গত বছরের ঘটনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বাখমুতের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সোজা মার্কিন মুলুকে উড়ে যান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সফরকালে ভাষণ দেন মার্কিন কংগ্রেসে। ঐ ঘটনার পর বিভিন্ন মহল থেকে বেশ প্রশংসা পেয়েছিলেন রুশ বাহিনীকে ধরাশায়ী করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জেলেনস্কি। কুড়িয়েছিলেন সত্যিকারের বীরের তকমা। রাশিয়ার আগ্রাসন প্রতিহত করার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের দুই রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও রিপাবলিকানের অকুণ্ঠ সমর্থনও পেয়েছিলেন। তবে আজ যেন সেই সব ইতিহাস! জেলেনস্কির প্রতি মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি সাম্প্রতিক সময়ে পালটে গেছে বলেই মনে হচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলের লড়াইয়ে প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পাচ্ছে না ইউক্রেনীয় বাহিনী। অন্যান্য ফ্রন্টেও কিয়েভের অবস্থা আশানুরূপ ভালো নয়। এক্ষেত্রে রাশিয়া বেশ এগিয়ে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এখন পর্যন্ত ভালোই মোকাবিলা করে চলেছে মস্কো। ফলে রাশিয়ার অর্থনীতিও চলছে স্বাভাবিক গতিতে। যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাদের হতাহত ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি ক্রেমলিনকে যে একেবারেই ভোগাচ্ছে না, তা নয়। তবে মানতে হবে, পরিস্থিতি বিবেচনায় লড়াইয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনই। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে ভোঁতা করে দিচ্ছে রুশ সেনারা। ইউক্রেনের শীর্ষ জেনারেলদের বিভিন্ন বক্তব্য-বিবৃতিতেও বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায়।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মস্কোর মেজাজ বেশ চড়া! যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ইউক্রেনের মাটিতে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ পরিচালনার পথে পা বাড়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন, তা অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চলবে বলেই দৃশ্যমান। ক্রেমলিনের ধারণা সম্ভবত এমন, লম্বা সময় ধরে যেসব ফ্রন্টে লড়াই চলছে, সেগুলোতে রুশ আধিপত্য ধরে রাখা গেলে কিয়েভের পশ্চিমা সমর্থকদের মধ্যে আরো বেশি চিড় ধরবে। রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ১৭ শতাংশ অঞ্চল পুনরুদ্ধারসহ যুদ্ধে বিজয়ী হবে কিয়েভ—পশ্চিমের এমন মনোভাবও ঢেকে যাবে ঘনীভূত সংশয়ের চাদরে।
কিয়েভকে সমর্থন করার প্রশ্নে ওয়াশিংটনে যা ঘটছে, তাতে পুতিন যারপরনাই খোশমেজাজে রয়েছেন—এ কথা বলতেই হয়। ইউক্রেনকে প্রতিশ্রুত ৬১ বিলিয়ন ডলার সাহায্য পাঠানোর বিষয়ে রিপাবলিকান পার্টির অনেক নেতা আগের অবস্থানেই রয়েছেন। তাদের সাফ কথা, বাইডেন প্রশাসনের এই উদ্যোগ যুদ্ধক্ষেত্রে কিয়েভকে খুব একটা সুবিধা এনে দিতে পারবে না বিধায় এসব করার কোনো মানেই হয় না।
পশ্চিমা পক্ষ থেকে কিয়েভের জন্য যে একটা বড় ধাক্কা আসবে, তা বহু আগেই বলে রেখেছেন পুতিন। মনে থাকার কথা, বছরব্যাপী যুদ্ধ চলার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ইউক্রেন ও তার পশ্চিমা মিত্রদের উপহাস করে কথা বলেছিলেন পুতিন। তার ভাষায়, ‘ইউক্রেনের নিজের কিছু নেই। কোনো ক্ষমতা নেই। সবকিছুই আসছে পশ্চিম থেকে। তবে এটা একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। মনে হচ্ছে, সময়টা খুব কাছেই।’
