একাত্তরে ইত্তেফাক এবং বদলে যাওয়া বাংলাদেশ

দৈনিক ইত্তেফাক একাত্তরে পা দিয়েছে। একাত্তর আমাদের জাতীয় জীবনে এক হিরণ্ময় সময়। তাই একাত্তর শব্দটির সহশব্দ বাংলাদেশ। ইত্তেফাক আর বাংলাদেশও হাতে হাত ধরে এগিয়ে চলেছে সগৌরবে। আর এই দুটো সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন দুটো উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম— সাংবাদিকদের শিরোমণি তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সাত দশকেরও আগে অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় তাদের পরিচয়। দুই জনই গণতন্ত্রের মানসপুত্র সোহরাওয়ার্দীর স্নেহধন্য। যেন দুই ভাই। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার পর তারা দুই জনেই পূর্ব বাংলার রাজনীতি ও সমাজে থিতু হতে থাকেন। যে পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করেছিলেন তারা তা ছিল এক ভ্রান্ত প্রত্যুষ। তাই শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষকে মুসলিম লীগের বাইরে এক নয়া রাজনৈতিক দলের আওতায় সংগঠিত করার জন্য সোহরাওয়ার্দী এবং মেহনতি মানুষের কণ্ঠস্বর মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গড়ে তোলার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তরুণ রাজনৈতিক শেখ মুজিব। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে আওয়ামী মুসলিম লীগ। পাকিস্তানি অপশাসকদের রোষানলে বারবার জেলে যেতে হচ্ছিল শেখ মুজিবকে। কারাবন্দি অবস্থাতেই নতুন দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হন তিনি। ইতিমধ্যে মওলানা ভাসানীও দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হকও জেলে যান। তারও আগে থেকে মওলানা ভাসানীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক ইত্তেফাক। মানিক মিয়া আদালতেই দেখা করেন শেখ মুজিব ও মওলানা ভাসানীর সঙ্গে। শেখ মুজিবের পরামর্শেই সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের দায়িত্ব নেন মানিক মিয়া।

১৯৫৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ইত্তেফাক সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ইয়ার মোহাম্মদ ও অন্যদের সমর্থনে মানিক মিয়ার নিরলস প্রচেষ্টায় কাগজটি আওয়ামী লীগের মুখপত্রে বিকশিত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষায়, ‘কিছুদিনের মধ্যে কাগজটা খুব জনপ্রিয় হতে লাগল। আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাকে সাহায্য করতে লাগল। ...আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠানের কাগজ হিসেবে জনগণ একে ধরে নিল।’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইপিএল, ২০১৯, পৃ. ১৭৫)। আর এটা সম্ভব হয়েছিল মানিক মিয়ার মতো ‘অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংবাদিকের’ হাতের ছোঁয়ায়। পুরো পাকিস্তান আমলে এই ‘দুই ভাইয়ের’ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের গভীরতার আঁচ পাওয়া যায় ১৯৬৯ সালের ৯ জুন বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘আমাদের মানিকভাই’ নিবন্ধে। তিনি সেদিন লিখেছিলেন, ‘বর্ষার মেঘরাজির ন্যায় তাঁর অপার স্নেহ সর্বক্ষণ আমাকে ঘিরে থাকত।’ রাজনৈতিক বুদ্ধিপরামর্শ তিনি সর্বদাই পেতেন মানিক মিয়ার কাছ থেকে। আর ইত্তেফাক ছিল তার পরম আরাধ্য। জেলখানায় ইত্তেফাক দেওয়া হতো না বলে তার দুঃখের শেষ ছিল না। রাজনীতির প্রতিটি পর্বে মানিক মিয়ার পরামর্শ নিতে ছুটে যেতেন ইত্তেফাক অফিসে। এমন কি চুয়াত্তরে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের আগে এবং পরে ইত্তেফাক অফিসেই তিনি বসতেন তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের নিয়ে। ছয় দফার সারবস্তু লাহোর সম্মেলনে উপস্থাপনের বুদ্ধি তাকে মানিক মিয়াই দিয়েছিলেন।

