প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশি-বিদেশি নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে হাঁটছেন। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য চারটি ভিত্তি সফলভাবে বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। এগুলো হলো—স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট ইকোনমি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট ও স্মার্ট সোসাইটি। এর পাশাপাশি হাতে নেওয়া হয়েছে ২১০০ সালের বদ্বীপ কেমন হবে—সেই পরিকল্পনা। স্মার্ট বাংলাদেশে সব কাজ, সম্পাদন করা হবে প্রযুক্তির মাধ্যমে। যেখানে প্রত্যেক নাগরিক প্রযুক্তি ব্যবহারে হবে দক্ষ। এমন সব চিন্তার ফল হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আমাদের বড় প্রাপ্তি। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল আইডেন্টিটি সেক্টর এবং সাইবার সিকিউরিটি গড়ে তোলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বেতবুনিয়ায় ভূ-উপগ্রহকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, আইটিইউ ও ইউপিইউ-এর সদস্যপদ অর্জন, টিএন্ডটি বোর্ড প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা প্রবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয়ের সূত্রপাত করে ডিজিটাল বাংলাদেশের বীজ বপন করে গেছেন। যার রূপ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণ করে এবং সফলভাবে ব্যবহার করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়েছে, একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উেক্ষপণের প্রস্তুতি চলছে। দেশে এখন সক্রিয় মোবাইল সিমের সংখ্যা ১৮ কোটি, ইন্টারনেট ব্রডব্র্যান্ড সেবা শহর ছেড়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রত্যন্ত গ্রামে পৌঁছেছে। সরকারের অন্যতম পরিকল্পনা গ্রাম হবে শহর এখন আর স্বপ্ন নয়। গ্রাম হবে শহর, মানে গ্রামগঞ্জে বড় বড় দালানকোঠা উঠবে তা কিন্তু নয়, আধুনিক গ্রাম হবে তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থানির্ভর এক গ্রাম, যেখানে গ্রামের কৃষকরা আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সব সুবিধা ব্যবহার করে জীবনের অভূত উন্নতির সুযোগ পাবেন, যার ফলে গ্রামে উত্পাদিত পণ্য সঠিক সংরক্ষণ ও যথাযথ মূল্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মোট আয় ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই স্যাটেলাইটটি থেকে প্রতি মাসে দেশীয় বাজার থেকে ১০ কোটি টাকার বেশি আয় হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করে সর্বোচ্চ মানের সেবা দিতে পারছে। প্রথমেই যমুনা টিভি, সময় টিভি, দীপ্ত টিভি, বিজয় টিভি, বাংলা টিভি ও মাই টিভি এবং সোনালী ব্যাংক ও ডাচ-বাংলা ব্যাংক স্যাটেলাইটের সেবা গ্রহণের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময় দেশের অন্যান্য টেলিভিশনও স্যাটেলাইট ব্যবহার শুরু করে।
বর্তমান সরকারের ঘোষিত স্মার্ট বাংলাদেশের রূপরেখায় সব অর্জনের জন্য যে একটা বিষয় নিরবচ্ছিন্নভাবে দরকার, তা হচ্ছে ইন্টারনেট পরিষেবা। ১৯৯৭ সালের তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকার রেলওয়ের ফাইবার অপটিক ক্যাবল বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ খাতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। ইন্টারনেট পৌঁছে গিয়েছিল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়, এই অগ্রযাত্রা এখনো চলমান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে। ডিজিটাল বাংলাদেশকে সরকারি সেবা, ক্যাশলেস ট্রানজেকশন, সামাজিক যোগাযোগ, দূরশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিংসহ নানা কাজে ইন্টারনেটবিহীন একমুহূর্ত কল্পনাতীত। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও বিটিআরসি ২০১৮ সালে আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে বাংলাদেশে প্রথম ৫জি প্রযুক্তির টেস্ট করেছে এবং ২০২১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ৫জি চালু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বিগ ডাটা, ব্লক চেইন, আইওটিসহ ভবিষ্যত্-প্রযুক্তির বিষয়ে দেশে যথেষ্ট অগ্রগতি হচ্ছে। ৫জি শুধু কথা বলার বা ফেসবুক চালানোর প্রযুক্তি নয়। এটি মূলত শিল্পবিপ্লবের হাতিয়ার। তাই এটি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে অটোমেশনের কাজে ব্যবহার করা জরুরি। এগুলোর জন্য সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ অতি প্রয়োজন। ডিজিটাল বাংলাদেশ, রূপকল্প ২০২১ অর্থাত্ মধ্যম আয়ের দেশ তথা উন্নয়নশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণ করে এখন আমরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আরো এগিয়ে যাচ্ছি উন্নত বাংলাদেশের দিকে, তথা স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১ স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে। এর মধ্যবর্তী সময় আবার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনের কাজও সম্পন্ন হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে ২০৪১ সালে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার সেই ঘোষণার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বা আমাদের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে সাম্য সমাজ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচিটি গ্রহণের একটি সর্বজনীন দিক লক্ষণীয়। তা হলো দেশের সব মানুষকে সম্পৃক্ত করে সরকার শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি ও জীবনধারার সম্মিলিত রূপান্তর করার মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলা।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন সফলভাবে বাস্তবায়নের পর আমরা এখন সেই নতুন কর্মসূচি নিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছি। এই কর্মসূচির নাম ‘স্মার্ট বাংলাদেশ-২০৪১’। এটি শেখ হাসিনার দ্বিতীয় স্বপ্ন—বাংলাদেশকে উন্নত বাংলাদেশ বানানোর জন্য। এ কর্মসূচির চারটি স্তম্ভ :স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট সোসাইটি, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, স্মার্ট ইকোনমি। সুতরাং ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে একটি সাশ্রয়ী, টেকসই, বুদ্ধিদীপ্ত, জ্ঞানভিত্তিক, উদ্ভাবনী স্মার্ট বাংলাদেশ।
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টানা ১৫ বছর ধরে দেশকে যেভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন ও বাংলাদেশ বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটেও অন্য দেশগুলোর মতো বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক সংকটে না পড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে তিনি এই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্ত অবস্থানে নিতে পেরেছেন। তা না হলে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশটাকে এই সংকটকালেও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা বেশ কঠিন হতো।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়