঢাকার বাংলা ছবি যেতে শুরু করলো। কিন্তু বিধির বাম। পুরো ২০২২ সালে যে সিনেমাগুলো মুক্তি পেল, তারমধ্যে পরান আর হাওয়া ছাড়া ব্যবসায়িক চমক দেখাতে পারলোনা অন্য সিনেমাগুলো। জোড়েসোড়ে একটি কথাই আলাচনায় উঠে এলো ভালো সিনমোর বিকল্প নেই। ভালোছবি বানাতেই হবে।
তখোনো চমক অনেকটাই যে বাকী। ২০২৩। চমক জাগানিয়া একটা বছর। লিডার আমি বাংলাদেশ নিয়ে শাকিব খানের সিনেমা হাজির রোজার ঈদে। নাই নাই করে একশত সিনেমা হল। কিন্তু আশা পুরন হলো না। যতটা গর্জেছিল শাকিব, ততটা বর্ষালোনা। তারওপর সিনেমাটি মুক্তির আগেই একের পর এক স্ক্যান্ডাল। বুবলীকে বিয়ে করা সন্তান বীর এর স্বীকৃতী, অষ্ট্রেলিয়ার এক প্রয়োজক এর অভিযোগ-মামলা দায়ের, পুজা চেরীর সংগে প্রেম নানা রকম স্ক্যান্ডালে শাকিব জর্জরিত। কেউ কেউ আংশকা করছিলেন যে,‘ক্যারিয়ারের সলতের আগুন নিবু নিবু হইয়া আসিতেছে বুঝি’।
তারপরেও বড় চমকটি দেখালেন শাকিব। রোজার ঈদের পর কোরবানীর ঈদ। কত দিনই বা সময় থাকে। শাকিব খান জানালেন, হিমেল আশরাফ এর প্রিয়তমা নিয়ে আসছেন তিনি ঈদুল আযহায়। কিন্তু কি ভাবে? এত তাড়াতাড়ি শুটিং হবে? ডাবিং হবে? নায়িকা কে?
শুনতে খারাপ লাগলেও এ কথা সত্যি ছিল যে, সেই সময় শাকিব খানের নায়িকাও নাকি দেশে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ বলছিলেন যে, শাকিবের সংগে কোন নায়িকা কাজ করতে চাইছে না। কলকাতা থেকে ইধিকা পাল নামে এক নায়িকাকে ধরে আনা হলো। না আছে আহামরি চেহারা, না আছে কলকাতার ইন্ড্রাষ্টিতে তার নাম -খ্যাতি, যশ। এই নায়িকার ছবি দেখেও অনেকেই টিপ্পনি কেটে হাসলেন। শাকিব কিন্তু নিশ্চুপ। তারপর...। যা ঘটলো তা এক অভাবনীয় ইতিহাস। আরফান নিশোকে নিয়ে সেই ঈদেও ছবি নিয়ে আসলেন রায়হান রাফি। টিভি নাটকের অসম্ভব জনপ্রিয় এই নায়কের ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল আলোচনা। কিন্তু ওস্তাদের মাইর শেষ রাতে। ঈদের মাত্র ৮ থেকে ১০ দিন আগে শাকিব খানের টিজার আসলো । রিতীমত চমকে গেলেন সবাই। এখানেই শেষ নয়, এলো শাকিবের বয়োবৃদ্ধ এক লুক। কী অসাধারন। সিনেমা হল মালিকরা ছুটলেন পড়িমরি করে। এবোরো শাকিব খানের সিনেমা ১০০ প্রেক্ষাগৃহ ছাড়িয়ে গেল। প্রিয়তমা সুপার ডুপার হিট। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বাংলা সিনেমার জয়জয়কার।
যেখানে হতাশা, অনিশ্চতা পেয়ে বসেছিল আমাদের ফিল্ম ইন্ড্রাষ্ট্রিতে, সেখানে রমরমা ব্যবসা। শাকিব খান, তার সকল সমালাচনাকে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিলেন এক প্রিয়তমা দিয়েই।
এরই মধ্যে সিনেমা প্রেমীদের জন্য আনন্দদায়ক সংবাদ এলো। দেশে ভারতীয় দশটি সিনেমা মুক্তি পাবে বছরে। চলে এলো পাঠান-কিসি কা ভাই কিসিকা জান, জওয়ান আর এনিমেল এর মত বড় বড় ক্যানভাসের সিনেমা। জওয়ান দেখার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়লো সিনেমা হলে। এখন মানুষ মজেছে এনিম্যাল এ।
অবশ্য ঈদে বা উৎসবে ভারতীয় কোন ছবি মুক্ত পাবে না এই শর্ত আছে।
আমরা আরো আনন্দতি হলাম যখন দেখলাম যে, শাকিব খানকে নিয়ে বম্বে-কলকাতা আর বাংলাদেশের তিনটি প্রয়োজনা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্মাণ হলো দরদ ছবিটি। এই ছবির আলোচনা থামতে না থামতেই তিনটি সিনেমার বড় মহরত হয়ে গেলো। রেদোয়ান রনি, চঞ্চন চৌধুরীকে নিয়ে দম ছবিটি নির্মাণের ঘোষনা দিলেন। তারপরেই এলো হিমেল আশরাফের রাজকুমার সিনেমার ঘোষনা। শাকবি খান অন্য এক লুক নিয়ে হাজির হলেন । তার পরেই এলো আবার রায়হান রাফীর সিনেমার ঘোষণা। শাকিব খানকে নিয়ে রায়হান রাফী ছবি বানাবেন বলে অনেকদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু ব্যাটে বলে মিলছিল না। শেষ পর্যন্ত ঘোষনাটি এলো। আগামী ঈদুল আযহাতে শাকিব খানকে নিয়ে মারদাঙ্গা অ্যাকশন সিনেমা তুুফান নির্মাণ করতে যাচ্ছেন।
নিঃসন্দেহে এগুলো ভালো খবর, বড় খবর। শাকিব খান তাঁর কাজ দিয়েই নিজেকে নিয়ে চলেছেন অন্য এক উচ্চতায়।
একটা আলোচনা আছে যে, শাকিব খান এখন দুই ঈদের নায়ক হয়ে গেছেন। ঈদে দর্শক সিনেমা দেখে, তাই প্রযোজকরা টাকা বিনিয়োগ করছেন দেদারছে, টাকা ফেরত পাবার আশায়। অবশ্য এই কথা সত্য না মিথ্যা তা প্রমানিত হবে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি। এদিন দেশে মুুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে দরদ ছবিটির। একই সংগে দেশে এবং দেশের বাইরে ছবিটি মুক্তির কথা রয়েছে। সিনেমা প্রেমীরা শাকিব খানকে বিমুখ করবে কী না তা সময়ই বলে দেবে।
আমার আলোচনাটা একটু অন্য জায়গায়। সারা বছরে যদি ৮/১০টি ভারতীয় ছবি আসে, সেসব ছবির সংগে প্রতিযোগিতা করার মত আমাদের কোন ছবি আছে কী না? খুব সহজ উত্তর যে যদি থেেেকও থাকে, কিন্তু কোন বিনিয়োগ কারি আসলে এইটা ঝুকি নেবেন না। এরই মধ্যে যে দু একটি সিনেমা ভারতীয় সিনমোর সংগে মুক্তি পেয়েছে, সেগুলো না পেয়েছে ভালো প্রেক্ষাগৃহে দর্শক না পেয়েছে ভালো প্রেক্ষাগৃহ । এটা ভারতীয় সিনেমার দোষ নয়। দোষ আমাদের সিনেমাগুলোর গুনগত মান, গল্প। আমাদের দেশে যে সিনমোগুলো এ বছরে মুক্তি পেয়ছে বা যেগুলো মুক্তির অপেক্ষায় আছে, সেগুলোর বেশির ভাগ গতানুগতিক বানিজ্যিক সিনেমা। সারা দুনিয়া গতানুগতিক বানিজ্যিক সিনেমা থেেেক বেরিয়ে এসেছে। কয়েকটি গান, কয়েকটি মারামারির দৃশ্য আর ধনী গরীবের প্রেমের সস্তা সংলাপ, এগুলো এখন আর মানুষকে টানেনা। হলিউড বদলেছে, বলিউড বদলেছে, টালিগঞ্জ (কলকাতা) বদলেছে সিনমোর বিষয়বস্তু নির্বাচনে। আর আমরা? আমাদেরর বেশির ভাগ বানিজ্যিক ছবির নির্মাতারা বদলাতে পারেনি। ফলে বেশির ভাগ দেশীয় মুক্তি প্রাপ্ত সিনেমা মুখ থুবড়ে পড়েছে। সামনে এই সংখ্যাটা যে আরো বেশি হবে তাতেও কোন সন্দেহ নেই।
