চীনবিরোধীর জয়
শনিবার তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির (ডিপিপি) প্রার্থী লাই চিং-তে জয়ী হয়েছেন। তিনি ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। তিনি তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বকে টিকিয়ে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেন, চীনের ক্রমাগত হুমকি এবং ভীতি থেকে তাইওয়ানকে রক্ষা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি তাইওয়ান প্রণালিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখবেন। লাই বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমারা জানাতে চাই, গণতন্ত্র এবং কর্তৃত্ববাদ এই দুইয়ের মধ্যে আমরা গণতন্ত্রকেই বেছে নেব। নির্বাচন নিয়ে চীনের আপত্তি থাকলেও বিরোধী দলগুলোও নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল মেনে নিয়েছে। তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী নেতা হো ইয়ু-ইগ ফলাফল প্রকাশের পর লাই চিং-তেকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
সংকট বাড়বে
নেট লিনের মতে, যে কোনো সময় যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। সেজন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি। তিনি বলেন, চীন আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপান যে শেষ পর্যন্ত সহায়তা করবে এমন নিশ্চয়তা নেই। স্বাধীনতাপন্থি এবং চীনবিরোধী হিসেবে পরিচিত নেতার জয়ের ফলে চীনের সঙ্গে তাইওয়ান সম্পর্ক কোনদিকে মোড় নেবে, তা বলা মুশকিল। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রভাব বিবেচনায় এবারের তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। আগের মতোই নতুন বছরের শুরুতেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের পুনরেত্রীকরণ অনিবার্য। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কারো সঙ্গে কোনো আপস হবে না। তিনি বলেন, তাইওয়ান চীনের অংশ। এটাকে কেউ আলাদা করতে পারবে না। শি বলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান সম্ভব না হলে সামরিক হামলা চালিয়েই তাইওয়ানকে মূল ভূমির সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
শনিবারের নির্বাচনের পর চীনের তাইওয়ান বিষয়ক মুখপাত্র চেন বিনহুয়া কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তাইওয়ানের নির্বাচন এবং এতে কে জিতলো বা হারল তাতে চীনের কৌশলের কোনো পরিবর্তন হবে না। তার মতে, তাইওয়ান হচ্ছে চীনের তাইওয়ান। তিনি বলেন, তাইওয়ানকে পুনরেত্রীকরণে চীনের অঙ্গীকার পাথরের মতোই কঠিন। তিনি জানান, বেইজিং এক চীন নীতিতেই আছে। তাইওয়ানের স্বাধীনতার নামে কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না। নির্বাচনের আগেই চীন লাই চিং-তেকে ভয়াবহ ও বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছিলন, তার জয়ই শান্তি নাকি যুদ্ধ—তা নির্ধারণ করবে।
টনি চেং নামে তাইওয়ানের সাংবাদিক জানান, তাইওয়ানের বাসিন্দাদের মনোভাবটা এমন যে তাইওয়ান যা কিছুই করুক না কেন তাতে চীনের মনোভাব বদলাবে না। চীন তার নীতিতেই অটল থাকবে। লাই চিং-তে শর্তসাপেক্ষে চীনের সঙ্গে আলোচনায় যেতে রাজি। তবে বেইজিং সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি জানান, চীন এটাও বলেছিল যে লাই চিং-তেকে ভোট দেওয়ার অর্থ যুদ্ধের পক্ষে ভোট প্রদান। তাই তাইওয়ান যুদ্ধ শুরু হলে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে তছনছ করে দিতে পারে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশই চিপের জন্য বিকল্প বাজার খোঁজার চেষ্টা চালাচ্ছে।
এই নির্বাচন তাইওয়ানকে যে সংকটে ফেলে দিতে পারে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও চিন্তিত। নির্বাচনের ফলাফলের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। বাইডেন প্রশাসনের আশঙ্কা, নির্বাচন, ক্ষমতা হস্তান্তর এবং নতুন প্রশাসন চীনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে ইউক্রেন যেমন, তাইওয়ান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কাছেও তেমন গুরুত্বপূর্ণ।
তাইওয়ান আত্মরক্ষায় সক্ষম?
প্রতিরক্ষা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তির ক্ষেত্রে, চীনের কাছে তাইওয়ান নগণ্য। তাই চীন তাইওয়ান আক্রমণ করলে তা দখল করায়ও সফল হয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে যদি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পরাশক্তি এখানে হস্তক্ষেপ না করে। চীনের সামরিক শক্তির মূল ফোকাস যদিও অন্যদিকে, কিন্তু যদি সব মিলিয়ে সক্রিয় সেনা সদস্যের সংখ্যা ধরা হয়, তাহলে দুই দেশের মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য পাওয়া যায়। কিন্তু তার মানে এই না যে তাইওয়ানের যথেষ্ট অস্ত্র নেই বা তারা সম্পূর্ণ একা। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৯ সালে তাইওয়ান থেকে চীনকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিলেও তারা তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্টের আওতায় নিয়মিত এই দ্বীপরাষ্ট্রের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে এসেছে। ২০২৩ সালের জুলাইতে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের কাছে প্রায় ৩৪৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের অস্ত্র সহায়তার বিবরণ প্রকাশ করে। আর বছর শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে আরো ৩০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের যন্ত্রপাতি বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। ২০২২ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়—যুক্তরাষ্ট্র কি তাইওয়ানকে সামরিকভাবে রক্ষা করবে, তিনি এর উত্তর দেন হ্যাঁ। পরে অবশ্য হোয়াইট হাউজ পরিষ্কার করেছে যে ওয়াশিংটন তাদের ‘এক চীন নীতি’ থেকে সরে আসেনি। তবে চীনও যুক্তরাষ্ট্রের পর সামরিক খাতে সবচেয়ে বেশি অর্থব্যয় করে এবং নৌবাহিনী থেকে মিসাইল, যুদ্ধবিমান বা সাইবার হামলা সবকিছুতেই সামর্থ্যের প্রমাণ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
তাইওয়ান সারা বিশ্বের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘ তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং সারা বিশ্বের মাত্র ১২টি দেশ এই স্বীকৃতি দিয়েছে (প্রধানত দক্ষিণ অ্যামেরিকা, ক্যারিবীয় ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশ)। বিশ্বের বেশির ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি যা আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করি—ফোন থেকে ল্যাপটপ, ঘড়ি, গেম কনসোল—এসবই তাইওয়ানের তৈরি কম্পিউটার চিপসের সাহায্যে চলে। এদিক থেকে তাইওয়ানের শুধু একটা কোম্পানি দ্য তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফাকচারিং কোম্পানি বা টিএসএমসি-সারা বিশ্বের অর্ধেক বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। টিএসএমসিকে তাই বলা হয় ফাউন্ড্রি যা এমন কোম্পানি যারা চিপস ভোক্তা ও সামরিক ক্রেতাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা একটা বিরাট বড় শিল্প, ২০২১ সালের হিসেবে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ, চীন যদি তাইওয়ানের দখলে যায়, তাহলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পের নিয়ন্ত্রণ পাবে বেইজিং। কারণ, তাইওয়ানের চিপের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্র। ইউএন কমট্রেড ডেটা অনুযায়ী, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে তাইওয়ান। যার বেশির ভাগই ছিল তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যনির্ভর। এদিকে চিপ উত্পাদনে চীনের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে তাইওয়ান।
তাইওয়ানের এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের ফলাফল চীনের সঙ্গে দ্বীপরাষ্ট্রটির সম্পর্কে বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং একই সঙ্গে এই পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়াতে পারে ও সারা বিশ্বের অর্থনীতিকেই প্রভাবিত করতে পারে।