২৩ সালের শক্তির বিশ্ব ও ঐকমত্য

পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে নিয়মের ওপরে। সংঘাতের পর একটা সময়ে শান্তি আসবেই—এই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছে নিয়মভিত্তিক বিশ্ব। অন্তত বিগত আট দশকের চিত্র সে কথাই বলে। যুদ্ধের দামামা শেষে প্রতিবারই বলা হয়, ‘আর কখনোই সংঘাত নয়’। যদিও এই প্রতিশ্রুতি থেকে যায় কেবল কাগজে-কলমে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির চিন্তা থেকে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান আত্মপ্রকাশ করে। এসব সংগঠনের কণ্ঠে ঘন ঘন উচ্চারিত হতে থাকে ধ্বংসাবশেষ থেকে বের হয়ে আসার গল্প, কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ক্রমবর্ধমান স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধির ফিরিস্তিও নিয়মিত শোনা যায় বটে, যদিও এসব গালগল্প বিশ্ববাসী এখন আর তেমন একটা বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না।

সন্দেহ নেই, বিশ্বজুড়ে সহিংসতা বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে ক্রমাগত। এর শুরুটা হয় ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে। সার্বভৌম ইউক্রেনে আক্রমণ চালানোর মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক শান্তি বিনষ্ট করার পুরো দায় মস্কোর কাঁধেই বর্তায়। আর তা এখন অবধি বন্ধ করতে না পারার দায় অবশ্যই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর। বলতে হয়, এতে করে বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বৈশ্বিক সংগঠনগুলো।

আমরা এখনো ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে চলেছি। অথচ অনেক আগেই এই সংঘাত, হানাহানি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। সময়ের সবচেয়ে গুরুতর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রশ্নে বিশ্ব সংস্থাগুলো কার্যত ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। খারাপ লাগার বিষয়, বৈশ্বিক ক্রান্তিকাল নিয়ে সংস্থাগুলোর যেন কোনো ভাবান্তর নেই! আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে যেন। এর ফলে যে পুরো সিস্টেমই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, তা-ও সম্ভবত অনুধাবন করছে না বৃহত্ প্রতিষ্ঠানগুলো। এভাবে চলতে থাকলে তো বিশ্ব একসময়কার সাম্রাজ্যের যুগে ফিরে যাবে, যা নিয়ে আশঙ্কার কথা ওঠে বারবার! সত্যি সত্যিই যদি তেমনটা ঘটে, তাহলে আমাদের প্রত্যেককেই যে বেশ ভুগতে হবে, তা কি আমরা ভুলে যাচ্ছি?

আমি জানি, নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ‘সুস্থ ধারা’ কীভাবে ও কখন ফিরে আসবে, তার দিকে চেয়ে আছে সারা বিশ্বের মানুষ। দুঃখজনকভাবে এ নিয়ে বিশ্ব নেতৃত্ব তেমন একটা ভাবছে বলে অন্তত আমার মনে হয় না। প্রায়ই হতাশার সুর আসে আমার কানে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু একবার ব্যর্থ হলে যে আবারও ব্যর্থতা আসবে, তেমন তো নয়। সত্যি বলতে, আমাদের চিন্তাভাবনায় মৌলিক পরিবর্তন দরকার।

আমরা সম্ভবত ভুলে যাচ্ছি, ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান ও বর্বরোচিত যুদ্ধ কেবল সিস্টেমই ভেঙে দেয়নি; বরং বলতে হয়, সিস্টেমের অযাচিত নিয়মনীতি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি কাজে লাগিয়ে ফায়দা হাসিল করছে বিভিন্ন পক্ষ। এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত সিস্টেম টিকিয়ে রাখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে সবাই। অর্থাত্, একটি নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাকে বাঁচাতে আমাদের অনেক কিছু করার আছে।

আজ আমাদের স্বীকার করা উচিত, অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল ছিল আমাদের। ভুল হচ্ছে এখনো। অতীতে আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন অংশ জুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তারের নেশায় মত্ত শিকারিরা কী সব কীর্তিকলাপ চালায়, তা কি আমরা ভুলে গেলাম? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার কথা মনে পড়ে? পূর্ব ইউরোপের ছোট দেশগুলোকে কবজা করে নিজেদের ‘প্রভাববলয়’ বানাতে মরিয়া চেষ্টা চালানো হয়। যারা রাজী হয়নি, তাদের ওপর চালানো হয় ভয়ংকর আগ্রাসন।

প্রায়ই মনে পড়ে সোভিয়েত জামানার দিনগুলোর কথা। সেই আমলের মানুষ হিসেবে আমি বেশ ভালোমতোই বুঝতে পারি, কীভাবে কাটে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষের জীবন। নিজের ও চারপাশের জীবন বিষিয়ে উঠলে কেমন লাগে, তা কেবল ভুক্তভোগীই অনুধাবন করতে পারবে। আমাদের নিয়মভিত্তিক জগতের আসল ধারাবাহিক গল্প এটাই যে, বৃহত্ শক্তিগুলোর রাজনীতির হাত ধরেই পৃথিবীতে নেমে আসে যত দুর্দশা ও ধ্বংসযজ্ঞ। প্রশ্ন হলো, এ থেকে উত্তরণের উপায় কী? এক্ষেত্রে আমার পক্ষ থেকে কিছু পরামর্শ রইল—

