ব্রাজিলে দোরিভালের সামনে যেসব পরীক্ষা

কোচ বদল হয়েছে ব্রাজিলের। সেলেসাওদের দায়িত্বে এখন দোরিভাল জুনিয়র। ব্রাজিলিয়ান ক্লাব সাও পাওলো ছেড়ে জাতীয় দলের চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন তিনি। সেই চ্যালেঞ্জটা যেমন সম্মানের, তেমনি কঠিন। দোরিভাল উতরাতে পারবেন এই পরীক্ষায়?

২০০২ সালে সবশেষ বিশ্বকাপ জিতেছে ব্রাজিল। ফুটবলের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টের পরবর্তী আসর ২০২৬ সালে। সেই হিসাব আমলে নিলে ২৪ বছর ধরে বিশ্বকাপহীন লাতিন আমেরিকার দেশটি। এর আগেও ২৪ বছর শিরোপা খরায় ছিল সেলেসাওরা। ১৯৭০ সালের পর ১৯৯৪ সালে জিতেছিল আরেকটি বিশ্বকাপ। দোরিভালের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এটাই- বিশ্বকাপ জয়।

২০০২ বিশ্বকাপ জয়ের পর উচ্ছ্বাস করছে ব্রাজিল দল। ছবি: গোলডটকম

২৪ বছর পর ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতাতে পারবেন কিনা, সেটা সময়ই বলে দিবে। তার আগের চ্যালেঞ্জগুলোও কম কঠিন নয়। কোচিং ক্যারিয়ারে আছেন ২২ বছর। লম্বা এই সময়ে কখনো জাতীয় দলে কোচের দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা হয়নি। ক্লাব ফুটবল থেকে এসে জাতীয় দলে সফল হতে পারবেন কিনা, সেই প্রশ্ন তো থাকছেই।

ব্রাজিলের কোচের চেয়ার সবসময়ই ‘হট’। এখানেও প্রত্যাশার পারদ সবসময়ই থাকে চড়া। বিশ্বকাপ জেতা ছাড়া দ্বিতীয় ভাবনা থাকে না সমর্থকদের। এমন একটা দায়িত্ব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চাপে থাকার কথা দোরিভালের। তাও আবার এমন সময় দায়িত্বে বসছেন, যখন কিনা ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) দেশি বাদ দিয়ে বিদেশি কোচের পিছে ছুটছিল।

রিয়াল মাদ্রিদের কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে কোচ করার পরিকল্পনা ছিল ব্রাজিলের। এমনকি তারা ঘোষণাও দিয়েছিল, রিয়ালের চলতি মৌসুম শেষেই সেলেসাওদের দায়িত্বে আসছেন ইতালিয়ান কোচ। কিন্তু প্রত্যাশা সঙ্গে বাস্তবতা মেলেনি। রিয়ালের সঙ্গে আনচেলত্তি চুক্তি নবায়ন করলে সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের কর্তাব্যক্তিদের তখন মাথায় হাত!

রিয়াল মাদ্রিদের কোচ কার্লো আনচেলত্তি।

গত বিশ্বকাপের পর ব্যর্থতায় দায় নিয়ে সরে দাঁড়ান কোচ তিতে। তার উত্তরসূরি হিসেবে অনেকের নামই শোনা গিয়েছিল। তবে ইতিহাস পাল্টে সিবিএফ খুঁজতে থাকে বিদেশি কোচ। ১৯৬৫ সালের পর আবারও বিদেশি কোচ আনতে উঠেপড়ে লাগে তারা। আস্থা হারায় দেশি কোচে।

ওই দৃশ্যপটেই ঢুকে পড়েন আনচেলত্তি। ইতালিয়ান কোচের অপেক্ষায় থেকে অন্তর্বর্তী কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফের্নান্দো দিনিজকে। কিন্তু যখন নিশ্চিত হয়ে যায় আনচেলত্তি আসছেন না, তখন দিনিজকে সরিয়ে স্থায়ী চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলো দোরিভালকে।

ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক কোচ তিতে। ছবি: গোলডটকম

তাহলে দোরিভালের অবস্থাটা বুঝুন। আনচেলত্তি কিংবা বিদেশি কোচে আস্থা রাখা ব্রাজিল তাকে দায়িত্ব দেওয়ায় প্রত্যাশার চাপ কতটা বেড়েছে। এই চ্যালেঞ্জটা জয় করার ব্যাপারও তো থাকছে দোরিভালের ওপর!

এবার মাঠে দিকে তাকানো যাক। সামনের এক বছরে অন্তত ১২টি ম্যাচ খেলবে ব্রাজিল। যার মধ্যে ইউরোপিয়ান বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ, কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচ রয়েছে। দোরিভালের হলুদ জার্সির দায়িত্ব শুরু হচ্ছে মার্চের প্রীতি ম্যাচ দিয়ে। ওয়েম্বলিতে প্রতিপক্ষ স্বাগতিক ইংল্যান্ড, আর সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে প্রতিপক্ষ স্পেন। ইংল্যান্ড ও স্পেন সময়ের অন্যতম সেরা দল, তাদের বিপক্ষে লড়াইয়ে কঠিন পরীক্ষার আঁচ নিশ্চয়ই পাচ্ছেন দোরিভাল!

ব্রাজিলের ডাগ আউটে ৬১ বছর বয়সী কোচের অভিষেক কেমন হবে? তার মতো স্থায়ী হয়ে আগের ৯ কোচের হিসাবের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে অভিজ্ঞতাটা মিশ্র। আগের ৯ কোচের অভিষেকের চিত্রটা এমন- ৪ জয়, তিন ড্র ও দুই হার। যার মধ্যে সবচেয়ে বড় মুখ লুইস ফেলিপে স্কলারি। ২০০১ সালে অভিষেক ম্যাচে ১-০ গোলে হেরেছিলেন উরুগুয়ের বিপক্ষে। অথচ এক বছর পর তার হাত ধরেই ব্রাজিল জেতে পঞ্চম বিশ্বকাপ। অর্থাৎ, অভিষেকের পারফরম্যান্স দিয়ে কোচের গুণমান বিচার করা কঠিন।

গত বছরের এপ্রিলে সাও পাওলোর ডাগআউটে থাকাকালীন দোরিভাল। ছবি: বিবিসি

যদিও দোরিভালের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। কারণ তিনি ব্রাজিলের চাকরিটা পেয়েছেন ‘দুর্ঘটনাক্রমে’। আনচেলত্তি কিংবা অন্য কোচের নামই উচ্চারিত হয়েছে বেশি। সেখানে দোরিভালের নাম ছিল না কোথাও। ফলে অভিষেকেই অনেক কিছুর উত্তর দিতে পারবেন এই কোচ। ব্রাজিলে তিনি প্রসিদ্ধ হলেও ফুটবল দুনিয়ায় পরিচিতি সামান্যই। অভিষেকে আলো ছড়িয়ে নিজের জানান নিশ্চয় দিতে চাইছেন এই কোচ।
প্রীতি ম্যাচ দিয়ে অভিষেকের পর দোরিভালের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ কোপা আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রে হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টেই আপাতত সব নজর ব্রাজিলিয়ানদের। এখানে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারলেই হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপের ডাগ আউটে থাকার সম্ভাবনা থাকবে দোরিভালের। ব্রাজিলের সবশেষ সাত কোচের মধ্যে কার্লোস দুঙ্গাই কেবল বরখাস্ত হয়েছিলেন কোপা আমেরিকার পারফরম্যান্সে। ২০১৬ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে ব্রাজিল বিদায় নিলে চাকরি হারান দুঙ্গা। দোরিভাল নিশ্চয় ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের মতো অবস্থায় পড়তে চাইবেন না!

২০২২ বিশ্বকাপে ব্রাজিল ফুটবল দল।

কোপা আমেরিকায় উতরে গেলে দোরিভালের পরবর্তী মিশন ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাই। আগামী সেপ্টেম্বরে ইকুয়েডর ও প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হবে সেলেসাওরা। বিশ্বকাপ বাছাইয়েও থাকবে কঠিন পরীক্ষা। অন্তর্বর্তী কোচের অধীনে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সুবিধাজনক জায়গায় নেই ব্রাজিল। পয়েন্ট টেবিলে তাদের অবস্থান ৬ নম্বরে। এই জায়গা থেকে সেলেসাওদের টেনে তোলার চ্যালেঞ্জও দোরিভালের সামনে।
কঠিন পথে এত এত চ্যালেঞ্জ, উতরাতে পারবেন দোরিভাল?