সোনালি দিনের ছবি আঁকেন মহেন্দ্র রবিদাস

ঝিনাই নদীর পেটে গেছে সাত পুরুষের ভিটে। দীর্ঘ সময়টা অটুলি থাকছেন এবাড়ি সেবাড়ি। এরই মধ্যে বিয়েথা। চালচুলোহীন সংসারে দুই সন্তান। টানা অনটন আর অটুলি জীবন মেনে নেয়নি স্ত্রী ভারতী। তাই একযুগ আগে চলে গেছেন বাপের বাড়ি। এরপর জীবনের কঠিন লড়াইটা একাই সামলাচ্ছেন মহেন্দ্র রবিদাস।

মহেন্দ্রের জন্ম ভেঙ্গুলা মুচিপাড়ায়। ’৭৪-এ কলেরায় মারা যান বাবা সুখচান। রেখে যান একবোঝা ঋণ, অনটন আর বঞ্চনা। সেসব নিয়েই ৫৭ বছরের কঠিন যুদ্ধ। ঘরবাড়ি, ভিটেমাটিহারা মহেন্দ্রের ঠিকানা এখন স্কুলের বারান্দা বা হাটের পরিত্যক্ত শেড। ভোরে ভেঙ্গুলা বাজারের বটতলায় জুতো সেলাই আর রংকালি শুরু। কামাই বড়জোর ২০০/২৫০। তা দিয়েই পেট চলে। জীবনের একমাত্র সম্বল চামড়ার চাটাই। যেটি বিছিয়ে দিনে জুতো সেলাই করেন; আর রাতে মাটিতে ছড়িয়ে ঘুমান। মহেন্দ্র জীবনভর সেলাই আর রং-কালিতে অন্যের জুতো ঝকমকে করলেও নিজের পা আজীবনই পাদুকাশূন্য। খালি পায়ে হাঁটাচলায় অভ্যস্ত তিনি।

বাল্যে বাবার সঙ্গে কাঠের বাটামে শুকনো চামড়ার দুই ধার টেনে ধরতেন। ধারালো চাকুতে চামড়া চিরে বানানো হতো হাওয়াই চপ্পল, নাগরা অথবা নকশাাদার স্যান্ডেল। হাটেবাজারে কমদামের এসব চামড়ার জুতো বিক্রিতে চলতো সংসার। কিন্তু দিন পালটেছে। এখন আর কেউ মুচির বানানো জুতো পরে না। আগের দিনে গৃহস্থরা মড়কে মারা যাওয়া গবাদিপশু মাঠে ফেলে দিতেন। বাবার সঙ্গে ছুরি চাকু নিয়ে মৃত গরুর চামড়া ছিলতেন মহেন্দ্র। কাজটি সারতে হতো দ্রুত। কারণ চামড়া ছেলার সময় অন্য চর্মকার জমিতে চাকু ঢিল দিলে অর্ধেক ভাগ দেওয়ার রীতি ছিল। ঐ যে প্রবাদ, চাকু ঢিল দিয়ে ভাগ বসানো, সেটি এভাবেই প্রচার পায়। গরুর মড়ক নিয়ে বিড়ম্বনাও কম ছিল না। কবিরাজরা ঝাড়ফুঁকে আক্রান্ত গরু বাছুর রক্ষা করতে না পারলে আঙুল তুলতেন চর্মকার পাড়ার দিকে। আর চর্মকারের গোপন বিষে গরু মারা যাওয়ার গুঁজবে বহুবার আক্রান্ত হয়েছে চর্মকার পাড়া। উত্তেজিত জনতা পাড়ায় আগুন দিয়েছে। সন্দেহবশত পুলিশ তাদের আটক করে মারধর করেছে। বিনা অপরাধে শত নির্যাতন সত্বেও ছন্নছাড়া চর্মকাররা শুধু পেটভাতের চিন্তায় পৈতৃক পেশা ছাড়তে পারেননি।

মহেন্দ্রের বড় ছেলে সুমন আলাদা হয়ে ঢাকায় জুতো সেলাই করে। অন্য পুত্র সুজন সিরাজগঞ্জ শহরে জুতোর কাজ রপ্ত করছে। আর মহেন্দ্র একাই জীবনের জীর্ণ তরি বয়ে নিয়ে চলেছেন। তিনি বলেন, ‘সবাই অচ্ছুত্ মনে করায় চর্মকারের সন্তানরা কখনো স্কুলে পড়ালেখা করতে পারে না। তাই ওরা নিরক্ষরই থেকে যায়, আর জীবিকার তাগিদে মুচি পেশা গ্রহণে বাধ্য হয়। চর্মকার পাড়ার শিশুরা বাল্যেই শিক্ষা পায়—তাদের জন্ম দুনিয়াকে শুচি করার জন্য। তাই সবাইকে শুচি করে নিজেরাই অশুচি বা অচ্ছুত থেকে যায় জীবনভর।

নৃ-তত্ত্ববিদ রেমন্ড ব্রুক গবেষণা থেকে জানা যায়, চর্মকাররা রবিদাস নামেও পরিচিত। তাদের পূর্বপুরুষ মহান রবিদাস জাতপাত না মানায় বর্ণহিন্দুদের হাতে নিহত হলে অনুগামী রবিদাসরা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। চর্মকার বা মুচি পেশা নিয়ে উপাখ্যান হলো—আদিযুগে ভগবান শ্রী নারায়ণ একদিন মানবসমাজকে পেশা বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান। রবিদাসরা আসেন সবার পরে। তখন সুঁই-সুতোয় চামড়া সেলাই ছাড়া অন্য কাজ না থাকায় সেটাই বেছে নিতে হয় তাদের। বেসরকারি সংস্থা সেডের জরিপে, দেশে ৩১ হাজার ৫২৫জন চর্মকার রয়েছে। সবাই ভূমিহীন ও ছিন্নমূল। ভাষা নার্গী প্রায় হারিয়েই গেছে। ইতিহাস বলে মধ্যযুগে কাশী, বিহার, মুঙ্গের থেকে বাংলায় আগমন তাদের। 

মহেন্দ্র জানান, যখন কাজ করেন তখন মুখে নয়, গ্রাহকের পায়ের দিকে দৃষ্টি ফেলেন। কারণ দুই পা জুড়ে থাকা পাদুকা হলো লক্ষ্মী। পাদুকার বরকতে আহারবিহার জোটে। তাই কেউ পা থেকে জুতো খুলে সামনে রাখলে জুতোর সদর মফস্বল এবং শুকতলিতে মা লক্ষ্মীকে খোঁজেন। মা লক্ষ্মী হয়তো একদিন সদয় হবেন। কৃপা বর্ষণ করবেন। সেই কৃপায় মুচিপাড়ার খাসজমিতে ছনশোলার ঘর তুলবেন। সেই ছোট্র ঘরে অভিমানী ভারতীকে একদিন ফিরিয়ে আনবেন। জুতো সেলাই আর রং-পালিশের কাজের ফাঁকে সেই সোনালি দিনের ছবি আঁকেন মহেন্দ্র।