ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে তারল্যসংকট প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। তবে এটা কোনো তাত্ক্ষণিক ঘটনা নয়। ব্যাংকিং সেক্টরের বর্তমান তারল্যসংকটের একটি পটভূমি আছে। বর্তমানে অধিকাংশ ব্যাংকই সাধারণ তারল্যসংকটে ভুগছে। এর মধ্যে সাত-আটটি ব্যাংক তীব্র তারল্যসংকট মোকাবিলা করছে। কয়েকটি ব্যাংক আছে, যারা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া প্রচলিত ধারার কয়েকটি ব্যাংকও এই তীব্র তারল্যসংকটের সম্মুখীন। এই ব্যাংকগুলোর বেশির ভাগই অনেক দিন ধরে তারল্যসংকটে রয়েছে। তাদের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব রয়েছে। সাধারণভাবে এসব ব্যাংকের প্রতি সাধারণ গ্রাহকদের আস্থার অভাবও রয়েছে। বিগত দুই-তিন বছর ধরে আস্তে আস্তে এই ব্যাংকগুলোর তারল্যসংকট ঘনীভূত হয়েছে। এত দিন এটা খুব একটা উপলব্ধি করা যায়নি। তবে বর্তমান পর্যায়ে এসে তা তীব্র হয়েছে। যেসব ব্যাংক তারল্যসংকটে পড়েছে, তাদের পরিচালনা বোর্ড মাঝে মাঝেই এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ব্যাংক ব্যবসার জন্য সুখকর ছিল না। ফলে এসব ব্যাংক একপর্যায়ে দুর্বল ব্যাংকে পরিণত হয়। বর্তমানে এসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে স্পেশাল প্রভিশনিংয়ের মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ করে তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে অথবা আমানতকারীদের চাহিদা মেটাচ্ছে।
এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে নানা কারণে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অদক্ষ পরিচালনা পর্ষদের বিভিন্ন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণেও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এসব ব্যাংকের আমানত থেকে যে ঋণ দেওয়া হয়েছে, তার একটি বড় অংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এসব ঋণের অর্থ ভবিষ্যতে আদায় করা সম্ভব হবে কি না, তা-ও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে নতুন আমানতও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আহরণ করতে পারছে না এসব ব্যাংক। ফলে সংকট ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। ব্যাংকগুলো বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাপোর্টে এগুলো টিকে আছে। স্বাভাবিকভাবেই আমানতকারীরা এসব ব্যাংক এড়িয়ে চলছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব ব্যাংকে সংরক্ষিত তাদের আমানত তুলেও নিয়েছে।
এই অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে এভাবে চলতে দিয়ে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে ফেলা হচ্ছে। অনেক আগে ওরিয়েন্টাল ব্যাংক সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পরে এই ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে এখনো কোনোভাবে টিকে আছে বটে, কিন্তু একে তো সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ব্যাংক বলা যাবে না। অর্থাত্ কৃত্রিমভাবে ব্যাংকটিকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যাংককে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার যুক্তি থাকতে পারে না। ব্যাংক তার নিজস্ব শক্তিবলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে, এটাই কাম্য। বিশেষ করে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যাংক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ নেই। বর্তমানে যেসব ব্যাংক তারল্যসংকটে ভুগছে, তাদের দুর্বলতাগুলো যদি শক্ত হাতে দূর না করা যায়, তাহলে এদের ব্যাপারে বিকল্প ভাবতে হবে। জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকিং সেক্টরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো নিজেরাই যদি ভালোভাবে না চলে, তাহলে সেই ভূমিকা তারা কীকভাবে পালন করবে? জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকিং খাতকে সামগ্রিকভাবে যেমন ভূমিকা পালন করতে হবে, তেমনি প্রতিটি ব্যাংককে স্বতন্ত্রভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, আমানতের ওপর সর্বোচ্চ সুদ হার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের বেলায় ৬ শতাংশ নির্ধারণ করে দেওয়ার বিষয়টি বর্তমান তারল্যসংকটের জন্য কোনোভাবে দায়ী কি না! আমার কাছে বর্তমান তারল্যসংকটের জন্য আমানতের ওপর সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণ করে দেওয়াটা তেমন একটা দায়ী বলে মনে হয় না। আর এখন তো আমানতের সুদের ওপর আরোপিত ক্যাপ তুলে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলো এখন চাইলেই বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করতে পারছে। কোনো কোনো ব্যাংক ৮-৯ শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। আমানতের ওপর আরোপিত সুদের হার এবং ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাজারভিত্তিক হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। যেহেতু একসময় আমানতের ওপর প্রদেয় সুদের হার এবং ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হারের ওপর ক্যাপ করা ছিল, তাই এটাকে বাজারভিত্তিক করতে হলে কিছুটা ধীরগতিতে আমাদের এগোতে হবে। তাহলে ব্যাংকিং সেক্টরের ওপর কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ সৃষ্টি হবে না। অন্যথায় যে চাপ সৃষ্টি হবে, তা অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। যে কোনো অ্যাডজাস্টমেন্ট ধীরে করা হলে তা অর্থনীতির জন্য সহনীয় হয়। তবে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা চলতে দিতে হবে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আমাদের সুদ নির্ধারণের বিষয়টি বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।
ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার ছিল ৯ শতাংশ। সেখান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসা হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১১.৯৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি আগেই বলেছি, ব্যাংক ঋণের সুদের হার ও আমানতের ওপর প্রদেয় সুদের হার বৃদ্ধির এই প্রবণতা অব্যাহত রাখতে হবে এবং একসময় তা বাজারভিত্তিক করতে হবে। বর্তমানে অর্থনীতি এবং আর্থিক খাতের যে অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে, তাতে এই কাজগুলো ধীরগতিতেই করতে হবে।
অনেকেই বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। কিন্তু এভাবে বিষয়টিকে আমি দেখতে চাই না। মনে করি, ব্যাংকের সংখ্যা বড় কথা নয়। ব্যাংক কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে, সেটাই বড় বিষয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যাংকের সংখ্যা আমাদের দেশের তুলনায় অনেক কম। ভারতের অর্থনীতি আমাদের তুলনায় অনেক গুণ বড়। জনসংখ্যাও আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। ব্যাংকের সংখ্যা বড় কথা নয়। বিদ্যমান ব্যাংকগুলো মানুষের চাহিদা কতটা মেটাতে পারছে, কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যাংকগুলো পরিচালিত হচ্ছে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি ঠিকই, কিন্তু এর আর্থিক গভীরতা অনেক কম। এখনো দেশে মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই ব্যাংকিং কার্যক্রমের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। মানুষ যত বেশি হারে ব্যাংকিং কার্যক্রমের আওতায় আসতে পারবে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নও তত ত্বরান্বিত হবে। তবে একটি বিষয় সব সময় লক্ষ রাখতে হবে, যে ব্যাংকগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তারা যেন ভালোভাবে তাদের ব্যাবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। কোনো ব্যাংককে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে শক্ত যুক্তি প্রদান করা কঠিন। আমাদের এখানে একটি প্রবণতা হচ্ছে, যেসব ব্যাংক দুর্বল হয়ে যায়, তাদের নানাভাবে সাপোর্ট দিয়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। আপনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টি দিলে কী দেখতে পান? কিছুদিন আগেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চারটি ব্যাংক প্রায় একই সময়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে। এর আগেও বেশ কয়েকটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে উদ্ধারে তেমন কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ব্যাংকগুলোতে তাদের নিজস্ব শক্তির ওপর নির্ভর করেই টিকে থাকতে হয়। আমাদের এখানেও ব্যাংকগুলোকে তাদের নিজস্ব শক্তিবলেই চলতে দেয়া উচিত।
সমস্যাগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা অনুসরণ করা যেতে পারে। কারণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো অনেক ধরনের সামাজিক দায়িত্ব পালন করে থাকে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে আমরা ভেবে দেখতে পারি, সবগুলো ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রাখার প্রয়োজন আছে কি না। দুটি বা তিনটি ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রেখে অবশিষ্ট ব্যাংকগুলো ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তর করা যেতে পারে। আর যদি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে বর্তমান অবস্থায় রাখতে হয়, তাহলে এদের পরিচালনব্যবস্থা আরো দক্ষ করতে হবে। বিশেষ করে পরিচালনা বোর্ডে এমন সব ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে হবে, যারা ব্যাংক ও আর্থিক খাত সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন এবং যাদের সততা প্রশ্নাতীত, তাদেরই পরিচালনা বোর্ডে নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়া যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হবে, সেগুলো যাতে অর্জিত হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আর ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা আরো জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময় দিয়ে এই সময়ের মধ্যে অবস্থা ভালো করার নির্দেশ দিতে হবে। এটা যদি করতে না পারে, তাহলে এসব ব্যাংককে কোনো ভালো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা যেতে পারে। অথবা এসব ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন অথবা বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে এভাবে বছরের পর বছর চলতে দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। আমাদের আর্থিক খাতের অবস্থা বিবেচনা করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। ব্যাংকিং খাতকে একটি শক্তিশালী আর্থিক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ব্যাংকের সংখ্যা ৬০টি না ৭০টি, সেটা বড় কথা নয়। কথা হচ্ছে, ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না।
লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ; নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ও সাবেক মহাপরিচালক, বিআইডিএস
অনুলিখন: এম এ খালেক