৬ষ্ঠ জনশুমারি ২০২২ অনুসারে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। বাংলাদেশে মোট ১১ কোটির ওপর ভোটার, যাদের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৪ লাখ পুরুষ ও ৪ কোটি ৪৭ লাখ নারী। নতুন ভোটার প্রায় ৫৯ লাখ এবং জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯-এর মধ্যে। এই বিপুলসংখ্যক তরুণ ও নতুন ভোটার শিক্ষা এবং কর্মজীবন নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখেন। আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কিছু কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। যুবসমাজকে আত্মপ্রত্যয়ী, দক্ষ ইতিবাচক মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা, তাদের সহজাত সম্ভাবনা দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করা, তাদের অর্থনৈতিক ও উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সমর্থন করা, তরুণদের বৃহত্ পরিসরে মেধার বিকাশ ও সম্ভাবনার সুযোগ বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের ঘোষিত অঙ্গীকারগুলো সময়োপযোগী।
শিক্ষা : শিক্ষার বিকাশ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়ন ও দারিদ্র্য নিরসনে গতিবেগ সঞ্চার করে। শিক্ষাকে মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান উপাদান হিসেবে গ্রহণ করায় প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার ১৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ছাত্রী ভর্তির হার মাধ্যমিক স্তরে ৫৪.৬৭ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ৫২.১৩ শতাংশ। শিক্ষাক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা অর্জিত হয়েছে এবং নারী শিক্ষার প্রসারে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচেষ্টা সারা বিশ্বে প্রশংসিত। মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী এবং কর্মমুখী শিক্ষায় রূপান্তরের জন্যও কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে ৫৬টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১১৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে।
নির্বাচনি ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বলেছে যে, সরকার গঠন করতে পারলে দলটি নিষ্ঠার সঙ্গে সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে যা একই পদ্ধতির গণমুখী এবং সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষাকে সংগতিপূর্ণ করার কথা বলে, সেটি বাস্তবায়ন করবে। শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়লে নতুন প্রজন্ম স্বনির্ভর হবে এবং দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়েছে যে আওয়ামী লীগ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ যুক্তিসংগত করবে এবং তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভাষা, উচ্চতর গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। ?
দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে তরুণরা যেন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে আওয়ামী লীগ। দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় সমান কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থী ৩৬.৩০ শতাংশ। উচ্চশিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদান করার কথা বলা হয়েছে। ইশতেহারে অঙ্গীকার করা হয়েছে যে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সন্তানদের উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ আরো প্রসারিত করা হবে।
নতুন প্রজন্মকে আধুনিক ও বিজ্ঞানমুখী করার পরিকল্পনার পাশাপাশি সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে নতুন ইশতেহারে। বলা হয়েছে, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী ধ্যানধারণা প্রচার ও জঙ্গি বাহিনী গড়ে তোলার ষড়যন্ত্রমূলক প্রয়াস কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ অব্যাহত থাকবে এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে যথাযথ শিক্ষা পাঠক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে।
মাদক ও সন্ত্রাসকে যুবসমাজের জন্য সমস্যা চিহ্নিত করে ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়েছে যে, মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত স্মার্ট যুবসমাজ গঠনের লক্ষ্যে বিদ্যমান ক্রীড়া অবকাঠামোর অধিকতর উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ক্রীড়া কমপ্লেক্স, মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স, ইনডোর স্টেডিয়াম ও সুইমিং পুল এবং বিভাগীয় শহরগুলোতে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হবে।
প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান :যুবসমাজের সার্বিক কল্যাণে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় যুবকদের উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রশিক্ষণোত্তর আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে স্বাবলম্বীকরণ, যুবঋণ প্রদান, দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি কর্মসূচি চালু করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে মোট ৩ কোটি ৩১ লাখ যুবককে দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়েছে সরকার। প্রশিক্ষিত যুবকদের প্রকল্প স্থাপন ও সম্প্রসারণের জন্য ঋণ কর্মসূচির আওতায় মূল ও ঘূর্ণায়মান ঋণ তহবিল থেকে ঋণসুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
