এ কথা সত্য যে, ১৫ বছরের শাসনামলে আওয়ামী লীগ সরকার রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনতে পারেনি। শুধু পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভর থাকলে যে কোনো সময় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ডলার-সংকট চলছে প্রকটভাবে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে ডলার-সংকট চলতে থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেমে যাবে। এ সংকট কখন নিরসন হবে, জানি না। খোলা বাজারে ডলারের দাম বেশি হওয়ায় বৈধপথে রেমিট্যান্স আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। মুদ্রার বিনিময়হার নির্দিষ্ট করে না দিলে চ্যালেঞ্জ আরো বাড়বে
জানুয়ারি মাসের ৭ তারিখে অনুষ্ঠিত হলো দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আবারও টানা চতুর্থ বারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রথমে সরকার গঠন করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সাধারণ নির্বাচনে। এরপর ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। বলা দরকার যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকারের আমলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। জাতিসংঘের সুপারিশক্রমে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করবে। সাক্ষরতার হার বেড়েছে এবং কমেছে শিশু ও প্রসূতিমৃত্যুর হার। এ অর্জনের পেছনে রয়েছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের অগ্রগতি।
২০০৬ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ। উল্লিখিত সময়ের মধ্যে মাথাপিছু আয় (নমিনাল) বেড়েছে ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে ২ হাজার ৭৯৩ মার্কিন ডলার। মাথাপিছু আয় (পিপিপি) বেড়েছে ১ হাজার ৭২৪ মার্কিন ডলার থেকে ৮ হাজার ৭৭৯ মার্কিন ডলার। জিডিপির আকার বেড়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৭২ কোটি টাকা থেকে ৫০ লাখ কোটি টাকা। জাতীয় বাজেটের আকার বেড়েছে ৬১ হাজার কোটি টাকা থেকে ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ২০০৬ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বেড়েছে ১৩ গুণ। বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এ সময়ের ব্যবধানে কয়েক গুণ বেড়েছে।
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করে। মূলত ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার, স্মার্ট অর্থনীতি ও স্মার্ট সমাজ—এই চারটি স্তম্ভের সমন্বয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করে। এবারে ১১টি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে দ্বাদশ নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়াও দুর্নীতিবাজদের অর্থসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি, প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় এসেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতেহারে। এছাড়াও, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাগুলোর ধারাবাহিকতা এই ইশতেহারে রক্ষিত হয়েছে।
আমার মতে, ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত স্মার্ট সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য এই নির্বাচনি ইশতেহারটি যথোপযুক্ত নয়। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে একটা বুদ্ধিগম্য ইশতেহার প্রয়োজন ছিল। এ ধরনের অসম্পূর্ণ ইশতেহার দিয়ে উন্নত স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব। চলমান অর্থনৈতিক সংকট দূর করার জন্য ইশতেহারে অনেক কিছু সংযোজনের প্রয়োজন ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সামনে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সরকারের নির্দেশে পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা হয়। পরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা কমিশন পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের শাসনামলে অর্থনীতির আকার ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এর পেছনে অবদান ছিল পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার। তেমনিভাবে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে চলমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা।
বর্তমানে যে কয়টা দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের নাম উঠে আসে। অচিরেই মূল্যস্ফীতি কমবে না। সরকারের নেওয়া নীতি কাজ করছে না। ২০২৩-এর অক্টোবর মাসে খাদ্যমূল্যস্ফীতি রেকর্ড করা হয় ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর ২০ পর্যন্ত স্থানীয় রসুনের দাম বেড়েছে ৪০০ শতাংশ এবং পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ২৮২ শতাংশ। সরকারি সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি পরিবারকে মাসিক ৩২ হাজার ৪২২ টাকা আয়ের বিপরীতে খরচ করতে হয় ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। বহুল আলোচিত শ্রীলঙ্কা মূল্যস্ফীতি কমাতে সফল হলেও বাংলাদেশ সফল হতে পারেনি। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দিনে দিনে ক্ষয় হচ্ছে। বৈদেশিক ঋণ পেলে রিজার্ভ বেড়ে যাচ্ছে। এটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) যখন ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ মঞ্জুর করে, তখন অন্যতম শর্ত ছিল ২০২৩ এর ডিসেম্বরে রিজার্ভ থাকতে হবে ২৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার। এ শর্ত পরে শিথিল করে ১৭ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ রাখতে বলে। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত এ শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়। ২০২৩ রাজস্ব বছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত রেকর্ড করা হয় ৮ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের টার্গেট ছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। রাজস্ব আয়ের দিক দিয়ে বাংলাদেশ আইএমএফের দেওয়া টার্গেট অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। গত বছরে জিডিপির ০ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব বাড়ানোর টার্গেট দিয়েছিল আইএমএফ। বাংলাদেশে এখন বহুল আলোচিত বিষয় হলো—ব্যাংকিং খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক, ২০০৯ সালে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৫৬ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মোট বিতরণকৃত ঋণের সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি গ্রহণযোগ্য। এই মুহূর্তে খেলাপি ঋণের অনুপাত ১০ শতাংশের কাছাকাছি। এশিয়াতে (২৭ দেশে) গড় খেলাপি ঋণ ৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। বিগত দেড় দশক ধরে বেড়েছে অনৈতিকভাবে ঋণ দেওয়া এবং নেওয়ার অপসংস্কৃতি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ সংস্কৃতি বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সম্প্রতি দেওয়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তথ্যমতে, ২৪ ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে ২০০৮ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে, যা ২০২৩ রাজস্ব বছরে জিডিপির ২ শতাংশ এবং ২০২৪ রাজস্ব বছরে জাতীয় বাজেটের ১২ শতাংশ। এ কথা সত্য যে, ১৫ বছরের শাসনামলে আওয়ামী লীগ সরকার রপ্তানি পন্যে বৈচিত্র্য আনতে পারেনি। শুধু পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভর থাকলে যে কোনো সময় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ডলার-সংকট চলছে প্রকটভাবে। আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে ডলার-সংকট চলতে থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেমে যাবে। এ সংকট কখন নিরসন হবে জানি না। খোলা বাজারে ডলারের দাম বেশি হওয়ায় বৈধপথে রেমিট্যান্স আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। মুদ্রার বিনিময় হার নির্দিষ্ট করে না দিলে চ্যালেঞ্জ আরো বাড়বে। মাথাপিছু জিডিপির দিক দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে। চার বছর আগে ভারত থেকে এবং আট বছর আগে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে গেছে। কিন্তু দুঃখজনক যে, বাংলাদেশে আয়-বৈষম্য বেড়ে চলেছে।
হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে ২০২২ অনুযায়ী, গিনি সহগ (বৈষম্য পরিমাপক)-এর মান রেকর্ড করা হয়েছে ০ দশমিক ৪৯৯, যা প্রকাশ করে উচ্চমাত্রার আয়-বৈষম্য। দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে কমে এলেও আয়-বৈষম্য না কমাতে পারলে অর্থনীতিতে কল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে না। আয় বৈষম্য না কমাতে পারলে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ১১ শতাংশে নামানো সম্ভব নয়। কারণ, আয়-বৈষম্য বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। বিগত এক দশক ধরে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার বেড়ে চলেছে। পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে দেশের বৃহত্ স্বার্থে। স্মার্ট অর্থনীতি এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমার সুপারিশ হলো—পুরোনো আমলের মুদ্রানীতি অনুসরণ না করা, রাজস্ব নীতিকে যুগোপযোগী করা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিজ্ঞা করা, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করা, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বৃদ্ধি করা, পুঁজি পাচার বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়া, পাচার হওয়া টাকা দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা, প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, আয়-বৈষম্য কমানোর পরিকল্পনা করা, ভ্যাট আইন প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প করা, করজাল বাড়ানোর পরিকল্পনা করা ও পরোক্ষ করের চেয়ে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর পরিকল্পনা করা। এছাড়া অর্থঋণ আদালতে ঝুলে থাকা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা, অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বাড়ানো, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার জন্য পরিকল্পনা করা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করা, উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, বিচারব্যবস্থাকে স্বাধীন রাখা, ভূরাজনীতির বিষয়ে সবার সঙ্গে সুষম সম্পর্ক বজায় রাখা, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী নিয়োগের জন্য নীতিমালা করা ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহণও জরুরি। আমার সুপারিশগুলো নতুন সরকার বিবেচনা করলে আশা করা যায়, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত এবং স্মার্ট দেশে উন্নীত হবে।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক