শৃঙ্খলা: বাফুফে ও বাংলাদেশ

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের ম্যাচে শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) বৃহত্ অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করিয়াছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা—ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ফিফা)। গত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইয়ের তিনটি ম্যাচে শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনায় বাফুফেকে মোট ৩০ হাজার ২৫০ সুইস ফ্রাঁঁ—যাহা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৯ লক্ষ টাকা জরিমানা করে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি। যেই তিনটি ম্যাচে শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহার দুইটি ছিল ঢাকায়, একটি মালদ্বীপে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রথম ঘটনা ঘটে গত ১২ অক্টোবর। মালেতে অনুষ্ঠিত ঐ ম্যাচে মালদ্বীপের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করা বাংলাদেশ দলের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ তুলিয়া ফিফার ওয়েবসাইটে বলা হইয়াছে, ছয় খেলোয়াড় ব্যক্তিগতভাবে শৃঙ্খলা ভাঙিয়াছেন। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, এক জন বা দুই জন নহে, শৃঙ্খলা ভাঙিবার অভিযোগ উঠিয়াছে ছয় ছয় জন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে। ইহা কতটা গ্রহণযোগ্য হইতে পারে?

খেলায় যেমন হার-জিত থাকিবে, তেমনি থাকিতে পারে ভুলভ্রান্তি; কিন্তু একই ভুলের পুনরাবৃত্তি স্বভাবদোষে দুষ্ট বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। প্রথম বার শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঠিক পাঁচ দিন পর ১৭ অক্টোবরের আরেকটি ম্যাচে আবারও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করিয়া বসে বাংলাদেশ দল। ঢাকার মাঠে অনুষ্ঠিত ঐ ম্যাচে জয় লাভ করিয়া বিশ্বকাপ বাছাইয়ের মূল পর্বে জায়গা করিয়া লয় বাংলাদেশ। তবে দুঃখজনকভাবে ম্যাচে নিরাপত্তাবিধি ভাঙা, গ্যালারিতে বাজি-পটকা পুড়ানো এবং মাঠে দর্শকদের প্রবেশের কারণে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ফিফা আচরণবিধির ১৭ নম্বর ধারা ভঙ্গ করিবার অভিযোগ আনে ডিসিপ্লিনারি কমিটি।

পরপর দুই ম্যাচে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা বাংলাদেশ দল একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে ২১ নভেম্বর লেবাননের সহিত অনুষ্ঠিত তৃতীয় ম্যাচে। এইবারও ম্যাচে নিরাপত্তাবিধি ভাঙা, গ্যালারিতে বাজি-পটকা পুড়ানো এবং মাঠে দর্শকদের প্রবেশের দায়ে অভিযুক্ত হয় বাংলাদেশ, বাফুফেকে করা হয় জরিমানা। উল্লেখ্য, ১৭ অক্টোবরের ম্যাচের কারণে শাস্তির তালিকায় উঠিয়াছে মালদ্বীপের নামও। ফিফার আচরণ বিধিমালার প্রতি যথাযথ সম্মান না দেখানোর কারণে দেশটির ফুটবল ফেডারেশনকে সতর্ক করিয়া দিয়াছে ডিসিপ্লিনারি কমিটি। ফিফার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত শাস্তির তালিকায় বলা হইয়াছে, অননুমোদিত প্রবেশ ঘটিয়াছিল মালদ্বীপের ড্রেসিংরুমে।

বাংলাদেশ ফুটবল দলের এইভাবে পুনঃপুন শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা কোনোভাবেই সমীচীন হইতে পারে না। ফিফার যেই সকল নিয়মকানুন রহিয়াছে, তাহা কোনোক্রমেই লঙ্ঘন করা ঠিক নহে। বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি নিঃসন্দেহে খারাপ বার্তা। ইহাতে বাংলাদেশ ফুটবল দল এবং ইহার সহিত দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হইয়াছে, যাহা কেনোভাবেই কাম্য নহে। প্রথম বার শৃঙ্খলা ভঙ্গের পরই বাফুফের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল বলিয়া আমরা মনে করি।

আমরা সকল সময়ই বলিয়া থাকি, শৃঙ্খলাই উন্নতির মূল চাবিকাটি। যে কোনো ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সফলতা লাভের ক্ষেত্রে সকলের পূর্বে শৃঙ্খলার উপরে অধিক গুরুত্ব দিতে হইবে। শুধু খেলাধুলা নহে, ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতার দেখা পাইতে হইলে শৃঙ্খলাই প্রথম ও একমাত্র পূর্বশর্ত; কিন্তু জাতি হিসাবে দুঃখজনভাবে এইখানে আমাদের বড় ধরনের ঘাটতি রহিয়াছে। শৃঙ্খলাবিহীন জীবন কোনো অবস্থাতেই কল্যাণকর নহে। এই অর্থে সুশৃঙ্খল জীবনাচরণের দীক্ষা গ্রহণ আমাদের জন্য অপরিহার্য। সুশৃঙ্খল হইবার প্রথম শিক্ষা অবশ্যই আসিতে হইবে পরিবার হইতে। কারণ, পরিবার হইল ‘শাশ্বত বিদ্যালয় ও চিরন্তন মাতৃসদন’। ইহার পর দায়িত্ব রহিয়াছে সমাজের। সুষ্ঠু সমাজ শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের অন্যতম নিয়ামক। জাতিকে সুশৃঙ্খল করিয়া গড়িয়া তুলিবার প্রশ্নে ইহার পর আগাইয়া আসিতে হইবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে। আমরা যদি মহাবিশ্বের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহা হইলে দেখিতে পাইব, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল কিছুই নিয়মতান্ত্রিকভাবে গতিশীল। গ্রহনক্ষত্র হইতে শুরু করিয়া দিন, মাস, বত্সর তথা সময়, কাল—সকল কিছুই কঠোর নিয়ম ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়া আবর্তিত হইতেছে। সুতরাং আমাদেরকেও সকল ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়মকানুন তথা শৃঙ্খলার মধ্য দিয়া অগ্রসর হইতে হইবে।