প্রথমত, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ছোট-বড় সবার কথা বলার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। এর মধ্য দিয়ে আমরা ‘ভালো কিছু অর্জনের জন্য’ বৃহত্ শক্তিগুলোর রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকার অবকাশ পেতে পারি। এই অপরাজনীতির অবসান ঘটাতে পারি। সত্যিকার অর্থেই আমাদের এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচের ভূমিকা পালন করবে। কাজ করে যেতে হবে ক্ষুধা-দারিদ্র্য, রোগব্যাধি ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলার মতো সংকটগুলো নিয়েও। শুধু কথায় নয়, কাজ করে দেখানো চাই। এস্তোনিয়া সেই পথেই হাঁটছে। বিশ্বকে স্বাধীনতা ও শান্তির উপযোগী করে তোলার বিষয়ে ইতিমধ্যে এক বিশেষ বৈশ্বিক উদ্যোগও হাতে নিয়েছে তাল্লিন।

দ্বিতীয়ত, আমার স্পষ্ট কথা—সবার আগে আমাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক আদেশের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো স্বীকার করে নিতে হবে। বৈশ্বিক নিয়মকানুন আরো শক্তিশালী করতে উদ্যোগী হতে হবে। এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা ২১ শতকের বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়। এক্ষেত্রে সবার আগে জরুরি ‘জাতিসংঘের সংস্কার’। আধুনিক বিশ্বকে শক্ত খুঁটির ওপর দাঁড় করাতে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধিও সময়ের দাবি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মনে করিয়ে দিতে হয়, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এই সংস্থার দায়িত্ব ‘প্রাথমিক’; তবে তা কোনোভাবেই ‘একচেটিয়া বা একতরফা’ নয়। এই অবস্থায় বিশ্বকে অবশ্যই ‘বিতর্কিত’ ভেটো ব্যবহারকারীদের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের আসলেই আরো বেশি সৃজনশীল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে হবে।

আমরা দেখে আসছি, নিরাপত্তা পরিষদের কোনো কোনো স্থায়ী সদস্য জাতিসংঘ সনদকে পদদলিত করে। এই অবস্থায় একটি কোর গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব জানাই আমরা।

ইউক্রেন যুদ্ধের কথা যদি ধরা হয়, তবে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কড়া জবাব দিতে সাধারণ পরিষদকে নেতৃত্ব দিতে হবে। আগ্রাসনের অপরাধের বিচার করার জন্য ‘বিশেষ ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের স্বীকার করতে হবে, যেসব দেশ অন্য দেশের প্রতি আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করে, সেই সব দেশে অভ্যন্তরীণ প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। এক্ষেত্রে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রচারকে বৈশ্বিক নিরাপত্তানীতির স্বাভাবিক অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হতে হবে। তা না হলে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। সুতরাং, সহিংসতা থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নারী ও শিশু, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, উদ্বাস্তু ও অভিবাসী, লেসবিয়ান, গে ও উভকামী এবং ট্রান্সজেন্ডারের মতো প্রান্তিক ও দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্যও এটা অপরিহার্য। বাকস্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নেও—যার মধ্যে মিডিয়ার স্বাধীনতা ও ইন্টারনেটের স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত—একই কথা প্রযোজ্য।

তৃতীয়ত, বিশ্বকে স্বাধীনতার উপযোগী করে তুলতে আমাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বের ছোট ছোট রাষ্ট্র ও সুশীল সমাজকে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে। কারণ, ঐতিহ্যগতভাবে বড় রাষ্ট্র ও ব্লক দ্বারা তারা যেন নিয়ন্ত্রিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া যাবে না, আমরা এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত পার করছি। বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। তবে আশার কথা হলো, বিশ্ব যতই চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠুক না কেন, মনে রাখবেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সবচেয়ে অন্ধকার দিনগুলোতেও নিয়মভিত্তিক বিশ্বের অবস্থা বর্তমান সময়ের মতো ছিল।

আমাদের মনে রাখা জরুরি, ১৯৪১ সালের এক বসন্তে প্রায় সমগ্র ইউরোপ সর্বগ্রাসী শক্তির হাতে নিপতিত হয়েছিল। সে সময় দখলকৃত ও মিত্র দেশগুলোর প্রতিনিধিরা বোমা বিস্ফোরিত লন্ডনে জড়ে হয়ে এ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায় যে, ‘সামরিক বিজয়ের চেয়ে সৃজনশীল কিছু করার মধ্য দিয়ে বিজয়লাভের মধ্যেই প্রকৃত স্বার্থকতা নিহিত।’ এই লক্ষ্যে যে কথোপকথন শুরু হয়, তার ফলে বিশ্ব গতিশীল হয়, গড়ে ওঠে জাতিসংঘের মতো বিশ্বপ্রতিষ্ঠান। সুতরাং, আজকের দিনে নতুন করে ‘কথোপকথন’ শুরু করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে। সত্যি বলতে, ঐকমত্যে পৌঁছানোর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ: সুমৃত্ খান সুজন