দিনাজপুরে মহাসংকটে কিডনি রোগীরা

দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের দাবিতে গত মঙ্গলবার সকাল ১০টায় প্রায় ৫০ জন ডায়ালাইসিস রোগী জীবন বাঁচাতে হাসপাতালের পরিচালক এ টি এম নুরুজ্জামানের কার্যালয় ঘেরাও করেন। এ সময় তারা ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানান।

জানা যায়, হাসপাতালটিতে দীর্ঘ চার মাস যাবত্ ডায়ালাইসিস সেবা ঠিকমতো হচ্ছে না। বাড়তি খরচ করেও মিলছে না ডায়ালাইসিসের ওষুধ, ইনজেকশন, পানিসহ অন্যান্য উপকরণ। আর এতে দুর্ভোগে পড়েছে দরিদ্র রোগীরা। অর্থের অভাবে উপকরণ কিনতে না পারায় জীবন রক্ষায় তাদের রাস্তায় নামতে হয়েছে বলে জানান তারা।

রেজা হুমায়ুন কবীর (৪৩) ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে অসুস্থ হন, জানতে পারেন তার দুটি কিডনিই নষ্ট। এরপর শুরু হয় ডায়ালাইসিস। সাত বছর ধরে সপ্তাহে তিন দিন রুটিন করে ডায়ালাইসিস নিচ্ছেন। রেজা পেশায় কৃষক। বিঘা চারেক জমি আছে তার। স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। জমানো অর্থ যা ছিল চিকিত্সায় ব্যয় করেছেন। এবার হাত দিয়েছেন জমিতে। সম্প্রতি ১৩ কাঠা জমি বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। তাদের বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলের সহোদর গ্রামে।

সম্প্রতি ডায়ালাইসিস নিয়ে ফেরার সময় দিনাজপুরের এম আবদুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে কথা হয় নাসিমা-রেজা দম্পতির সঙ্গে। রেজা জানান, একমাত্র সন্তানকে (১০ বছর বয়স) তার নানির কাছে রেখে আসেন। অসুস্থ জীবনে স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই রেজার। পাশে দাঁড়ানো স্ত্রীকে দেখিয়ে বলেন, সাত বছর ধরে স্ত্রী একটি মুহূর্তও একা রাখেননি। শীত-রোদ-বৃষ্টি, অভাব-অনটন উপেক্ষা করে সেবা করে যাচ্ছেন।’ সম্প্রতি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস খরচ বেড়েছে। চিকিত্সার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন রেজা। জানালেন, হাসপাতালের ফি, যাতায়াত খরচসহ একবার ডায়ালাইসিসে খরচ হতো মাত্র ৯০০ টাকা। সেখানে গত পাঁচ মাস থেকে খরচ পড়ছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ টাকা। ডায়ালাইসিস বাদেও প্রতি মাসে তাকে ওষুধ কিনতে হয় ২ হাজার ৮০০ টাকার। হিসাব অনুযায়ী প্রতি মাসে চিকিত্সায় তার ব্যয় হচ্ছে ১৩ হাজার ৬০০ টাকা।

হাসপাতালে ডায়ালাইসিস ইউনিটে শুরু থেকে দায়িত্ব পালন করছেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট আবু ইউসুফ। তিনি বলেন, ওয়ার্ডে যারা দায়িত্বে আছি, প্রত্যেক রোগীর নাম-পরিচয়ের পাশাপাশি পারিবারিক অবস্থার কথাও জানি। অনেকের পরিবারের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ আছে। রেজিস্টার দেখে জানালেন, শুরুতে ১০টি মেশিন দিয়ে সেবা চালু হয়। বর্তমানে ২৯টি মেশিন আছে। তবে পাঁচটি মেশিন সম্প্রতি অকেজো। জানালেন, রংপুর মেডিকেলে ডায়ালাইসিস সেবা সাময়িক বন্ধ থাকায় এখানে রোগীর চাপ বেড়েছে। এ জন্য ওষুধপত্রসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক সাওয়ার আলম বলেন, ওষুধপত্রসহ অন্যান্য সামগ্রীর ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তবে এ সমস্যা সাময়িক। ইতিমধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয়েছে।

এ অবস্থায় গত মঙ্গলবার সকাল ১০টায় প্রায় ৫০ জন ডায়ালাইসিস রোগী জীবন বাঁচাতে হাসপাতালের পরিচালক এ টি এম নুরুজ্জামানের কার্যালয় ঘেরাও করেন। এসময় তারা ডায়ালাইসিস ব্যবস্থা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানান। পরে হুইপ ইকবালুর রহিমের হস্তক্ষেপে ও আর্থিক সহযোগিতায় এবং হাসপাতালের জাকাতের টাকায় ডায়ালাইসিসের পানিসহ ফ্লুইড সংগ্রহ করে চিকিত্সা ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা হয়। তবে এই ব্যবস্থাপনা দিয়ে চার-পাঁচ দিন ডায়ালাইসিস চালানো সম্ভব হবে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নেফ্রোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. ফজলে এলাহী বলেন, কিছু কিছু রোগীকে রেনাল কেয়ার—এসি ও রেনাল কেয়ার—বি পানি সরবরাহ করা হয়েছে। তবে চরম সংকট রয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক এ টি এম নুরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।