আমেরিকায় সাইবার জগতের সুরক্ষায়

এথিক্যাল হ্যাকার নাবিল

‘হ্যাকিং’ বললেই যে কেউ ভাবেন, ফেসবুকের পাসওয়ার্ড চুরি হয়েছে অথবা একজনের অ্যাকাউন্টে অন্য কেউ প্রবেশ করে তাঁর বিভিন্ন তথ্য দখলে নিয়েছে। হ্যাকিং বিষয়ক যেসব উদাহরণ মাথায় আসে, তার প্রতিটিই নেতিবাচক। অর্থাত্, হ্যাকিং মানে যেন একপ্রকার হাইজ্যাকিং! অথচ, হ্যাকিং মানে শুধুই নেতিবাচক কাজ নয়। হ্যাকিং দু ধরনের হয়। এতক্ষণ যেসব উদাহরণের কথা বলা হচ্ছিল, তা হলো ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকিং। ঠিক এর বিপরীত দিকটিই হলো হোয়াইট হ্যাট হ্যাকিং। এই হ্যাকাররা উল্টো সাইবার জগতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করেন। নেটওয়ার্কিং সিস্টেমের বিভিন্ন ত্রুটি খুঁজে বের করে তা সমাধানের জন্য কাজ করেন তাঁরা। এমনই একজন হোয়াইট হ্যাট হ্যাকার বা এথিক্যাল হ্যাকার হলেন নাবিল হান্নান।

বাংলাদেশের এই তরুণ কাজ করছেন বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিনোপসিসে। নামকরা ১৮টি ব্যাংকের আইটি ও সিস্টেমের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন তিনি। এছাড়াও জড়িত আছেন বেশকিছু বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।

নাবিল হান্নানের বাবা মো. আব্দুল হান্নান একজন অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত এবং মা ড. সেলিনা আফরোজা সাবেক সচিব। সার্জিল নামে ছোটভাইও আছে পরিবারে। তাঁদের বাবা-মা কূটনীতিবিদ হিসেবে বিভিন্ন দেশে কর্মরত ছিলেন। বাবা-মায়ের চাকরির সুবাদে বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন নাবিলও। ঢাকার আজিমপুরের লিটল অ্যাঞ্জেলস স্কুল থেকে শুরু করে বারো বছর বয়স পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের ১২টি স্কুলে পড়েছেন। নাবিলের বয়স যখন ৭, তখন তাঁর বাবা-মা রাশিয়ার মস্কোতে কর্মরত। সেখানে বন্ধুবান্ধব না থাকায় ছোট নাবিল একাই থাকতেন। সময় কাটানোর জন্য নাবিলকে কম্পিউটার কিনে দেওয়া হয়েছিল। তবে ছেলে যেন বাংলা শেখে, সে ব্যাপারেও তাঁদের জোর ছিল। আশপাশে যেসব প্রবাসী বাংলাদেশি থাকতেন, তাঁদের একজন ছিলেন কম্পিউটার প্রকৌশলের ছাত্র। ওই ছাত্র বাসায় আসতেন নাবিলের সঙ্গে কথা বলতেই। ওই ছাত্রের কাছ থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের একটি বই পান নাবিল। সেসময় মাত্র ৭ বছর বয়সেই প্রোগ্রামিং শিখতে শুরু করেন। কিন্তু, যন্ত্রটা আসলে চলে কিভাবে, তা জানার আগ্রহ থেকে স্কু-ড্রাইভার দিয়ে খুলে পুরো কম্পিউটারটার দফারফা করে ফেলেন। বাবা-মা অনেক বকলেন। কম্পিউটার যন্ত্রটা অনেক বিলাসিতার ব্যাপার ছিল সেসময়। আর কেউ ঘরে বসে প্রোগ্রামিং করবে, তেমনটাও প্রচলন হয়নি। বাবা-মায়ের বকা খেয়ে কিছুটা দমে গেলেও পরে টুকটাক কাজ করতে করতে আবারও ১০ বছর বয়সে প্রোগ্রামিংয়ে মনোযোগ দেন নাবিল।

নাবিলের বাবা-মায়ের ভারতে বদলি হওয়ার পর সেখানে বসেও তিনি প্রোগ্রামিংয়ের খুঁটিনাটি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। গেম খেলার সময় গেমের চিট খুঁজে তা ব্যাবহার করে বন্ধুদের তাক লাগিয়ে দিতেন। তবে তিনি জানতেন না যে,

এটাও একধরনের হ্যাকিং। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর দক্ষতা বাড়তে থাকে। পরে আবার বদলি হলে তাঁরা চলে যান কানাডা। ১৩ বছর বয়সে সেখানে হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে দক্ষতার কারণে নিজেই কম্পিউটার ক্লাস নিয়েছেন। স্কুলে ভর্তির পর কম্পিউটার সায়েন্সের কোর্স টিচার যা অ্যাসাইনমেন্ট দিতেন, তা অল্পসময়েই শেষ করে ফেলতেন তিনি। নিজের পুরো সিলেবাস শেষ করার পর তাঁকে বড় ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট দিলেও তিনি সেটা সহজে শেষ করে ফেলতেন। তার এই দক্ষতা দেখেই তাঁকে সহপাঠীদের ক্লাস নিতে বলা হয়। নাবিল নিজেও তখন প্রোগ্রামিংয়ে তাঁর ভালোবাসা অনুভব করছিলেন। ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটার নাড়াচাড়া করায় তাঁর যে দক্ষতা তৈরি হয়েছিল, সেটিই তাঁকে নতুন উদ্যমে কাজ করার প্রেরণা দেয়। আরো বেশি উত্সাহ নিয়ে কাজ করতে থাকেন তিনি। ২০০৩ সালে নাবিল হান্নান কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াটারলুতে কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হন। ২০০৭-এ পড়াশোনা শেষ করেন। হয়ে ওঠেন দক্ষ প্রোগ্রামার। সহপাঠীরা নিজেদের কাজের জন্য তাঁর কাছে সাহায্য নিতে যেতেন। তিনিও সাহায্য করতেন খুশি মনে। সেই নাবিলকে কখনোই পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের প্রোগ্রামিং দক্ষতা দিয়েই তিনি জায়গা করে নিয়েছেন নামকরা প্রতিষ্ঠানে।

তবে এই হ্যাকিং-প্রোগ্রামিংয়ের বাইরে নাবিলের আরেকটা গুণ আছে। ভালো গাইতে পারেন। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারেন। অনলাইনে সাউন্ডক্লাউডে তাঁর গাওয়া কিছু গানের ক্লিপ আছে। বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি, যখন যা গাইতে ইচ্ছা করে গিটার বাজিয়ে গেয়ে ফেলেন। গানেরও ভক্ত জুটেছে বেশ কয়েকজন। আর কাজের খাতিরে বিশ্বের নানাপ্রান্তে নানাজনের সঙ্গে পরিচয় তো হচ্ছেই। সবকিছুর ওপরে তিনি নিজের ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়টাকেই বড় করে দেখেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা লালন করেন। একজন বাংলাদেশি হিসেবে কর্মক্ষেত্রে নিজের সর্বোচ্চটা ঢেলে দিয়ে উজ্জ্বল করতে চান দেশের নাম।