বিজয় দেখেছি, দেখা হয়নি পূর্ণতা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন আমার বয়স ছিল ১২ বছর পাঁচ মাস, অর্থাত্ ১৩ বছরে পা দিয়েছি মাত্র। ঢাকা জেলার সাভার থানার (বর্তমানে উপজেলা) স্বনামধন্য সাভার অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম। ২৫ মার্চ রাত আনুমানিক ৯টা-১০টার পর থেকেই আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধের নানা স্মৃতি হূদয়পটে ভেসে ওঠে ডিসেম্বর মাসে। কারণ, ১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসে সর্বাত্মক জনযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং আমরা বিজয় অর্জন করি। সেই থেকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস হিসেবে উদ্যাপন করি। কীভাবে আমরা বিজয়ী হলাম, স্বাধীন বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হলো—এ বিষয়ে নানারকম ব্যাখ্যা যুক্তি রয়েছে। স্বাধীনতার ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের দলিল দস্তাবেজে তার ব্যাপক বিশ্লেষণ আছে। আমি সে বিশ্লেষণে মনোযোগ দিতে চাই না।

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের শুরু থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যুদ্ধ প্রকৃতিটা অনেকটা বদলে যায়। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তরুণ যুবকরা পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেয় ভারতে। মুক্তিযুদ্ধকালীন এমনি পরিস্থিতিতে পাকিস্তান বাঙালি জাতির মধ্যে একটা সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করে। তারা মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেয়। বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি আর্মি হিন্দুদের টার্গেট করে আক্রমণ শানাতে থাকে। এলাকায় এমনকি পাড়া মহল্লায় পাকিস্তানি আর্মিরা প্রবেশ করে বেছে বেছে হিন্দুদের আটক করে। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই তখন কলেমা পড়া শিখতে শুরু করে বাঁচার তাগিদে। শুধু কলেমা শিখেও রক্ষা হয় না—হিন্দু মুসলিম শনাক্তকরণে পাকিস্তানিরা কাপড় খুলে পরীক্ষা করে। প্রতিবেশী মুসলিম ভাইয়েরা হিন্দুদের রক্ষায় নানারকম কৌশলের আশ্রয় নেয়। কেউ কেউ আশ্রয় দিয়ে হিন্দুদের জীবন রক্ষা করলেও কারো কারো বিরুদ্ধে সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু এসবের বিচার আজও হয়নি। স্থানীয় বাঙালি যারা রাজাকারের নাম লিখিয়েছে তারা সহযোগিতা করেছে এসব হামলায়। সাভারের অনিল সাহা একজন বড় মাপের কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন, তাকে আমি কাকাবাবু বলে ডাকতাম। আমাদের সঙ্গে ছিল পারিবারিক সম্পর্ক। তার প্রকৃত বাড়ি ছিল পার্শ্ববর্তী থানা ধামরাইয়ের রোয়াইল ইউনিয়নে। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে রোয়াইলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ করে। অনিল কাকাসহ অনেক হিন্দুকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। আমি তখন অনিল কাকাদের বাড়িতেই ছিলাম। কাকাদের বাড়ির পাশেই একটি বদ্ধ ডোবা (পুকুর) ছিল। ঘরের জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যেত ডোবাটি। সেই ডোবায় নিয়ে সরাসরি ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয় অনেক হিন্দুকে। আমি দেখেছি বাঁচার জন্য তারা নিজেদের মুসলিম পরিচয় দিলেও কাপড় খুলে শনাক্ত করে নিশ্চিত হিন্দু জেনে হত্যা করেছে। আমি অনিল কাকার আর্তনাদ দেখেছি। তিনি নিজেই কাপড় খুলে মুসলিম পুরুষাঙ্গ বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। এক পর্যায়ে তাকে ছেড়ে দিতে চাইলেও স্থানীয় বাঙালি রাজাকার কাকাকে হিন্দু হিসেবে প্রমাণে সক্ষম হয়। ফলে তার পক্ষে আর বাঁচা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য সেই রাজাকারদের উত্তরসূরিরা এখন দাপুটে আওয়ামী লীগ। এটি শুধু একটি উদাহরণমাত্র।

ডিসেম্বরের প্রথম দিকেই ভারতীয় মিত্রবাহিনী চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে পাকিস্তানি সেনাদের। যখন বিজয় আসন্ন তখন হিন্দুদের ওপর আক্রমণের মাত্রাও বেড়ে যায়। হিন্দু-মুসলিম বিভাজন রেখা তৈরি করতে সক্ষম না হলেও একশ্রেণির দাঙ্গাবাজ প্রকৃতির লোক হিন্দুসম্পদ দখল করে নেয়। তারাও এখন আওয়ামী লীগার। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র বহন করেছি, গোলাবারুদ সরবরাহ করেছি। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আমার মায়ের হাতের রান্না করা ভাত সরবরাহ করেছি। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাকালে আমাকে এবং এম আর আখতার মুকুল, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ‘চরমপত্র, পাঠ করতেন তাকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে যৌথভাবে সাক্ষাত্কার নিয়েছিল। আমাকে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও আমার কোনো সার্টিফিকেট নেই। আমি এটার প্রয়োজনও বোধ করি না।

দেশ স্বাধীন হলো, যুদ্ধে জয়লাভ করলাম ১৬ ডিসেম্বর। বিশ্ব অভিনন্দন জানালো বাঙালি জাতিকে। বিজয় মিছিলে আমি শরিক হলাম। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর গাড়িবহরের উল্লাস, মুক্তিযোদ্ধাদের উল্লাস সে এক বিস্ময়কর দৃশ্য! বন্ধুদের নিয়ে হেঁটে মিছিল করতে করতে মিরপুর পর্যন্ত এসেছিলাম। মিরপুর ব্রিজটি তখনো হয়নি। ছোট সরু একটি লোহার ব্রিজ ছিল এখানে। পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করে আনুষ্ঠানিক পরাজয় মেনে নেয়। ভারতীয় বাহিনীর ক্যাম্পগুলো ১৬ মার্চ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও দৃঢ়তায় ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। বাংলাদেশ যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে স্বাধীন হয়েছে তা কি পূর্ণ হয়েছে? বিজয় হয়েছে ঠিক, কিন্তু বিজয়ের স্বাদ ভোগ করতে পারেনি একটি শ্রেণি আজও। এখনো সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন আমরা, আজও হিন্দু সম্প্রদায় ফিরে পায়নি তার সম্মান, অধিকার। ১৯৭১ সালে যেখানে ২০ শতাংশ হিন্দু ছিল এখন দাঁড়িয়েছে ৮ শতাংশে। কেন এভাবে কমছে? স্বাধীন বাংলাদেশের শাসক কি এর জবাব দিতে পারবেন? পারবেন না। এখনো অনেক মানুষের মুখে কোনো হাসি নেই। কেন স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির আস্ফাালন দেখছি? কেন এমন অবস্থা? এর উত্তর জানা নেই। তাই বিজয় দেখেছি—দেখা হয়নি পূর্ণতা।

লেখক: কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক