আদালতপাড়ায় অস্বাভাবিক উপচে পড়া ভিড়, অতিরিক্ত চাঞ্চল্য। দেশ-বিদেশের সংবাদকর্মীরা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ভীষণ তত্পর। তাদের সঙ্গে রয়েছে নানা আকার আর আকৃতির দৃশ্য ও শব্দ ধারণ যন্ত্র। শান্তিরক্ষীরা ঈগল দৃষ্টিতে চারদিকে নজর রাখছে। অনেকটা দম বন্ধ করা পরিবেশ। চারদিকে একধরনের চাপা উত্তেজনা। অনেক চেষ্টা করেও তা চেপে রাখা যাচ্ছে না। প্রকাশ্য আদালতে বিচারের রায় ঘোষণা করা হবে। দেশের মানুষ শেষ খবর জানার জন্য উদ্গ্রীব। রায় ঘোষণার জন্য ২২ নভেম্বর ২০২৩ তারিখ আগে থেকে ঠিক করে রাখা হয়েছিল। একজন মাত্র আসামি। আসামিদের জন্য সংরক্ষিত আসনে উপবিষ্ট। চোখে-মুখে ভীতির ছায়া। আসামির শ্মশ্রুমণ্ডিত অবয়বে একরাশ উদ্বিগ্নতা, উত্কণ্ঠা। দুশ্চিন্তার ছাপ কপালের প্রগাঢ় বলিরেখায়। থেকে থেকে ওপরের দিকে চোখ তুলে কাকে যেন দেখার চেষ্টা করছেন। বিচারকদের রায়ের অপেক্ষায় তিনি বারবারই সময় দেখছিলেন। সময় যেন স্থবির হয়ে আছে।
রাশভারী বিচারকবৃন্দ আদালতকক্ষে প্রবেশ করলেন। আদালতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সবার সঙ্গে আসামিও উঠে দাঁড়ালেন। এটাই নিয়ম। আর নিয়ম অনুসারে শুরুতে আসামিকে তার নাম, জন্ম তারিখ, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা ও পেশা বলতে বলা হয়।
নাম :এরিক ডুপন্ড-মরেতি, জন্ম :২০ এপ্রিল ১৯৬১। বয়স :৬২ বছর। বিবাহিত। পেশা :আইনজীবী, ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আইন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া তিনি রাজনীতিতে সক্রিয়। বর্তমানে বিচার মন্ত্রণালয়ের প্রধান ব্যক্তি, বিচারমন্ত্রী।
হ্যাঁ, আসামি বর্তমান ফরাসি সরকারের জাঁদরেল বিচারমন্ত্রী। বিচারকদের একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ পড়ে শোনালেন। অভিযোগ গুরুতর, ‘ক্ষমতার অপব্যাবহার, অবৈধ ব্যবহার’। অভিযুক্ত ব্যক্তি হচ্ছেন স্বয়ং বিচারমন্ত্রী, যার প্রশস্ত কাঁধে আছে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সুকঠিন দায়িত্ব। ফ্রান্সে এমন ঘটনা আগে কখনোই ঘটেনি, অর্থাত্ নজিরবিহীন। সে কারণেই সব সংবাদমাধ্যম সরব।
আদালতের সমন পেয়ে ঠিক সময়মতোই কাঠগড়ায় উপস্থিত রয়েছেন মন্ত্রী। রায়ের অপেক্ষায় আসামির কাঠগড়ায় উপস্থিত প্রতাপশালী মন্ত্রীকে খুব অসহায় দেখাচ্ছিল। সাধারণ শ্রমিকের সন্তান, অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের মন্ত্রী হয়েছেন। অভিযুক্ত সাব্যস্ত হলে মন্ত্রিত্ব হারাতে হবে এবং সাজা থেকেও নিস্তার মিলবে না। তিলে তিলে গড়ে তোলা দীর্ঘদিনের উজ্জ্বল রাজনৈতিক জীবন চিরস্থায়ী কালিমায় কলঙ্কিত হবে। এমন কলঙ্কের অভিশাপ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হবে, বিবেককে তাড়িয়ে বেড়াবে।
তার বিরুদ্ধে কী ছিল সেই অভিযোগ? চারজন বিচারক বাদী হয়ে এই মর্মে অভিযোগ করেছেন যে বর্তমান মন্ত্রী যখন তাদের এজলাসে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন, তখন তাদের সঙ্গে বিবাদ দেখা দিয়েছিল। মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বিচারক চার জনের প্রতি বিধিবহির্ভূত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। অর্থাত্, ক্ষমতার অবৈধ ও অপব্যবহার করেছেন। মন্ত্রিত্ব ও ক্ষমতা হাতে পেয়ে আসামি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছেন এবং প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার চেষ্টা করছেন। তাই তারা আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এবং বিচারমন্ত্রীর স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের জন্য আবেদন জানিয়েছেন।
পুরো ১০ কার্যদিবস ধরে বাদী ও বিবাদীপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি, পালটা যুক্তি, উত্তপ্ত বাদানুবাদে আদালতকক্ষ সরগরম হয়েছে। বিচারকবৃন্দ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব সাক্ষ্য-প্রমাণ পরীক্ষা করে দেখেছেন। প্রতিদিনের খবর ফলাও করে প্রচার করছে ফরাসি সংবাদমাধ্যম। বিচারে কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব বা অনিয়ম হচ্ছে কি না, ক্ষমতাসীন সরকারের বিরোধী পক্ষ সেদিকে তীক্ষ খেয়াল রাখছে এবং সুযোগ পেলেই সরকারের বিরুদ্ধে খানিকটা বিষ উগরে দিচ্ছে। তবে আদালত আসামিকে দোষী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত, আগে থেকে আসামিকে মোটেই ‘দোষী’ বলা যাবে না। তাই তাদের সংযমী হতে হচ্ছে। অবশেষে রায় ঘোষণার মুহূর্ত সমাগত।
আদালতকক্ষের নীরবতা ভঙ্গ করে, বিস্তারিত ব্যাখ্যা, মামলার প্রেক্ষাপট এবং কারণ উল্লেখ করে বিচারপতিদের একজন রায় পড়ে শোনালেন। রায়ে উল্লেখ করা হয়, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও রেষারেষির কারণে চার জন বাদী আসামির বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছেন, আদালতে তা প্রমাণিত হয়নি। বিচারকদের রায়ে আসামি, বর্তমান ক্ষমতাসীন ফরাসি সরকারের বিচারমন্ত্রী এরিক ডুপন্ড-মরেতিকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করা হয়।
অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার পরপরই বিচারমন্ত্রী একটি কথাও উচ্চারণ না করে আদালতপাড়া ত্যাগ করেন। মন্ত্রীর আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, সত্যের জয় হয়েছে। বিচার বিভাগ যে সম্পূর্ণ স্বাধীন, তা-ও প্রমাণিত হয়েছে।
‘বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন’ কথাটি খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর রাজনীতিবিদেরা এ ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ হলো নির্বাহী বিভাগ (এক্সিকিউটিভ), আইন বিভাগ (লেজিসলেটিভ) ও বিচার বিভাগ (জুডিশিয়ারি)। বিচার বিভাগ যদি নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবমুক্ত না হয়, তাহলে রাষ্ট্র জনসাধারণের অধিকার সুসংহত করতে পারে না, স্বাধীনতা খর্ব হয় এবং প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র হোঁচট খায়, কলুষিত হয়। ফরাসি বিপ্লবের এক শতাব্দী আগে প্রথিতযশা দার্শনিক, চিন্তাবিদ মন্তেস্কিউ (১৬৮৯-১৭৫৫) এই ফ্রান্সেই জন্মেছিলেন। তিনিই এই ধারণার প্রবর্তন করেন এবং বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে পালটা ক্ষমতা প্রয়োগ করেই ক্ষমতার ভারসাম্য, সামঞ্জস্য রক্ষা করা সম্ভব হয়।
বিচার বিভাগকে কবজায় নিতে পারলে সমাজের সুশীল শ্রেণি, বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে সাংবাদিক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সমাজের রাজনীতিসচেতন অংশকে বশীভূত করা সহজ হয়। সৃষ্টি হয় একটি সুবিধাবাদী ও পদলেহী গোষ্ঠী। নির্বাহী বিভাগের কর্ণধারেরা ক্ষমতার অপব্যহারের সুযোগ নিয়ে পরিণত হন কর্তৃত্বপরায়ণ স্বেচ্ছাচারী দানবে। রাষ্ট্র ও জনগণ আটকে যায় দীর্ঘ মেয়াদের স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী শাসনের নির্মম শৃঙ্খলে। প্রশাসনের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি না থাকলে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন ও বাণিজ্যিকীকরণ ঘটে। গণতন্ত্রের চর্চায় ছেদ পড়ে। আইনের শাসন হয় সুদূর পরাহত। তখন রাজনীতি মানেই চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বলপ্রয়োগ, অর্থ আত্মসাত্, অবৈধ ক্ষমতার যথেচ্ছ প্রয়োগ। এক কথায়, গণতন্ত্রের শ্বাসনালি হচ্ছে বিচার বিভাগ। বিচার বিভাগের টুঁটি চিপে ধরলে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে।
ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রীকে আদালতের কাঠগড়ায় উঠিয়ে এ কথাই স্পষ্ট মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কেউই আইন ও জবাবদিহির ঊর্ধ্ব নয়। প্রশাসন জনগণের সেবক, মোটেই প্রভু নয়। ক্ষমতা জনগণের হাতে। আর সে কারণেই সম্ভব হয়েছে একজন উচ্চপদস্থ নির্বাহীকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো, জনগণের কাছে জবাবদিহিতায় বাধ্য করানো। সম্ভব হয়েছে বিচারমন্ত্রীর বিচার।
লেখক: ফ্রান্স প্রবাসী