‘মাঞ্জা’ দেওয়া ঘুড়ির সুতা কাটাকাটিতে মেতেছে সাকরাইন

নানা আয়োজনে পুরান ঢাকায় উদযাপিত হয়েছে সাকরাইন উৎসব। বরাবরের মতো ঐতিহ্য ধরে রেখে ‘মাঞ্জা’ দেওয়া ঘুড়ির সুতায় এক জন আরেক জনের ঘুড়ি কাটাকাটিতে আনন্দে খুঁজে নিয়েছেন এখানকার স্থানীয়রা। উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ১৫ হাজার ঘুড়ি বিতরণ করেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ উৎসবে শামিল হয়েছে সবাই। সাকরাইনকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার এলাকার অধিকাংশ বাসাবাড়ির ছাদগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করেছে। ঘুড়ি উড়িয়ে, আতশবাজি ফাটিয়ে ও গান বাজিয়ে আনন্দ উল্লাস করেছেন তারা। সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে সার্বজনীন ঢাকার উৎসবের রূপ নিয়েছে সাকরাইন।

রিয়াসাত নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আমরা সাকরাইনকে ঘিরে ব্যাপক আনন্দ-উল্লাস করি। সারা দিন ঘুড়ি উড়ানো, বাড়ির ছাদে জমকালো আলোকসজ্জা, আগুন নিয়ে খেলা, সন্ধ্যায় বর্ণিল আতশবাজি ও ফানুস উড়ানো এই উৎসবের অংশ। সবচেয়ে মজা হচ্ছে মাঞ্জা দেওয়া ঘুড়ির সুতা কাটাকাটিতে। যে বেশি ঘুড়ির সুতা কাটতে পারে সেই সাকরাইনের রাজা।

রবিবার বিকালে ধুপখোলা মাঠে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃক আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন/ঘুড়ি উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাদসিক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ তাপস বলেন, ‘ঘুড়ি উৎসব বা সাকরাইন উৎসব ঢাকার প্রাচীনতম ঐতিহ্য। এই উৎসব উদযাপনে আমরা গেন্ডারিয়ার ঐতিহ্যবাহী ধূপখোলা মাঠে সমবেত হয়েছি। আপনারা লক্ষ করছেন, গেন্ডারিয়াসহ ঢাকার আকাশ আজ ঘুড়িতে ছেয়ে গেছে। আমরা চাই, আমাদের তরুণেরা, আমাদের সন্তানেরা ঐতিহ্যকে ধারণ করবে। তারা সারা বছর ঘুড়ি ওড়াবে এবং ছাদ-মাঠসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করবে।’

পুরান ঢাকার সূত্রাপুর, নবাবপুর, শ্যামবাজার, ধূপখোলা, শাখারীবাজার, তাঁতীবাজার, লক্ষ্মীবাজার, ফরাশগঞ্জ, সদরঘাট, গেন্ডারিয়া, নারিন্দা, লালবাগ, চকবাজার, মুরগিটোলা ও ধোলাইখাল এলাকা জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছিল সাকরাইনের আমেজ।

এসব এলাকার দোকানগুলোতে শোভা পেয়েছে রং-বেরঙের ঘুড়ি। এসব ঘুড়িরও রয়েছে বাহারি সব নাম। চোখদার, রকদার, গরুদার, ভোমাদার, কাউঠাদার, ফিতালেঞ্জা, একরঙা, চানতারা, সাপঘুড়ি, প্রচাপতি, প্যাঁচা ও বাক্সসহ নানান নামের ঘুড়ি বিক্রি হয়েছে দোকানে।

সাকরাইন উত্সবের ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায়, ‘সাকরাইন’ শব্দটি সংস্কৃত শব্দ সংক্রান্তি থেকে এসেছে। যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘বিশেষ মুহূর্ত’। অর্থাৎ বিশেষ মুহূর্তকে সামনে রেখে যে উৎসব পালিত হয় তাকেই বলা হয় সাকরাইন। এই সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনেক দেশেই এই উৎসব পালন করে। তবে ভিন্ন ভিন্ন নামে। বাংলায় দিনটি পৌষ সংক্রান্তি এবং ভারতীয় উপমহাদেশে মকর সংক্রান্তি নামে পরিচিত।

ইতিহাস থেকে আরও জানা যায়, ১৭৪০ সালের এই দিনে মোগল আমলে নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের আমলে ঘুড়ি ওড়ানো হয়। সেই থেকে এই দিনটি কেন্দ্র করে বর্তমানে এটি একটি অন্যতম উৎসব ও আমেজের পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ না রেখে সবাই এই উৎসব পালন করে থাকেন। দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালন করেন পুরান ঢাকাইয়ারা।