মানিক মিয়ার রাজনৈতিক ধারণা যে খুবই স্পষ্ট ও স্বচ্ছ ছিল তা বঙ্গবন্ধুর আরেকটি লেখায় খুঁজে পাওয়া যায়। মইনুল হোসেন সম্পাদিত ‘অবিস্মরণীয় মানিক মিয়া’ (১৯৯৫) বইটিতে ‘আমার মানিক ভাই’ প্রবন্ধে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘রাতের পর রাত দিনের পর দিন মানুষের অধিকারের বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। তখন মানিক ভাইয়ের মধ্যে এদেশ ও দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা এবং অনুভূতির প্রখরতা এত সুগভীর ছিল যে, মানুষ কী চায়, কীভাবে সহজেই তিনি বুঝতে পারতেন এবং তুলে ধরেছেন লেখনীর মাধ্যমে।’ আর সে কারণেই বঙ্গবন্ধু তার ‘কারাগারের রোজনামচা’ (২০১৭, পৃ. ৯৬) গ্রন্থে লিখেছেন যে, ‘এদেশ থেকে বিরুদ্ধ রাজনীতি মুছে যেত যদি মানিক মিয়া এবং ইত্তেফাক না থাকত।’

মানিক মিয়ার অনুপস্থিতিতে তার পরিবারের সদস্যরা কাগজটি নিষ্ঠার সঙ্গেই চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন ইত্তেফাক গ্রুপের সভাপতি মানিক মিয়ার ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন। আর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তার স্ত্রী তাসমিমা হোসেন। প্রকাশক তাদের কন্যা তারিন হোসেন। প্রবীণে নবীনে মিলে আগের মতোই দারুণ পেশাদারিত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে যাচ্ছেন কাগজটি। নিঃসন্দেহে নিজের মেধা, দীর্ঘদিনের মন্ত্রিত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সম্পাদক হিসেবে হাতেকলমে কাজ করা জনাব আনোয়ার হোসেনই দৈনিক ইত্তেফাকের মূল সঞ্চালনা শক্তি। আজও তিনি প্রতিটি লেখা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। আমি দীর্ঘদিন ইত্তেফাকের সম্পাদকীয় পাতায় লিখেছি। তাই এই কাগজটির সম্পাদকীয় গুণমান, নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়গুলো খানিকটা হলেও জানি। তারুণ্যের চাওয়া-পাওয়া যেমন মানিক মিয়ার দৃষ্টি এড়ায়নি, বর্তমানেও তার উত্তরসূরি সম্পাদকীয় টিমের আরাধ্য বলে আমার কাছে মনে হয়। সম্প্রতি ‘দৈনিক ইত্তেফাক ফ্রন্ট পেজেস (১৯৫৩-১৯৭২)’ প্রকাশ করে সম্পাদকমণ্ডলী ইতিহাসের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতার প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্যেও ইত্তেফাক কী করে ঐতিহ্য, ভিশন এবং স্বদেশ ও জনগণের প্রতি তার দায় অক্ষুণ্ন রেখেছে তার প্রমাণ মেলে এখানে। মানিক মিয়ার অমর কীর্তি ইত্তেফাক আজও তাই পাঠক নন্দিত। তাই ইত্তেফাকের ৭১ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশের এই ইতিবাচক রূপান্তরের দিকে সংক্ষেপে হলেও আলোকপাত করা দরকার।

নিঃসন্দেহে স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের অনন্য অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামের যথার্থ সূচনা নিশ্চিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মানতেই হবে যে, বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে হারানোর পর এই অভিযাত্রা বড় হোঁচট খেয়েছিল। মাথাপিছু আয়ের বিচারে যাকে ‘কোয়ান্টাম জাম্প’ বা বড় উল্লম্ফন বলে সেটা শুরু হয় বঙ্গবন্ধুকন্যা দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া শুরু করার পর (২০০৮-০৯) থেকে। ২০০৮ থেকে ২০২২ সময়কালে আমাদের মাথাপিছু আয় প্রায় চার গুণ বেড়ে ৬৯৯ ডলার থেকে ২ হাজার ৬৮৮ ডলার হয়েছে। তাছাড়া গত আট বছর ধরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের চেয়ে বেশি থাকছে (এখন প্রায় দ্বিগুণ)। গত চার বছর ধরে এই সূচকে বাংলাদেশ ভারতকেও পেছনে ফেলে চলেছে। মানুষের সার্বিক জীবন মানেও এই উন্নয়নের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। শতভাগ মানুষ বিদ্যুত্ পাচ্ছেন। কেউ আর গৃহহীন নেই। মঙ্গা শব্দটি এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে।

