বিএমডিসি’র প্রণীত নীতিমালার কারণে বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)-এর প্রণীত নীতিমালার কারণে ২০২২-২৩ সেশনে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে প্রায় ৫০০-এর মতো সিট খালি ছিল এবং মেধাবী ও অসচ্ছল কোটায় ৪ হাজার ৫০০-এর ওপর মেধাবী ছাত্রছাত্রী দরখাস্ত করার পরও ৩৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয় ডিজি হেলথ। ফলে প্রায় সব কলেজই বিনা বেতনে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের এক বিরাট অংশ ভর্তি জটিলতার শিকার হয়ে ভর্তি হতে বঞ্চিত হয়। 

অপর দিকে দেশের প্রায় ২০টি ডেন্টাল কলেজ বিএমডিসি কর্তৃক প্রণীত একই নীতিসমূহের বেড়াজালে প্রায় ১৬ হাজার ছাত্রছাত্রী ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ১ হাজার ৫০০ জনকে ভর্তি হওয়ার জন্য পাওয়া যায়নি। মাত্র ৪৫০ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় এবং কলেজগুলোর ৭০ শতাংশ সিট খালি থাকে, যার কারণে দেশ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়। মেধাবী হয়ে ভর্তি পরীক্ষা পাশের পরও দেশের বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ সমূহে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। ডেন্টালের ক্ষেত্রেও বিনা বেতনে ছাত্রছাত্রী ভর্তির জন্য পাওয়া যায়নি। অনেক সিট খালি থাকে এবং বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৫ হাজারের অধিক ছাত্রছাত্রী দেশের বাইরে পড়ার জন্য চলে যায়।

বিএমডিসি প্রণীত ভ্রান্ত নীতিগুলো বিশ্লেষণ করলে যে সম্ভাব্য কারণ দেখা যায় তা নিম্নরুপ-

পাশকৃত ছাত্র-ছাত্রীদের নিজস্ব পছন্দকে প্রাধান্য না দিয়ে বিএমডিসির নিজস্ব ঘোষিত নিয়মকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চালের একজন মেধাবী ছাত্রকে তার নিজস্ব এলাকার মেডিকেল বা ডেন্টাল কলেজে ভর্তির সুযোগ না দিয়ে ৩০০-৫০০ কিমি দূরের একটি কলেজে ভর্তির জন্য সিলেকশন করে দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে হোটেল ভাড়া, খাবার খরচ থেকে শুরু হয়ে নানাবিধ খরচের সংস্থান করতে না পেরে ছাত্রছাত্রী ভর্তি না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

ভর্তি প্রক্রিয়ায় নিশ্চায়ন, অটোমাইগ্রেশন, ঐচ্ছিক মাইগ্রেশনসহ নানাবিধ জটিল সব বিষয়কে ঢুকিয়ে দিয়ে অযথা কালক্ষেপণ এবং এক কলেজে ভর্তি করে আবার অন্য কলেজে পাঠানো। এভাবে দিনের পর দিন ছাত্র এবং অভিভাবকদের পেরেশানী বাড়িয়ে ভর্তিতে তাদের নিরৎসাহিত করা।

ভর্তির ক্ষেত্রে প্রথমে প্রায় ১০০০ টাকার ফরম পূরণ, ১০০ টাকার নিশ্চায়ন, ১ লাখ টাকার প্রাথমিক ভর্তির শর্ত পূরণ, পরবর্তীতে অন্য কলেজে আবার বিশাল অংকের টাকা পরিশোধে বাধ্য করণ, এভাবে পদে পদে হয়রানির নীতিমালা অভিভাবকদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে। ফলে সামর্থবান বাবা মা তাদের সন্তানদের বিদেশে ভর্তি করে দিয়ে নিশ্চিত হতে চেয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে প্রায় ৫ হাজারের অধিক ছেলেমেয়ে দেশের বাইরে চলে গেছে। দেশের এই ডলার সংকটের মাঝেও দেশ থেকে চলে যাচ্ছে লক্ষ কোটি ডলার, যার জন্য দায়ী শুধুমাত্র বিএমডিসির ভুল নীতি।

বিএমডিসির নিতিমালার আরেকটি অন্যতম ব্যর্থতা হচ্ছে পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের সিটখালি থাকা সত্ত্বেও একবারে ভর্তির জন্য উপযুক্ত ঘোষণা না করা। পাশকৃত ৪৯০০০ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রথমে ৩৫০০০, তারপর ৪০০০০, তারপর ৪৯০০০ ছাত্র ছাত্রীকে ভর্তি যোগ্য ঘোষণা করা এবং এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪ মাস কালক্ষেপণ করে ছাত্রছাত্রী এবং তাদের অভিভাবকদের মাঝে হতাশা তৈরি করা হয়। যেখানে পাশ্ববর্তী দেশ ভারত ১৬০০০০ সিট পূরণে তারা সময় নেয় সবর্মোট ২ মাস। 

এভাবেই আবারো ভুলে ভরা নিয়মনীতি প্রণয়ন করে দেশ এবং জাতির আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং ছাত্রছাত্রী-অভিভাবকদের মানসিক ভাবে বিপুল ক্ষতি করছে বলে আমরা মনে করি।

এবারও একই ধরনের নিয়মনিতি নিয়ে আসছে বিএমডিসি। অধিকন্তু শিক্ষা সংকোচন নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে পাশ মার্ক ৪০ এর স্থলে ৫০ করার প্রস্তাবনা নিয়ে হাজির হচ্ছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এ ধরনের কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হলে সেটা হবে আরও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

পাশ্ববর্তী দেশ ভারত চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রতি সিটের বিপরীতে কমপক্ষে ৫ জন পাশ করান হয়, সেখানে আমাদের দেশে প্রতি সিটের বিপরীতে ২ জন পাওয়া যায় না।
   
গতবছর এর তুলনায় এবার জিপিও ৫ প্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক কম, স্বাভাাবিকভাবেই গতবছর ১ লাখ ৩৯ হাজার ছেলেমেয়ে পরীক্ষা দিয়ে ৪৯ হাজার ছাত্রছাত্রী পাশ করলেও এবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমে যাবে প্রায় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার। ফলে পাশের সংখ্যা কততে দাঁড়াবে বোঝা কঠিন। এর মধ্যে যদি বিএমডিসির এসব ভ্রান্ত নীতি কাজ করে এবং এবারও যদি ছাত্রছাত্রী ভর্তি না হয় তবে বেসরকারি মেডিকেল বা ডেন্টাল কলেজগুলো ছাত্রছাত্রী ভর্তির অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। দেশের থেকে মেধা পাচার হয়ে যাবে, সঙ্গে যাবে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। আর এই নীতিমালা প্রণয়নে দেশ বিরোধী রাজাকারদের প্রেতাত্মারা খুশিতে নাচতে থাকবে। 

প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার বিদেশি ছাত্রছাত্রী মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে পড়তে আসে। তাদেরকেও নিরুৎসাহিত করতে বিএমডিসি আনছে ভিন্ন ভিন্ন নিতিমালা।

একমাত্র মেডিকেল শিক্ষার মাধ্যমে এদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার বিদেশি ছাত্র ভর্তি হওয়ায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জিত হয়। এই বিদেশি ছাত্রছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে বিএমডিসি নতুন নতুন উদ্ভট নীতিমালা তৈরি করছে। সারা পৃথিবীতে যেখানে নিট বা তদরূপ ডিগ্রি গ্রহণ করে পৃথিবীর যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ছাত্রছাত্রী ভর্তি করে নিচ্ছে অথচ সেখানে বাংলাদেশ এই নিট সঙ্গে আরও যোগকরে দেয়া হয়েছে জিপিএ তে ৩.৫ পাওয়ার সব শর্ত।

এমতাবস্থায় বিএমডিসির উচিৎ যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং সরকারের উচিৎ বিএমডিসি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা অপশক্তিগুলোকে খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।