স্থাপত্যে বাংলাদেশের প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলার আবহাওয়াকে অবলম্বন করে স্থাপত্যশৈলীর। নিজস্ব কোনো প্যাটার্ন সৃষ্টি না করলেও স্থপতিদের কাছে তিনি ‘বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যকলার জনক’ হিসেবে পরিচিত। কারণ, তিনি স্থাপত্যশৈলীর চাইতে মানুষ, প্রকৃতিকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন, স্থাপত্যকে করে তুলেছিলেন প্রকৃতিবান্ধব। স্থাপত্যশিল্পে বাংলাদেশের পথিকৃত্ ব্যক্তিত্ব স্থপতি, মুক্তিযোদ্ধা মাজহারুল ইসলামের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের উন্মুক্ত চত্বরে গতকাল শুরু হয়েছে চার দিনের বিশেষ প্রদর্শনী। মাস্টার আর্কিটেক্ট মাজহারুল ইসলামের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের আয়োজনে নানা অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
এতে স্থান পেয়েছে মাজহারুল ইসলামের বিভিন্ন স্থাপনার ছবি, স্থাপত্য নকশার ছবি, বিভিন্ন ব্যক্তির কথা, স্মৃতিচারণ। এর পাশাপাশি মাজহারুল ইসলামের যুগান্তকারী নকশার ভবনগুলো ধ্বংসের মুখে এবং সেসব ভবনের যে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন তা-ও তুলে ধরা হয়েছে প্রদর্শনীতে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বাসভবনের ছবি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনের ছবি, জয়পুরহাট কঠিন শিলা প্রকল্পের ভবনের ছবি প্রভৃতি। এছাড়াও রয়েছে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল নকশার ছবি, চারুকলা অনুষদের ভবনের নানা অংশের ছবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ভবনের ছবিসহ তার গুরুত্বপূর্ণ ডিজাইনের উল্লেখযোগ্য অংশের খণ্ড খণ্ড ছবি।
উত্সবের আহ্বায়ক স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী বলেন, মাজহারুল ইসলাম অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি পরিচিত নন। তার দর্শন, স্থাপত্য ভাবনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতেই বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট তার জন্মশতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে এবছর নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তারই অংশ হিসেবে এ প্রদর্শনী আয়োজন। তিনি জানান, দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মাজহারুল ইসলামের নকশায় করা ভবনগুলো জাতীয় সম্পদ হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। এর মধ্যে অনেক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ভবন ভেঙে পড়ার উপক্রম। এগুলো রক্ষায় সরকারের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রদর্শনী উপলক্ষ্যে আয়োজিত উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থপতি ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সরকারের সাবেক মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। এসময় আরো বক্তব্য রাখেন ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার সাব্বির আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক নবী নেওয়াজ খান, উত্সবের আহ্বায়ক স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী, স্থপতি ইকবাল হাবিব, স্থপতি সাবরিনা প্রমুখ।
ইয়াফেস ওসমান বলেন, মাজহারুল ইসলাম বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পের গুরু। তিনি শুধু একজন স্থপতি নন, সমাজ বিনির্মাণে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছিলেন। তার স্থাপত্যকলা বাংলাদেশের মাটি, আবহাওয়া, মানুষ ও প্রকৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে।
ইকবাল হাবিব বলেন, মাজহারুল ইসলাম স্থাপত্যকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করেছেন। পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি তার কাজ দিয়ে বুঝিয়েছেন মানুষের জন্য যে স্থাপত্য সেটাই প্রকৃত স্থাপত্য। প্রদর্শনীটি ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।