পুতিনের মুখে এ ধরনের কথা নিয়মিতই শুনতে পাওয়া যায় বটে। তবে এতে যে কিয়েভের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না, তেমন কথা বলা যাবে না। একটা পর্যায়ে আমরা দেখেছি, হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের হস্তক্ষেপে ইউক্রেনের জন্য প্রতিশ্রুত ৫৫ বিলিয়ন ইইউ আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। এক জার্মান রাজনীতিবিদ এ নিয়ে মজা করতেও ছাড়েননি। তিনি বলেছিলেন, ‘এসব করে লাভ কী? পুতিন তো মাথার ওপরেই চেপে বসে আছেন! ফলে সব ব্যয় পানিতে পড়বে। তাছাড়া ইউক্রেনকে সহায়তা করা মানে নিজেদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।’
এ ধরনের কথা কি কেবল কথার কথা? অবশ্যই না। আমরা লক্ষ করছি, জেলেনস্কি যেন ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। তার সাম্প্রতিক কথাবার্তা শুনলে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায়। মনে রাখতে হবে, ইউক্রেনের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে আগামী দিনগুলোতে তাকে পাড়ি দিতে হবে ‘এক কঠিন রাস্তা’। তার কাজকে কঠিন করে তুলেছে মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো। ফলে ‘ইউক্রেন সমস্যা’ এখন আর ‘এক নম্বর আন্তর্জাতিক সংকট’ হিসেবে বিশ্বের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দতে নেই।
যুদ্ধের প্রথম বর্ষপূর্তিতে জেলেনস্কি কী বলেছিলেন, মনে পড়ে? তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘২০২৩ সাল হবে আমাদের বিজয়ের বছর।’ জেলেনস্কির সেই আশা কি বাস্তবতার মুখ দেখেছে? অর্থাত্, ২০২৪ সাল নিয়ে যে তিনি কোনো পূর্বাভাস দেবেন না, তা অনুমেয়। বরং আগামী বছর তার দুর্দশা বাড়বে বই কমবে না। চলতি ডিসেম্বর মাসের অবস্থা সে কথাই বলছে। বিশেষত বিগত কয়েক দিন ধরে রাশিয়া যেভাবে বড় পরিসরে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তাতে করে এটাই যুক্তিযুক্ত পূর্বাভাস।
শুক্রবার (২৯ ডিসেম্বর) ইউক্রেন জুড়ে হাইপারসনিক কিনজালসহ মোট ১৫৮টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে রাশিয়া। এতে কমপক্ষে ১৮ জন নিহত হয়েছে। আহত মানুষের সংখ্যাও কম নয়। জেলেনস্কির ভাষ্যমতে, ‘হামলা চালাতে অস্ত্রাগারে থাকা প্রায় সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছে মস্কো।’ অর্থাত্, যেভাবে আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে হামলা চালাতে দেখা যাচ্ছে পুতিন বাহিনীকে, তাতে করে সামনের দিনগুলোতে কী ধরনের আক্রমণ চলতে পারে, সে বিষয়ে ভালোমতোই আন্দাজ করা যায়।
পুতিনের রাশিয়া যে অতিমাত্রায় ভালো আছে, তেমনও নয়। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দুর্বলতা বাড়াচ্ছে মস্কোর। দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে একটু একটু করে। দেশত্যাগ ও যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি—এ দুই বিষয় ভোগাবে পুতিনকে। সংকট ইতিমধ্যে বেশ ঘনীভূত আকার ধারণ করেছে। তথ্য বলছে, ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া ছেড়েছে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাশিয়ায় আসন্ন নির্বাচনে পুতিন বিজয়ী হবেন বটে, কিন্তু এসবের একটা নেতিবাচক প্রভাব রয়েই যাবে। শ্রমের ঘাটতির ফলে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান মজুরি ও মূল্যস্ফীতির মতো বিষয় আটকানো কঠিন হবে পুতিনের জন্য।
জানিয়ে রাখা দরকার, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ভালোভাবে এড়িয়ে শিল্প উত্পাদনের চাকা সচল রাখার মাধ্যমে রাশিয়ার অর্থনীতি চাঙ্গাভাব বজায় রেখে চলেছে। তবে বেশির ভাগ অর্থই ব্যয় হয়ে যাচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর কাজে। এর ফলে আগামী বাজেট ঘাটতির সম্মুখীন হতে পারে। অর্থাত্, রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য খারাপ সংবাদ অপেক্ষা করছে। পুতিনের ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রেও এটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। যদিও অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনসের কথা অনুযায়ী, ‘দীর্ঘ মেয়াদে আমরা সবাই মৃত।’
