দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদী ব্লক এবং উদারপন্থি ও কমিউনিস্টদের মধ্যে একধরনের আদর্শিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরূপ পটভূমিতে বেশ কিছু নিয়মকানুন, নীতিনির্দেশনা ও কর্মপদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে ‘একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা’ তৈরিতে মনোনিবেশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে কালক্রমে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ। গড়ে ওঠে এর বেশ কিছু বিশেষ অঙ্গ সংস্থাও। এরপর শুরু হয় নতুন মিশন। যেসব অঞ্চলে কোনো ইস্যু মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে, উদারপন্থি পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে, সেই সব এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তুলতে চেষ্টা করে নতুন নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা। এভাবে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা পায় নতুন কিছু সংস্থা ও সংগঠন। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছানুযায়ী তৈরি হয় নতুন আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি, তথা নব্য শাসনব্যবস্থা।
আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন সংগঠন কিংবা নিয়মনীতি তৈরি করেই বসে থাকেনি যুক্তরাষ্ট্র। গড়ে তোলা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অন্যান্য রাষ্ট্রের আস্থা তৈরির কাজে হাত দেয় মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। এতে কাজও হয় বেশ। একটা সময়ে এসে সংস্থাগুলোর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে শুরু করে বিভিন্ন রাষ্ট্র।
পশ্চিমা দেশগুলোর জাতীয় স্বার্থ এবং পশ্চিমা আধিপত্য সুসংহত করার জন্যই মূলত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং নতুন নতুন নিয়মনীতি গড়ে তোলা হয়েছিল, যার পেছনে আসল উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিস্ট ব্লকের সঙ্গে লড়াই করা। আর এ কাজে পুরো সমর্থন ছিল গোটা উদারপন্থি বিশ্বের। উদারনৈতিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের বক্তৃতা—এ দুয়ের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে কমিউনিস্ট ব্লককে রীতিমতো ধরাশায়ী করে ফেলে পশ্চিমা দেশগুলো। অর্থাত্, পশ্চিমা মিশন ফলপ্রসূ হতে শুরু করে। ফ্যাসিবাদ, উদারপন্থি ও কমিউনিস্টদের এই লড়াইয়ে পশ্চিমারা ১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ঘোষণা করে চূড়ান্ত বিজয়।
এর পরের ঘটনাগুলো বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর পশ্চিমা দেশগুলো চলতে শুরু করে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো। আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং নিয়মকানুনকে অনেকটা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলা শুরু করে। তাদের কাছে গুরুত্ব হারাতে থাকে অন্য মতাদর্শধারীরা। এভাবে বেশ কিছু সময় চলার পর আসে নাইন ইলেভেনের ঘটনা। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটলে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ওয়াশিংটন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থা, আন্তর্জাতিক আইন ও আন্তর্জাতিক শাসনকে চরমভাবে উপেক্ষা করতে শুরু করে আমেরিকা। বরং এর বিপরীতে ‘একতরফা নীতি’ অনুসরণ করার পথ ধরে চলতে শুরু করে।
এরপর কী ঘটে? পশ্চিমা দেশগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যত বেশি চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার মুখোমুখি হয়, আন্তর্জাতিক সংস্থার সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মনীতিকে তত বেশি উপেক্ষা করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত এমন একটি পর্যায় আসে, যখন পশ্চিমাদের হাতে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একপ্রকার মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে খোদ পশ্চিমা দেশগুলো থেকেই! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোর হাতে প্রতিষ্ঠিত সংস্থা পশ্চিমাদের যতটা না সেবা দেয়, তার চেয়ে ঢের বেশি সেবা দিতে থাকে অন্যান্য দেশকে। বাইরের দেশের স্বার্থকেই বড় করে দেখতে শুরু করে সংগঠনগুলো।
এর মধ্যে ঘটে মজার ঘটনা। উত্থান ঘটে অপশ্চিমা শক্তির। একই সঙ্গে বিশ্বে রাষ্ট্রের সংখ্যাও বাড়তে শুরু করে। এসবের ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যেও ঘটে নানা পরিবর্তন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে শক্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পাওয়ার)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের পাশাপাশি জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রভাব দেখাতে শুরু করে অন্যান্য শক্তি। খুব একটা সুবিধা করতে না পেরে বিভিন্ন সংস্থা থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নিতে শুরু করে ওয়াশিংটন। এ ধরনের দাবির সপক্ষে যুক্তি কী?
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থাগুলোর বিভিন্ন সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও কার্যকলাপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে নাখোশ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৯ সালের একেবারে প্রথম দিন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। মূলত বহু দিন ধরেই এ দুই দেশ ইউনেসকো ছাড়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে আসছিল। এর পেছনে কারণ, ২০১১ সালে ইউনেসকো ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্যপদ দেয়। এই সিদ্ধান্তে নাখোশ হয়ে সংস্থাটির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে ইসরাইল ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।
যাহোক, ক্ষমতার আন্তর্জাতিক ভারসাম্যে সাম্প্রতিক সময়ে একধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশ প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে শুরু করে। লঙ্ঘন করতে থাকে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো কোনো নীতি-নির্দেশনা। এভাবেই চলে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু অ-পশ্চিমা রাষ্ট্র পশ্চিমকে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নীতি মেনে চলার সবক দিতে শুরু করেছে!
অ-পশ্চিমা দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতে দেখে আসছি আমরা। ঠিক এমন একটি সময়ে শুরু হয় হামাসের সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধ। চলমান এই যুদ্ধে পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট ইসরাইলি বাহিনীকে গাজা জুড়ে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালাতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর আইন ও নিয়মকানুন একেবারেই পাত্তা পাচ্ছে না। আরো স্পষ্ট করে বললে, এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে তোয়াক্কা না করার চূড়ান্ত রূপ দেখা গেল।
উল্লেখ করা দরকার, পশ্চিমা দেশগুলো কেবল বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেই অবজ্ঞা করছে না, সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করছে যেন! এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো বিশ্বব্যবস্থাকে একধরনের বিশৃঙ্খল সময়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বললেও বাড়িয়ে বলা হবে না।
অস্বীকার করার উপায় নেই, পশ্চিমসহ বেশ কিছু আঞ্চলিক রাষ্ট্রের উসকানি ও মদতে ইসরাইল গাজা উপত্যকা জুড়ে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে। বোমা হামলার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের উন্নত প্রযুক্তিগত অস্ত্র ব্যবহার করে গাজাকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে তারা। নবজাতক শিশু, শিশু, নারী, বৃদ্ধ, ছাত্র, সাংবাদিকসহ তাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউই। হত্যার শিকারে পরিণত হচ্ছে হাজার হাজার নিরীহ বেসামরিক নাগরিক। অ্যাপার্টমেন্ট, হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, স্কুল, মসজিদ, গির্জা—কোনো কিছুই বাদ পড়ছে না তাদের লক্ষ্যবস্তু থেকে। অথচ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নির্বিকার! তাদের যেন কিছুই করার নেই। সত্যি বলতে, এসব সংস্থাকে আগে কখনোই এতটা দুর্বল ও অকার্যকর বলে মনে হয়নি। জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল আন্তোনিও গুতেরেসের মতো উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাও গাজার গণহত্যায় হস্তক্ষেপ করার প্রশ্নে কার্যত অক্ষম—ভাবা যায়! একটি বিষয় না বললে নয়, ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো দমন-পীড়ন ও গণহত্যার চিত্র অনলাইন কিংবা লাইভ সম্প্রচার আটকানোর ক্ষমতা নেই কারও। তা না হলে এত কিছু হয়তো সামনেই আসত না।
২০২৪ সাল বিশ্বের জন্য খুব কঠিন বছর হতে চলেছে বলে পূর্বাভাস আছে। এর জন্য অনেকে পশ্চিমা দেশগুলোর দিকেই আঙুল তুলছেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সর্বনাশা সময়ের সূচনা করেছে তারাই। আজকের পরস্পর নির্ভরশীল ও আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে কোনো একটি অঞ্চল বা লোকালয়ে দুর্ভোগ নেমে এলে তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বময়। অর্থাত্, কোনো অন্যায়, অবিচার ধামাচাপা দেওয়াটা কেবল কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভবও। আমরা দেখে আসছি, একটু আগে কিংবা পরে হলেও প্রতিটি সহিংসতার রেশ বয়ে যাচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বিশ্বের প্রতিটি দেশ নতুন নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে তো প্রতিটি দেশই একটা সময়ে শিকারে পরিণত হবে। কাজেই সহিংসতার বৃত্ত ভাঙতে ব্যর্থ হবে। বিশ্বের সরকারগুলোকে অবিলম্বে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার জোর চেষ্টা করতে হবে। বৈশ্বিক নিয়মনীতিকে সম্মানের চোখে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করা উচিত পশ্চিমা বিশ্বের। নিজের স্বার্থেই পশ্চিমা রাজনীতির স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা অতি জরুরিও বটে। এটাই যৌক্তিক বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যকে কীভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়, তা-ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে আজেকের দিনে এটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: তুরস্কের আংকারা ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক। ‘ইনসাইট টার্কি’র প্রধান সম্পাদক।
ডেইলি সাবাহ থেকে ভাষান্তর: সুমৃত খান সুজন