এই হতাশার মধ্যে আশার কথা হলো যে দেশের একাধিক তরুন নির্মাতা বিভিন্ন বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্টানের অথবা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের অর্থায়নে সিনেমা নির্মাণ করছেন যেগুলো মানুষেেক সিনেমা হলে টানছে, কিন্তু এ্ই সংখ্যাটাও কম। আগে একটি কথা জোড়ে সোড়ে বলা হতো। শাকিব খান সিঙ্গেল স্কীনের জন্য ঠিক থাকলেও মাল্টিপ্ল্যাক্সে তার দর্শক নেই। কিন্তু প্রিয়তমা সকল ধারনাকে ভুল বলে প্রমাণ করেছেন।
আবার চঞ্চল চৌধুরীর আয়নাবাজী-দেবী- হাওয়া একের পর এক সাফল্য এটাও প্রমান করে যে, শিল্পীকে নিয়ে ভালো গল্পে, নির্মাতা যদি ভালা সিনেমা বানায়, তা দর্শক গ্রহন করে।
এখানে একটা প্রশ্ন যে, এক শাকিব আর চঞ্চল চৌধুরীকে নিয়ে তো ৩৬৫ দিন চলবে না। দর্শকদের যে অনেক ক্ষুধা। আমাদের দরকার আরো অভিনয় শিল্পী। আরফান নিশোকে নিয়ে নিয়ে যখন যাত্রা হলো, তখন বলা হয়েছিলো তাকে নিয়ে আরো একাধিক সিনেমা তৈরী হেেব। কিন্তু সুড়ঙ্গ এর ভালো ফলাফলের পরেও, তাকে নিয়ে শিহাব শাহীন ছাড়া আর কোন নির্মাতাকে সিনেমা নির্মাণের কথা আমরা শুনতে পাচ্ছি না। এটি দুঃখজনক।
আমাদের সিনমো ইন্ড্রাষ্টিকে বাঁচাতে হলে বছরে কমপেক্ষ এমন ১০টি সিনেমা চাই, যে সিনোমগুলো পুরো বছর ধরেই আমাদের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে প্রর্দশিত হবে। উৎসবের আমেজে স্বপরিবারে দর্শক সিনেমা উপভোগ করবে।
সিনেমার ব্যবসায় রয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। বর্তমান সরকার সিনেমা বান্ধব। ভালো সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রায় পনেরটির বেশি সিনেমাকে প্রতিবছরে অনুদান দেয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে। এই অনুদান প্রথাটি অবশ্যই প্রশংসিত উদ্যোগ। কিন্তু দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ঠিক নাই। প্রথমত অনুদানটি দিতে হবে মেধাবী নির্মাতাদের। এজন্য তথ্যমন্ত্রনালয় একটি কমিটি করে নির্মাতা বাছাই করবে। আর যে টাকা দেওয়া হয় ১৫জনকে, সেখানে ৭ থেকে ৮ জনকে দিতে হবে। টাকার অংকটি বাড়ানো প্রয়োজন। এফডিসিকে সেবামুলক মনোভাব পোষন করতে হবে। অনুদানের টাকার অনেক ছবি সঠিক ভাবে বানানো হয় কি না, তা দেখতে হবে। জবাবদিহিতা থাকতে হবে। অনুদান নেওয়া ছবিগুলো সব মুক্তি পায়না বলেও অভিযোগ আছে এজন্য তথ্য মন্ত্রনালয়কেই উদ্যোগ নিতে হবে। চিত্রনাট্যবাছাই করে অনুদান দেওয়ার নিয়মটি বিবেচনা করার সময় এসেছে এখন। সবার আগে নির্মাতা বাছাই করা জরুরী।
আমরা তখন অবশ্যই বিদেশী সিনেমার সংগে প্রতিযোগিতা করেই নিজেদের আসন গড়ে নিতে পারবো। দর্শকদের দীর্ঘ সারি পড়বে মাল্টিপ্ল্যাক্সের টিকিউ কাউন্টার গুলোর সামনে। সিংগেল থিয়েটারে এই ডিসি ডিসি ডিসি শব্দগুলোা শুনতে পারবো কালোবাজারীদের কণ্ঠে।
নতুন বছরে আমাদের সিনেমায় প্রাণের জোয়াড় বইবে, এই প্রত্যাশা তো করতেই পারি। এই দায়িত্বটি পালন করতে হবে সবার আগে নির্মাতাদের।