শীত ও রাজনীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। একটির সঙ্গে অন্যটির বৈধ ও যৌক্তিক কোনো সম্পর্ক নেই। শীত হচ্ছে প্রকৃতির খেলা। আর রাজনীতি হলো রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীদের ক্ষমতায় যাওয়া অথবা ক্ষমতায় টিকে থাকার কলাকৌশল। একে প্রহসনও বলা যেতে পারে। শীত আসে আবার শীত চলেও যায়। কিন্তু রাজনীতির প্রহসন শেষ হয় না। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ ধরে তা চলতেই থাকে। আমাদের দেশটা হচ্ছে অসম্ভবের দেশ। কেউ কেউ সব সম্ভবের দেশও বলে থাকেন। যা হওয়া উচিত নয়, সম্ভব নয়, বাঞ্ছিত নয়—এমন ঘটনাই এখানে বেশি বেশি ঘটে। আবার যা স্বাভাবিক, সংগত, কাঙ্ক্ষিত—এমন অনেক কিছুই এখানে ঘটে না। তার পরও দেশটা টিকে আছে। আমরাও টিকে আছি। বাংলাদেশ সত্যিই বিশ্বের বিস্ময়!
শীত আমাদের যতই শীতল ও শীতার্ত করুক না কেন, এ নিয়ে তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা, তোলপাড় বা লেখালেখি হয় না। অথচ রাজনীতি নিয়ে আমাদের দেশে কী তোলপাড়ই না হয়! জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে মাত্র কয়েক দিন। অথচ এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, শঙ্কা, ভয় এখনো কাটেনি। এই নির্বাচন কতটুকু ভালো হয়েছে, কতটুকু খারাপ হয়েছে, তা নিয়ে এখনো বাদানুবাদ চলছে। পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচন নিয়ে তাদের অসন্তোষের কথা জানিয়ে দিয়েছে। আবার ভারত, চীন, রাশিয়ার মতো বাংলাদেশের মিত্র দেশগুলো নির্বাচন নিয়ে তাদের সন্তোষের কথা বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দিয়েছে। সদ্য শেষ হওয়া নির্বাচনে শতকরা কতভাগ ভোটার ভোট দিয়েছে, তা নির্বাচন কমিশনের কাছে চেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তারা যেন পরীক্ষক। ঠিকঠাকমতো প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেবেন। আমাদের দেশে নির্বাচন কেমন হয়েছে, তাতে কয়জন ভোট দিয়েছে, সেটা নিতান্তই আমাদের ব্যাপার। কিন্তু না, শক্তিধর দেশগুলো আমাদেরকে নিজের মতো থাকতে দেয় না। তারা তাদের মতো করে সবকিছু দেখতে চায়। তাই তো তাদের নানা প্রশ্ন, সওয়ালের জবাব দিতে হয়। ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’ শিল্পী যতই চিত্কার করে বলুক না কেন, বর্তমান জমানায় তা আসলে সম্ভব নয়।
এবারের শীতের ঋতুতে পশ্চিমা দেশগুলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কি না, সেই শঙ্কা নিয়ে সবাই দিন কাটাচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের তাই জয় করেও ভয় যায়নি। পশ্চিমা দেশগুলোর তরফ থেকে যদি সত্যি সত্যি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়, তাহলে বাংলাদেশের হাতে হারিকেন। সেই সংকট কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না।
যাহোক, শীতকালকে আমরা যত উপেক্ষাই করি না কেন, এ সময় রাজনীতি কিন্তু বেশ জমে ওঠে। রাজনীতির ভরা জোয়ার বা তেজকটাল বলা যায় এই শীতকালকে। আমাদের জাতীয় জীবনের সব তাত্পর্যময় দিবসও এ শীতকালেই। ১৬ ডিসেম্বর, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ—সবই হচ্ছে শীতকালীন ঘটনা। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানও সংঘটিত হয়েছে শীতকালেই। আসলে শীতকালে এ দেশের মানুষের মধ্যে একধরনের তেজ চাড়া দিয়ে ওঠে। এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে শীতের সবজি। নানা জাতের, নানা স্বাদের বিচিত্র টাটকা সবজি খেয়ে শরীরের মধ্যে এক ধরনের টগবগে ভাব আসা স্বাভাবিক। আর শরীরে তেজ থাকলে, তেল থাকলে তা বের হবেই। এই তেজের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আন্দোলন, মানি না মানব না—ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়।
শীতকালটা অবশ্য উপভোগেরও কাল। একবার শীতের শাকসবজির কথা ভাবুন। স্বর্গের মন-কেমন করা ‘ঊর্বশী’র মতো ধবধবে ফুলকপি, আঁটোসাঁটো নববধূর মতো বাঁধাকপি, ঘুষখোর ট্রাফিক সার্জেন্টের পাটকরা পোশাকের মতো চকচকে শিম, কুমারীর রাঙা ওষ্ঠের মতো টকটকে লাল ট্যামেটো, কিশোরীর রাঙা স্বপ্নের মতো সুন্দর সুন্দর গাজর, সুলতানের আঁকা স্বাস্থ্যবান ছবির মতো ঢাউস-ঢাউস বেগুন আর হালকা সবুজ কচি লাউ, সাদায় মেশানো রাক্ষুসে সাইজের মুলা, পালঙ্কে রাখার মতো গাঢ় সবুজ পালংশাক, সাপের মতো লকলকে লাউডগা আরো কত কী!
কই মাছ দিয়ে ফুলকপির তরকারি, চিংড়ি মাছ দিয়ে লাউ বা বাঁধাকপির ঘণ্ট, আলু-বেগুন-শিম-কপি সহযোগে পাঁচফোড়ন দেওয়া তরকারি, ডালের বড়াসহ মাগুর কিংবা বোয়াল মাছের হালকা ঝোল, ধনিয়াপাতা কাঁচা মরিচ সহযোগে ফুলকপির সঙ্গে বেসন মিশিয়ে বড়া, সরষেফুলের বড়া, পেঁয়াজু, বেগুনি, গরম মুড়ি, মাদকতা মেশানো খেজুররস ও খেজুরগুড়, নানা জাতের পিঠা, হাঁস বা সেদ্ধ ডিম—এমনি অসংখ্য উপাদেয় খাদ্যসুখ আমাদের ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’ উচ্চারণ করতে উত্সাহিত করে। আসলে শীতকালটা হচ্ছে সুখের কাল, উপভোগের কাল (দরিদ্রদের জন্য নয়, অবশ্যই। তাদের নিয়ে এ দেশে কেউ কি ভাবে? তাদের জন্য এ লেখাও নয়)! শীতের রাতে চিকেন ফ্রাই, একটু নেশাজাতীয় পানীয়, বেগম আক্তারীর ঠুমরি, নরম-গরম বিছানা আর প্রিয়জনের সান্নিধ্য—এর চেয়ে সুখ, এর চেয়ে কাঙ্ক্ষিত আর কী হতে পারে?
আমাদের দেশে শীতের রাজনীতি আছে, তবে শীতকে নিয়ে রাজনীতি এখনো শুরু হয়নি। বন্যার সময় যেমন বলা হয় ‘ভারতীয় বন্যা’, শীতকে তেমনভাবে ভারতীয় বা পাকিস্তানি শীত বলার প্রবণতা এখনো শুরু হয়নি। তবে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের যে স্বভাব, তাতে অচিরেই হয়তো শীতকে নিয়ে রাজনীতি শুরু হওয়াটাও বিচিত্র নয়। বিএনপি-জামায়াতপন্থিরা বলবে, এই শীত আওয়ামী সরকারের সীমাহীন অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও লুটপাটেরই ফল। তারা আরো বলবে, এই শীত ভারতীয় শীত, ঐ প্রতিবেশী দেশটি ষড়যন্ত্র করে তাদের দেশীয় এজেন্ট ক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে এ অবৈধ শীতকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। এই শীত দিয়ে তারা বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতে চায়। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা জানে না, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি ভবিষ্যতে এমন আন্দোলন গড়ে তুলবে যে, শীত ও কারচুপির নির্বাচনে জয়ী সরকার পালাবার পথ পাবে না। পক্ষান্তরে ক্ষমতাসীনরা বলবে, এই শীত জামায়াত-বিএনপিওয়ালাদের ষড়যন্ত্রেরই অংশ। এর মধ্যে নোবেলবিজয়ী কারো কারো কারসাজি আছে। এটা ক্ষমতাসীনদের উন্নয়নের রাজনীতিকে ব্যাহত করার একটা চক্রান্ত। একটি মহল শীতের ধুয়া তুলে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু জনগণ তা হতে দেবে না। আমরা যে কোনো মূল্যে এই ষড়যন্ত্রের শীতকে বিদায় করব। প্রয়োজনে ভারত থেকে উষ্ণতা আমদানি করব।
শীতের যেমন অনেক সুখের উপকরণ আছে, আবার অনেক কু-উপসর্গও আছে। শীতের প্রধান তিনটি উপসর্গ হচ্ছে, অকারণ উত্তেজনা, ডিপ্রেশন ও চুলকানি। শীতকালীন বিভিন্ন উপাদেয় খাদ্য ও শীতের পোশাকের কারণে নানা বিপত্তি ঘটে। শীতকালে আমাদের অনেক ভারী ভারী গরম পোশাক পরতে হয়। এর দু-একটা গায়ে চাপালে তালপাতার সেপাইকেও রেসলিংয়ের ফাইটারদের মতো মনে হয়। এ অবস্থায় শরীরে বাড়তি উত্তেজনা দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। চুলকানির উত্সও মোটামুটি একই, অর্থাত্ ঐ শীতবস্ত্র। পরচর্চায় অভ্যস্ত আমাদের শরীরে সারা দিন এসব ‘বিজাতীয়’ শীতবস্ত্রের আচ্ছাদন থাকার কারণে পোশাকও একসময় পরচর্চা শুরু করে। আর তাই চুলকানি দেখা দেয়। আবার কুয়াশাঘেরা দিনে স্থবির বসে থেকে অনেকের মনে একধরনের ডিপ্রেশন দেখা দেয়। টাটকা শাকসবজির উত্তেজনা, বিজাতীয় শীতবস্ত্রের চুলকানি, আর কুয়াশা মাখানো দিনের ডিপ্রেশন—এই তিনে মিলে শীতকালে রাজনীতির ময়দান অকারণেই গরম হয়ে ওঠে। আন্দোলন, ক্ষমতা থেকে ফেলে দেওয়ার হুমকি, ক্ষমতা না ছাড়ার দম্ভ, উলটাপালটা কথা, অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা, নৈরাজ্য ইত্যাদি হয়তো শীতকালীন চর্মরোগ ও উত্তেজনারই বহিঃপ্রকাশ।
আজ থেকে বহু বছর আগে এক শীতপ্রধান দেশের মহাকবি লিখেছিলেন :‘শীতের বাতাস তুমি বও, তুমি বও/ মানুষের অকৃতজ্ঞতার মতো তুমি নির্দয় নও।’ কবি সেই দেশের মানুষ ছিলেন। সে মানুষের মধ্যে অকৃতজ্ঞতাও ছিল, যা নিয়ে কবি ক্ষুব্ধ কবিতা লিখেছিলেন। আমাদের দেশে আপাতত ভয়ানক শীত নেমে এলেও এ শীতার্ত মানুষগুলোকে নিয়ে কোনো কান্না নেই, নেই কোনো তত্পরতা।
আমাদের দেশে শীত আসে, নির্বাচন আসে, আবার তা চলেও যায়। কিন্তু গরিব মেহনতি মানুষের ভাগ্য বদলায় না। তাদের জীবনে শুধু শীত, কেবলই শীতের প্রকোপ। শীতের কশাঘাতে তাদের জীবন জর্জর। তাদের জীবনে কোনো গরম বা উত্তাপের প্রস্তাব নেই। নেই শীতের সবজি কিংবা শীতের পোশাক। তাই তাদের কোনো উত্তেজনাও নেই, চুলকানিও নেই। কোটরাবদ্ধ ব্যাঙের মতো গুটিশুটি মেরে কোনোরকমে নিশ্চুপ তাদের বেঁচে থাকা!
লেখক: রম্যরচয়িতা