বেকারত্বের অভিশাপ থেকে যেন তরুণদের মুক্ত রাখা যায়, সেই লক্ষ্যে সরকার গত ১৫ বছরে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, ফলে বেকারত্বের হার ৬ শতাংশ (২০০৯) থেকে ৩.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তথ্য, প্রযুক্তি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লব উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নে তৃণমূল পর্যায়ে পশ্চাত্পদ, অনগ্রসর যুবকদের কম্পিউটার ও নেটওয়ার্কিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। অনলাইন শ্রমের বাজারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম সেবা প্রদানকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
যুবসমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা, কর্মোপযোগী কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা গেলে দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে। আওয়ামী লীগ বলেছে যে, সরকার গঠন করতে পারলে ২০৩০ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি ধীরে ধীরে দেশের সব উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হবে। তৃণমূল পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আরো জোরদার করার লক্ষ্যে প্রতি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। বেকার যুবকদের হার ১০.৬ শতাংশ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে ৩.০ শতাংশ নামিয়ে আনা হবে। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা ১৭.৮ শতাংশ যুবকদের অনুপাত আগামী পাঁচ বছরে ৭ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে আওয়ামী লীগ।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ঘূর্ণায়মান ঋণ তহবিল, বিভিন্ন ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য বিশেষ সেল গঠন করে উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা হবে বলা হয়েছে। এমনটি বাস্তবায়ন করা গেলে দরিদ্র পরিবারের অনেক তরুণ যারা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তারা নিশ্চিত উপকৃত হবেন। আগামী পাঁচ বছরে ২ লাখ যুবকের মধ্যে ৭৫০ কোটি টাকা যুব ঋণ বিতরণ এবং ২ লাখ ৫০ হাজার জন যুবককে আত্মকর্মী হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিশ্চয়ই আমাদের তরুণদের নতুন স্বপ্ন দেখাতে সহায়ক হবে।
এছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে দেশে-বিদেশে বিকাশমান কর্মসংস্থানের সুযোগগুলো কাজে লাগানোর জন্য নতুন প্রযুক্তিবিষয়ক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে পলিটেকনিক ও ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলো ঢেলে সাজানোর কথা বলা হয়েছে। বিদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ-প্রশিক্ষিত কর্মী পাঠানো গেলে শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রেমিট্যান্সও বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য নারী উদ্যোক্তা এবং স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ করে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে আর্থিক সহায়তা, পরামর্শদান ও সংস্থান নিশ্চিত করা এবং নারী মালিকানাধীন ব্যবসার জন্য অনুদান, ঋণ ও বিনিয়োগ উদ্যোগের মাধ্যমে পুঁজির অভিগম্যতা সহজতর করার মাধ্যমে নারীদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। নারীদের কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়নকে সহজ করবে।
আধুনিক, প্রগতিশীল ও সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত বুদ্ধিভিত্তিক চর্চার প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যুবসমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য প্রতিটি উপজেলায় পাঠাগার স্থাপন, গণতান্ত্রিক, সাংস্কৃতিক ও শরীরচর্চা কেন্দ্র এবং ‘স্মার্ট ইউথ হাব’ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণরাও যেন সমানভাবে বিকাশ লাভের সুযোগ পায়, তার দিকেও নজর দেওয়া হয়েছে ইশতেহারে। অঙ্গীকার করা হয়েছে অসহায়, অসমর্থ এবং শারীরিকভাবে অক্ষম যুবকদের শিক্ষা ও চিকিত্সা সহায়তার আওতায় আনার লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
আগামী প্রজন্মের বিকাশে দুর্নীতিমুক্ত সমাজব্যবস্থা, প্রগতিশীল ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা, সন্ত্রাস-নাশকতামুক্ত সমাজ এবং সুস্থ ধারার ষড়যন্ত্রবিহীন রাজনীতি প্রয়োজন। তরুণদের স্বনির্ভর জনগোষ্ঠী হিসেবে রূপান্তরের পাশাপাশি তাদের সহজাত সম্ভাবনা দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনে ব্যবহারের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি সুষ্ঠু-অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে আমাদের নতুন প্রজন্মের চাহিদা ও স্বপ্নগুলো নিশ্চয়ই বাস্তবায়িত হবে।
লেখক: আইনজীবী ও গবেষক