২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের এই তৃতীয় মেয়াদের সরকারের যাত্রা শুরু হয়। এর এক বছর পরই বিশ্বব্যাপী শুরু হয় করোনার সংকট। এর আঘাতে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতিধারা স্থবির হয়ে পড়ে। দুই বছর করোনার অর্থনৈতিক সংকট চলমান থাকতেই শুরু হয় ইইক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ বিশ্ব অর্থনীতিতে আরেকটি ধাক্কা যুক্ত হয়। এর ফলে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। এই বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা এ বছর আরো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে এবং বাংলাদেশে এর প্রভাব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত কয়েক মাস আগে থেকেই বারবার সবাইকে সতর্ক করছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার চলতি মেয়াদের শেষ বছরে পদার্পণ করল। আগামী বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সে হিসাবে বছরটি নির্বাচনের বছর হওয়ায় এই অর্থনৈতিক সংকট সরকারের জন্য আরো চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারাও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত।
এ বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সারা বিশ্বেই জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, আমাদের দেশেও তার প্রভাব পড়েছে। এ বছর বিশ্বব্যাপী চলমান অনৈতিক মন্দা আরো প্রকট হবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগে থেকেই সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। আশঙ্কা করা হয়েছিল, এ বছর মার্চের মধ্যে এই সংকট তীব্র হবে। তবে বর্তমান সরকার এই সংকট কাটিয়ে ওঠার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আশা করা হচ্ছে, সরকার সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। নতুন বছর দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে বলেও আশা করা হচ্ছে। নতুন বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৭.৫ শতাংশ। সেটা কো-অর্ডিনেশন কমিটির সভায় সংশোধন করে ৬.৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে আমি আশাবাদী, প্রবৃদ্ধি আরো বেশি হবে। বিশেষত জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হলে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কেটে গেলে আগামী জুন-জুলাই নাগাদ দেশের অর্থনীতি নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াবে।
যেখানে উত্পাদন খরচ বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি হয়, সেখানে সুদের হার বাড়ালে মূল্যস্ফীতি কমবে এমন মনে করার কারণ নেই। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে যেভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে, সেভাবে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ২০২৩ সালে সঞ্চয়ের সুদহারের সীমা উঠিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ঋণের সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নীতি হার বা ব্যাংক রেট আরো এক দফা বাড়িয়েছে। এই মুদ্রানীতির কারণে আমানত হয়তো কিছু বাড়তে পারে, কিন্তু তাতে মূল্যস্ফীতি কমবে না। যদি যুক্তরাষ্ট্রের মতো ঋণের সুদহার বাড়ানো হয়, তা নতুন বিনিয়োগকে আরো সংকুচিত করবে। এ ছাড়া যারা আর্থিক অনটনের কারণে অসুবিধায় আছে, তাদের জন্য ঋণ নেওয়া আরো কষ্ট হয়ে যাবে। এসব কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদে কোনো পরিবর্তন আনেনি। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর আগেও দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি খুব একটা সংবেদনশীল ভূমিকা রাখে না। ধরা হয়, সংকোচনশীল মুদ্রানীতির কারণে মানুষ বেশি সঞ্চয় করে এবং পণ্যের চাহিদা কমে। চাহিদা কমলে ব্যবসায়ীরা দাম কমান। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একটা শ্রেণি সঞ্চয় করলেও অন্য শ্রেণি সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সঞ্চয় কমতেই আমরা দেখছি, আগে এভাবে মূল্যস্ফীতি কমেনি কখনো। বরং মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের পেছনে আয়ের বেশির ভাগ যখন ব্যয় করতে হয়, তখন দাম বাড়লেও তার মৌলিক পণ্যে খরচ কমানো সম্ভব হয় না। এসব কারণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি। সরকার-ব্যবসায়ী আঁতাত যত শক্তিশালী হবে, সরকার তত বেশি ব্যবসায়ীদের সুযোগ তৈরি করে দেবে। এতে দেশের সাধারণ মানুষের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে না।
ডলারের দাম স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বাজারে বিক্রি করেছে। এর ফলে বাজার থেকে সমপরিমাণের বাংলাদেশি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা হয়েছে। তাই কোনো কোনো ব্যাংকে তারল্য ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বিশ্ব তেল ও গ্যাসের বাজারে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ যে কবে থামবে, তা কেউ বলতে পারছে না। এমনিতেই রাশিয়ার গ্যাস ও তেল পেতে ইউরোপসহ অনেক দেশেই সমস্যা হচ্ছে। কেননা, রাশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তেল ও গ্যাসের বিশ্ব সরবরাহ কমে গেছে। এর মধ্যে আবার ওপেকসহ আরো কয়েকটি দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রতিদিন ২ শতাংশ তথা ২০ লাখ ব্যারেল তেল উত্পাদন কমিয়ে দেবে। এখনই প্রতি ব্যারেল তেলের দাম নব্বই ডলারের মতো। এই সিদ্ধান্তের পর তেলের সরবরাহ কমে যাবে বলে তার দামও বাড়বে বলেই মনে হয়। আর গ্যাসের বিশ্ববাজার তো ইউরোপের চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানিমূল্য এবং ডলারের বাড়ন্ত মূল্য আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। গ্যাসের বিশ্ববাজার তো ইউরোপের চাহিদা মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি মূল্য এবং ডলারের বাড়ন্ত মূল্য আমাদের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
তদুপরি বিশ্ব খাদ্য সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি হুঁশিয়ারি দিচ্ছে যে আগামী বছর বিশ্ব জুড়েই ব্যাপক খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে। চলতি বছর সারা বিশ্বেই যে জলবায়ু পরিবর্তনের উথাল-পাতাল দেখা গেছে, তাতেই খাদ্য উত্পাদন নিয়ে এই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া বিশ্বের শস্যভান্ডার বলে পরিচিত ইউক্রেন ও রাশিয়ায় যুদ্ধ চলতে থাকায় তাদের কৃষি উত্পাদন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে খাদ্য পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে। আমাদের মতো দেশে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গম ও ভোজ্যতেলসহ অনেক খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সরবরাহ পেতেও অসুবিধা হচ্ছে। এ সবই আমাদের আমদানি মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর পেছনে কাজ করছে। আর এ বছর আমাদের দেশসহ এই অঞ্চলে বর্ষাকালে বৃষ্টি হয়নি। তবে বর্ষাকালের শেষ প্রান্তে এসে বেশ বৃষ্টি হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব আমন ফসলের ওপর পড়বে বলে মনে হয়।
জমিতে রস থাকবে বলে বোরো ধান উত্পাদনেও কম সেচ লাগবে। তা সত্ত্বেও বিশ্ব খাদ্য পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না। সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাপক হারে কমে যাবে বলে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ তাদের অর্থনৈতিক আউটলুক বা প্রক্ষেপণে একাধিকবার বলেই চলেছে। আইএমএফ আশঙ্কা করছে, আগামী বছর বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২.৯ শতাংশ হবে। এই সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই আমাদের প্রধানমন্ত্রী কদিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে ২০২৩ সাল হবে মহামন্দার বছর। যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘ সফরের সময় তিনি অনেক রাষ্ট্রনায়ক ও বিশ্ব সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে আলাপ করেছেন। তারাও বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাসহ মূল্যস্ফীতির সংকট নিয়ে নিশ্চয় তার সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। তাই তো তিনি এমন স্পষ্ট করে বিশ্ব মহামন্দার কথা বলেছেন। যাই হোক, বিশ্বমন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ ঘুড়ে দাঁড়াতে শুরু করেছে। কাটিয়ে উঠছে মন্দা পরিস্থিতি।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার ও পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কো. লি.