আগামী বছরের মার্চে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন একটি আনুষ্ঠানিকতামাত্র। কারণ, ক্ষমতায় পুতিনই থাকবেন। অন্যদিকে, ’২৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসতে বছরব্যাপী একপ্রকার মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প কোনোভাবে ক্ষমতায় এলে ইউক্রেন যুদ্ধের চিত্র আমূল পালটে যাবে। কিয়েভের দুঃস্বপ্ন-যাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হবে মস্কোর স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলা।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইউক্রেন আর তেমন একটা সহায়তা পাবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং বিষয়টি ক্রমশ জট পাকিয়ে যাচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ এর বিরোধিতা করতে শুরু করেছেন। ডেমোক্রেটিক সিনেটর ক্রিস মারফির কথা এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করতে হয়। ‘আমরা ইউক্রেনকে পরিত্যাগ করতে চলেছি’—মারফির এ ধরনের কথার মানে কী? মজার ব্যাপার হলো, ইউক্রেনকে সমর্থন বা সাহায্য করার প্রশ্নে পশ্চিমারা বরাবরই মন্ত্রের মতো করে বলে এসেছে, ‘যত দিন লাগে’ আমরা সাহায্য করে যাব। তবে সময় সম্ভবত বদলে যাচ্ছে। দিন কয়েক আগে খোদ জেলেনস্কির পাশে দাঁড়িয়েই বাইডেনকে বলতে শোনা গেছে, ‘যত দিন পারে’ যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সমর্থন করবে। ইউক্রেনের জন্য হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে বইকি।
মাথায় রাখতে হবে, কেবল তহবিল সরবরাহ নয়, কিয়েভের প্রতি মার্কিন অস্ত্রের সরবরাহও ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এই শূন্যস্থান পূরণের ক্ষমতার চাবি যেহেতু ইউরোপের হাতেও নেই, সুতরাং বিশ্লেষক উপসংহারে এটা বলা যায়, যুদ্ধে ইউক্রেনের বিজয়লাভের স্বপ্ন ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনে যুদ্ধের ময়দান কেমন হতে পারে? ইউক্রেন অনেকটা প্রতিরক্ষামূলক ভঙ্গিতে অবস্থান করবে। এক্ষেত্রে মনে রাখার বিষয়, রাশিয়া ‘ধীরে চলো’ নীতিতে হাঁটা শুরু করে দিয়েছে। সক্ষমতা অনুপাতে বৃহত্ ও ভয়াবহ পরিসরে হামলার রাস্তা পরিহার করে চলেছে মস্কো। অর্থাত্, তাদের প্রতিহত করাটা কঠিনতর হয়ে উঠবে কিয়েভের জন্য।
আশঙ্কার কথা হলো, এ ধরনের পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে পারে অন্যান্য বৈশ্বিক ইস্যুতে। এর কারণ, এ ধরনের প্রবণতা আগ্রাসন চালানোর বিষয়ে উত্সাহিত করে, যা বিপজ্জনক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। পরিষ্কার করে বললে, তাইওয়ান ইস্যুর মতো বিষয় এতে করে প্রভাবিত হতে পারে। মিত্রদের প্রতি মার্কিন প্রতিশ্রুতি ও সহায়তা সম্পর্কে ভুল বার্তা যাওয়ার মাধ্যমে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে নতুন নতুন সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
জেলেনস্কি যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার টেবিলে বসবেন বলে মনে হয় না। ‘আমাদের জন্য এর অর্থ হলো, ক্ষতটি ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য খোলা রেখে যাওয়া’—নভেম্বরে টাইমকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে তার এ ধরনের কথা সেই ইঙ্গিত বহন করে। তবে যত কথাই বলা হোক না কেন, বর্তমান বাস্তবতা হলো, বেঁচে থাকার রাস্তা খুঁজে পেলেও জয়ের দেখা পাবে না কিয়েভ!
লেখক: ব্রিটিশ সাংবাদিক। বিবিসি ও সিএনএনের নিয়মিত কলামিস্ট
সিএনএন থেকে অনুবাদ: সুমৃত খান সুজন