এ সময়ে জিডিপিতে আধুনিক শিল্প খাতের অবদান ২২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৭ শতাংশ হয়েছে। শিল্প খাতের অবদান বাড়ায় জিডিপিতে কৃষির অংশ কমে আসছে। কিন্তু তাই বলে কৃষি মোটেও পিছিয়ে পড়েনি। স্বাধীনতার পর থেকে এ যাবত্কালে আমাদের কৃষি উত্পাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ। রপ্তানিমুখী শিল্প খাতেও আমরা অর্থনৈতিক শক্তির প্রমাণ রেখে চলেছি নিয়মিত। নানা সংকট সত্ত্বেও টানা দুই বছর আমরা ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য ছাড়িয়ে গিয়েছি। সর্বোপরি আমাদের শক্তির জায়গা হিসেবে রয়েছে প্রবাসী আয়। বিগত ১৫ বছরে আমাদের বার্ষিক প্রবাসী আয় ৮.৯৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২১.৫০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। অর্থনীতি এমন শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে বলেই মাস্টারকার্ড ইকোনমিক ইনস্টিটিউটের প্রক্ষেপণ বলছে, চলতি বছর শেষে ৬.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সমতুল্য ৪৬টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে থাকবে বাংলাদেশ। সরকারি প্রক্ষেপণ তো আরো বেশি (৭.৫ শতাংশ)।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের সামনে রয়েছে আরো উজ্জ্বলতর সম্ভাবনা। আমাদের জনশক্তির মেডিয়ান বয়স মাত্র ২৬.৭ বছর (ভারতের ২৮.১ আর চীনের ৩৭.৪)। তরুণ এই জনশক্তির মধ্যে ১১ শতাংশের রয়েছে উচ্চ শিক্ষা। এই অনুপাত ২০২৬ সালের মধ্যে বেড়ে ৩২ শতাংশ হবে। তখন তাদের দেশে-বিদেশে আয় করার সক্ষমতাও বাড়বে বহুলাংশে। বৃহত্ যে অবকাঠামোগুলো শেষ হয়েছে বা অচিরেই শেষ হতে যাচ্ছে সেগুলোর প্রত্যেকটি আমাদের বার্ষিক জিডিপিতে ১.২ শতাংশ করে যোগ করবে। আরএমজির পাশাপাশি অন্য রপ্তানি খাতও দ্রুত বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। ফলে ২০৩০ সাল নাগাদ জার্মানি ও ইউকের মতো দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ হবে নবম বৃহত্তম কনজ্যুমার অর্থনীতি। তখন ৩ কোটিরও বেশি নাগরিক থাকবেন ‘মিডল অ্যান্ড অ্যাফ্লুয়েন্ট ক্লাসে’।

তবে এই সব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরি, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণসহ অন্যান্য উদ্যোগের মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি ইত্যাদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে কার্যকরভাবে। এছাড়াও আর্থিক খাত ও বহিঃঅর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সুদ ও বিনিময় হার আরো নমনীয় করা এবং আর্থিক খাতের পরিচালনায় প্রয়োজনীয় সংস্কারেও নীতি-মনোযোগ বাড়াতে হবে। সর্বোপরি সুশাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় থাকতে হবে সর্বাত্মক উদ্যোগ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের চাওয়ার আলোকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে থাকতে হবে অবিচল। আর জলবায়ু পরিবর্তনের যে চ্যালেঞ্জ তা তো রয়েছেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সামাল দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখাটিই আমাদের প্রধান করণীয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সমকালীন বাস্তবতায় সক্রিয় দৈনিক ইত্তেফাকের গুরুত্ব বোঝার জন্য শেষ করি উন্নয়ন ও বাক্স্বাধীনতার পরস্পর যুগলবন্দি বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটির (পৃষ্ঠা ১১৯) সর্বশেষ দুটো লাইন উল্লেখ করে। তার ভাষায়— ‘আমার মতে, ভাত-কাপড় পাবার ও আদায় করে নেবার অধিকার মানুষের থাকবে, সাথে সাথে নিজের মতবাদ প্রচার করার অধিকারও মানুষের থাকা চাই। তা না হলে মানুষের জীবন বোধ হয় পাথরের মতো শুষ্ক।’

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর