দেশের সরকারি হাসপাতালগুলিতে অসাধু দালালের দৌরাত্ম্য নূতন কোনো সংবাদ নহে। গভীর উদ্বেগের সহিত আমরা লক্ষ করিয়া আসিতেছি, রোগী ভর্তি হইতে শুরু করিয়া ঔষধ ক্রয় এবং বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করাইতে গিয়া দালালের ফাঁদে পড়িয়া নাকাল হন রোগী ও তাহার স্বজনেরা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ন্যায় জায়গা হইতেই রোগীদের টার্গেট করিয়া থাকে দালালেরা। রোগীর পিছু লইতে লইতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওয়ার্ড পর্যন্ত ধাওয়া করে এই দালাল শ্রেণি। অন্য হাসপাতালে সস্তায় ভালো চিকিত্সাসেবা প্রদান করা হইবে—এই ধরনের নানা ফাঁকা বুলি ও মিথ্যা আশ্বাসে সরকারি হাসপাতাল হইতে হরহামেশা রোগী ভাগাইয়া লইয়া যায়। ন্যায্যমূল্যে ঔষধ ক্রয় করিয়া দেওয়ার কথা বলিয়া রোগীর স্বজনদের নিকট হইতে হাতাইয়া নেয় নির্ধারিত মূল্যের চাইতে চার-পাঁচ গুণ বেশি টাকা। এইভাবে দালালের কবলে পড়িয়া নিঃস্ব, এমনকি মৃত্যুবরণ করেন অনেকে, যাহা নিতান্ত অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত। বিষয়টি কতটা গুরুতর, তাহা কেবল ভুক্তভোগীই অনুধাবন করিতে পারিবেন। অভিযোগ রহিয়াছে, একশ্রেণির চিকিত্সক-নার্স এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীও এই অপতত্পরতার সঙ্গে জড়িত থাকেন। ইহার ফলে একদিকে রোগী ও তাহাদের স্বজনেরা হয়রানির শিকার ও সর্বস্বান্ত হইতেছেন, একই সঙ্গে ভুল চিকিত্সার কারণে তাহাদের অপূরণীয় ক্ষতি হইয়া যাইতেছে। দেশের প্রায় প্রতিটি সরকারি হাসপাতালেই এইরূপ চিত্র বিরাজমান।
এমন একটি প্রেক্ষাপটে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নবনিযুক্ত পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান হাসপাতাল হইতে দালাল নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়াছেন। দালাল হটাইতে দৃঢ়চিত্ত অবস্থানের জন্য তাহাকে ধন্যবাদ জানাইতেই হয়। তিনি প্রশংসা পাইবার যোগ্য এই কারণে যে, ঢামেকের ন্যায় একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে দালালমুক্ত করিবার শপথ লইয়াছেন তিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হইতে ঢামেকে চিকিত্সাসেবা লইতে আসা রোগী ও তাহাদের স্বজনদের প্রতিনিয়ত যেইভাবে দালালের খপ্পরে পড়িয়া নাস্তানাবুদ ও ক্ষতিগ্রস্ত হইবার খবর পাওয়া যায়, সেই প্রেক্ষাপটে এই ধরনের উদ্যোগ সময়ের দাবিও বটে।
‘দালাল’ শব্দটি শ্রুতিকটু হইলেও ইহার সোজাসাপটা অর্থ হইল ‘সহযোগী’। ইহা কোনো সুপ্রতিষ্ঠিত পেশা হিসাবে স্বীকৃত নহে যদিও, তথাপি মধ্যস্থতা বা সহযোগিতার প্রশ্নে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দালালির প্রয়োজন পড়িয়া থাকে। তবে প্রতারণার আশ্রয় লইয়া মানুষকে সর্বস্বান্ত করিবার কাজে যেই দালালিপনার কথা আমরা শুনিতে পাই, তাহা সর্বদাই পরিত্যাজ্য।
হাসপাতালগুলি রাতারাতি দালালমুক্ত হইবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবিক অর্থে দিবাস্বপ্ন। তবে দালালদের কবল হইতে হাসাপাতাল কিংবা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে আদৌ মুক্ত করা সম্ভব নহে, এমন যুক্তিও সঠিক নহে। এই ক্ষেত্রে পাসপোর্ট অফিসে দালালের দৌরাত্ম্য কমিয়া আসার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচেনায় লইতে পারি। একটা সময় ছিল, যখন পাসপোর্ট অফিসের নাম শুনিলেই দালালের দৌরাত্ম্যপনার চিত্র চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিত। সেই অবস্থা রাতারাতি পালটাইয়া গিয়াছে, এমন নহে। তবে পাসপোর্ট অফিস বর্তমানে অনেকটাই দালালমুক্ত। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনায় এই প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে দালালমুক্ত হইয়া উঠিতেছে। একইভাবে দালালের প্রাদুর্ভাবে ভুগিতে থাকা সরকারি হাসপাতালগুলিকে দালালমুক্ত করা কঠিন হইলেও অসম্ভব নহে।
মনে রাখিতে হইবে, ঢামেক দেশের সবচাইতে বড় সরকারি হাসপাতাল। হাসপাতালটি রোগীদের আস্থার প্রতীক, বিশেষ করিয়া অসহায় দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের জন্য। দূরদূরান্ত হইতে এই হাসপাতালে চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করিতে আসেন রোগীরা। সেই ক্ষেত্রে দালালের খপ্পরে পড়িয়া রোগীদের যাতে ভোগান্তি না বাড়ে, চিকিত্সায় যেন কোনো অনিয়ম না হয়, সেজন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দালালদের থামাইতে হইবে। কেবল ঢামেক নহে, প্রতিটি হাসপাতালে দালাল প্রবেশ নির্মূলের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক। দালালদের কঠোরভাবে প্রতিরোধ করিবার জন্য নিয়মিত অভিযান আরো বাড়ানো দরকার বলিয়াও আমরা মনে করি। পাশাপাশি সেবাগ্রহীতাদেরও অধিক সচেতন হওয়া জরুরি।