সত্যিকার অর্থে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেনস লইয়া বিশ্বের নানা প্রান্তে এই বত্সর চলিয়াছে নানাবিধ তর্কবিতর্ক। কেহ কেহ মনে করেন, এআইয়ের ক্ষমতা যত বাড়িবে সভ্যতা তত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়িবে। আবার কেহ কেহ মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। আমাদের স্বাস্থ্য, চিকিত্সা, শিক্ষা হইতে শুরু করিয়া সমাজের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবিত ইতিবাচক ব্যবহার বাস্তবে সম্ভব। কিছু দিন পূর্বে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রযুক্তিবিষয়ক কলামিস্ট জেওফ্রি এ ফ্লাওয়ার একটি নিবন্ধে জানাইয়াছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই ব্যবহার করা হইতেছে কণ্ঠ তৈরিতে, তহবিল সংগ্রহের ইমেইল ও ‘ডিপফেক’ ইমেজ তৈরি করিতে—যাহা পূর্বে কখনো ছিল না।
এইদিকে বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান শ্যাক্সের একটি প্রতিবেদন বলিতেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কাজের এক-চতুর্থাংশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়া প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। তবে ইহা মুদ্রার একটি দিক। অপর দিক হইল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে নতুন নতুন চাকরির সুযোগ ও উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি পাইবে নিশ্চিতভাবেই। আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব একেক সেক্টরে একেক রকমভাবে পড়িবে। শ্যাক্সের প্রতিবেদন বলিতেছে, কয়েক বত্সরের মধ্যে প্রশাসনিক কাজগুলির ৪৬ শতাংশ এবং আইনি পেশার ৪৪ শতাংশ কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সম্পাদন করা সম্ভব। তবে নির্মাণ খাতের মাত্র ছয় শতাংশ এআই দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। ইতিপূর্বে কয়েকজন চিত্রশিল্পী উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া জানাইয়াছিলেন, এআই ইমেজ জেনারেটর তাহাদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার ক্ষতি করিতে পারে; কিন্তু মনে রাখিতে হইবে, বিশ্বের ৬০ শতাংশ শ্রমিক এখন এমন পেশায় রহিয়াছে, যাহার কোনো অস্তিত্ব ১৯৪০ সালেও ছিল না। এইদিকে গত মে মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব লইয়া যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে শুনানি হয়। সেইখানে রিপাবলিকান সিনেটর মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের জোশ হাউলি বলিয়াছিলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমনভাবে রূপান্তরিত হইবে, যাহা আমরা কল্পনাও করিতে পারি না। আমেরিকানদের নির্বাচন, চাকরি ও নিরাপত্তার উপর তাহা প্রভাব ফেলিবে। কংগ্রেসের কী করা উচিত, তাহা বুঝিবার জন্য এই শুনানি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ।’
আমরা যতটুকু বুঝিতেছি, নতুন প্রযুক্তি আসিলে শুরুতেই তাহা লইয়া আতঙ্ক এবং অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়। যখন টেলিফোন ও টেলিভিশন আসিল, তাহা অনেকেই বাঁকা চোখে দেখিয়াছেন। পার্সোনাল কম্পিউটার আসিবার পর উহা লইয়া আশঙ্কা তৈরি হইয়াছিল। আশঙ্কা ছিল ইন্টারনেট লইয়াও। কম্পিউটারে ফটোশপ ব্যবহার করিয়া দুই যুগ পূর্বেই অনেক আপত্তিকর ছবি তৈরির অবতারণা হয়। উহা লইয়া প্রথম দিকে ‘গেল গেল’ রব উঠিলেও অচিরেই মানুষ বুঝিতে পারিতেছে, উহা ফেক, নকল। এখন যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করিয়া অনেকের আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হইতেছে। কিছুদিন পূর্বে ভারতের এক অভিনেত্রীর এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যাহা এআই প্রযুক্তি দিয়া তৈরি। ব্যাপারটা হইল, চিকিত্সকের শল্যচিকিত্সার জন্য তৈরি করা ছুরি যদি ডাকাত চুরি করিয়া কোনো অপরাধ করে, তাহা হইলে সেই অপরাধের কারণে শল্যচিকিত্সার ছুরিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মতো!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়াই রোধ করা সম্ভব। কাঁটা দিয়া কাঁটা তুলিবার মতো। সমাজে অসাধু মানসিকতার ব্যক্তি ও গোষ্ঠী থাকিবেই, তাহার জন্য স্ব স্ব জনপদের সরকারকে প্রযুক্তির হালনাগাদের পাশাপাশি নিজেদেরও হালনাগাদ করিতে হইবে। ইহা এখন নিরন্তর প্রক্রিয়া। প্রযুক্তিগত আক্রমণ ও সমস্যা আসিবেই। উহাকে মোকাবিলার জন্যও সর্বাত্মক প্রস্তুতি রাখিতে হইবে। তাহার সহিত জনগণকে সচেতন করিতে হইবে, তাহারা যাহাতে মিথ্যা বা ফেক খবরে বিভ্রান্ত না হয়। আসলে যাহারা মিথ্যা ছড়ায়, তাহাদের অবস্থা হয় মিথ্যাবাদী রাখালের মতো। প্রথম প্রথম মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়; কিন্তু মানুষ বোকা নহে, তাহারা একসময় সত্য ঠিকই অনুধাবন করিতে পারে।