স্বাধীনতার ৫২ বছরেও সংরক্ষণ ও চিহ্নিত হয়নি সখীপুরের ‘টেকিপাড়া বধ্যভূমি’ 

মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫২ বছর পার হলেও টাঙ্গাইলের সখীপুরের টেকিপাড়া বধ্যভূমি সংরক্ষণ বা চিহ্নিত হয়নি। সেই শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয়নি কোনো স্থাপনাও। উপজেলার হাতীবান্ধা গ্রামের কামালিয়াচালা টেকিপাড়া খাল ও পাশের জঙ্গলে মৃত দেহগুলো পচে-গলে যাওয়া স্থানটি পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। 

ফলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সেই স্থানটি অরক্ষিত এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে ওই স্থানটিতে একটি ‘স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণে দীর্ঘদিনের দাবি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও এলাকাবাসীর।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট উপজেলার হাতীবান্ধা গ্রামের কামালিয়াচালা বাজার ঘেরাও করে ৩৫-৪০জন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এক সারিতে দাঁড় করিয়ে ১০ হিন্দু ব্যবসায়ীকে গুলি করে ও পিতাপুত্রসহ পাঁচজনকে হাত-পা বেঁধে পানিতে নিক্ষেপ করে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। একই এলাকার সরস্বতী নামের এক হিন্দু নারীকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। 

mamun-2

ওইদিন ছিল সোমবার। সাপ্তাহিক হাটের দিন। সময় আনুমানিক বিকাল ৩টা। হাট চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী দুইটি ভাগে বিভক্ত হয়ে একটি দল মির্জাপুরের পাথরঘাটা অন্যটি বাসাইল এলাকা থেকে অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালায়। ওই সময় হানাদাররা একত্রিত হয়ে মির্জাপুরের ছাওয়ালী গ্রামের ১০ হিন্দু ব্যবসায়ীকে আটক করে হাত-পা বেঁধে নৌকায় তুলে পাশের টেকিপাড়া খালের পাশে নিরাপদ জঙ্গলে নিয়ে যায়। ওই সময় হাটের লোকজন ছুটোছুটি করে দ্রুত বাজার থেকে সটকে পড়েন। ঘণ্টাখানেক পর ওই ১০ হিন্দু ব্যবসায়ীকে জঙ্গল ঘেঁষা খালের পাশে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে রাইফেল দিয়ে গুলি করে হত্যা করে হানাদাররা। ঘটনাস্থলেই তারা মারা যান। ভয়ে পরিবারের কেউই ওই লাশগুলো গ্রহণ করতে সাহস পায়নি। লাশগুলো সেখানেই পচে-গলে নিচিহ্ন হয়ে যায়। এর আগেও নিরাপদ ওই স্থানটির পাশেই বংশাই নদের মহিষডাঙা এলাকায় পিতাপুত্রসহ পাঁচজনকে হাত-পা বেঁধে পানিতে নিক্ষেপ করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। 

ওই ১০ হিন্দু ব্যবসায়ীর মধ্যে যারা পাকিস্তানি-হানাদারদের গুলিতে শহীদ হন, তারা হলেন মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ছাওয়ালী গ্রামের পাচু সাহার ছেলে প্রাণপ্রল্লব সাহা, মাদক বণিকের ছেলে মধু বণিক, কানাই বণিকের ছেলে গৌরচন্দ্র বণিক, বোরন সাহার ছেলে কৃষ্ণপদ সাহা, হারাধন সাহার ছেলে গৌরপদ সাহা ও অযুদ্ধা সাহা, যদু সাহার ছেলে গৌর শাহ, সুরেশ ঠাকুরের ছেলে তাপস ও গৌর ঠাকুর এবং যদু মোহন মণ্ডলের ছেলে খোকা মণ্ডল।
     
এ ছাড়াও উপজেলার হাতীবান্ধা গ্রামের বাসিন্দা যাদের হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে হত্যা করা হয়, তারা হলেন প্রভাত বাদ্যকর, তার ছেলে হুনু বাদ্যকর ও সোনাই বাদ্যকর, একই গ্রামের রমেশ চন্দ্র সরকারের ছেলে নিতাই চন্দ্র সরকার, কাশিনাথ মণ্ডলের ছেলে পূণ্য চন্দ্র মণ্ডল। চাকদহ গ্রামের গুরু দয়াল মণ্ডলের মেয়ে সরস্বতীকেও হাতিবান্ধা কামালিয়াচালা এলাকায় গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে হানাদার বাহিনী।

হাতীবান্ধা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার কামালিয়াচালা গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা নরেশ চন্দ্র সরকার বলেন, হাতীবান্ধা গ্রামের নিচু এলাকাটি মূলত হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। দরিদ্র হিন্দুদের বসবাস এখানে। এ এলাকাটি ছিল পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার জন্য নিরাপদ স্থান। ওই স্থানটির স্মৃতি সংরক্ষণ রাখতে দ্রুত ‘স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণের দাবি করছি। 

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার মো. ওসমান গণি বলেন, উপজেলার হাতিবান্ধা গ্রামের টেকিপাড়ার অরক্ষিত বধ্যভূমির ওই স্থানটি সংরক্ষণে একটি ‘স্মৃতিসৌধ’ নির্মাণ জরুরি।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের প্রশাসক ইউএনও মোহাম্মদ হোসেন পাটওয়ারী বলেন, হাতীবান্ধার ‘টেকিপাড়া বধ্যভূমি’ সংরক্ষণসহ উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত কয়েকটি স্মৃতিসৌধ সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।