ইসির সিদ্ধান্তের আগেই নিয়ম ভেঙে ইত্তেফাক সম্পাদকের নামে মামলা

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত প্রদানের ১৩ দিন আগেই নিয়ম ভেঙে তড়িঘড়ি করে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া থানায় মামলা দায়েরের ঘটনা ঘটেছে। অতি উত্সাহী হয়ে ইসির সিদ্ধান্ত ছাড়াই স্থানীয় প্রশাসনের মামলার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি একপ্রকার জোর করে ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসারকে ইত্তেফাক সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য করা হয়েছে। এই আইনবহির্ভূত কাজটি করেছেন পিরোজপুরের রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ইত্তেফাককে জানান, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে তিনি মামলা করার জন্য উপজেলা নির্বাচন অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ইসি বলছে, জেলা প্রশাসককে মামলা করার বিষয়ে ভোটের আগে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

নির্বাচন কমিশনের অনুমতি ছাড়া মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ ইত্তেফাককে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ছাড়া রিটার্নিং অফিসার মামলা করার সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। এটি বেআইনি। অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন শুধু নির্বাচন কমিশন খতিয়ে সিদ্ধান্ত দেবে মামলা করা যাবে কি যাবে না। অন্য কোনো সরকারি কর্মকর্তার নির্দেশনায় মামলা করার সুযোগ নেই।’

জানা গেছে, ইসির উপসচিব মো. আব্দুছ সালাম স্বাক্ষরিত মামলা করা সংক্রান্ত চিঠি গতকাল বৃহস্পতিবার ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসারকে দেওয়া হয়েছে। ঐ চিঠিতে বলা হয়, নির্দেশিত হয়ে জানানো যাচ্ছে যে, পিরোজপুর-২ নির্বাচনি এলাকার নৌকার প্রার্থী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর স্ত্রী তাসমিমা হোসেন গত ২২ ডিসেম্বর গৌরপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের এক নির্বাচনি জনসভায় জেলা পরিষদের সংরক্ষিত সদস্য রোকেয়া বেগমের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন মর্মে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি নির্বাচন কমিশনে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৭৩ এবং সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা-২০০৮-এর বিধি ১৮-এর অধীন সংশ্লিষ্ট থানায় এজাহার দায়ের করার জন্য নির্বাচন কমিশন গত ৭ জানুয়ারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এমতাবস্থায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বর্ণিত অভিযোগে অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট থানায় এজাহার দায়ের করার জন্য অনুরোধ করা হলো।

অথচ বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন থেকে এই চিঠি যাওয়ার আগেই গত ৫ জানুয়ারি একই অভিযোগে ভাণ্ডারিয়া থানায় সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। উপজেলা নির্বাচন অফিসারকে মামলা করতে বাধ্য করেন পিরোজপুর জেলা রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক। তিনি ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসারকে ঐ দিনেই মামলা করতে লিখিত নির্দেশনা দেন।

ডিসি যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন: গত ৫ জানুয়ারি পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১২৮ পিরোজপুর-২ আসনে বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন (বিটিএফ) মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচনি এজেন্ট মো. এহসাম হাওলাদার, রোকেয়া বেগম, সংরক্ষিত সদস্য (মঠবাড়ীয়া-ভাণ্ডারিয়া), জেলা পরিষদ, পিরোজপুর ও বাংলাদেশ কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী মো. ছগির মিয়া কর্তৃক সংশ্লিষ্ট আসনে জাতীয় পার্টি-জেপির প্রার্থী আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী বেগম তাসমিমা হোসেন কর্তৃক নির্বাচনি জনসভায় উসকানিমূলক মানহানিকর বক্তব্যের বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর তিনটি অভিযোগ দাখিল করা হয়। সে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১ নম্বর সূত্রোক্ত স্মারকে নিম্নস্বাক্ষরকারীকে অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে সত্যতা যাচাইপূর্বক প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১১ক অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় হতে জারিকৃত পরিপত্র-৫ মোতাবেক সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮-এর আলোকে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ২ নম্বর সূত্রোক্ত স্মারকে সংশ্লিষ্ট ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটির নিকট প্রেরণ করা হয়। ইতিমধ্যে রোকেয়া বেগম, সংরক্ষিত সদস্য (মঠবাড়ীয়া-ভাণ্ডারিয়া), জেলা পরিষদ, পিরোজপুর সংশ্লিষ্ট ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটির (নির্বাচনি এলাকা-১২৮ পিরোজপুর-২) নিকট অভিযোগ দাখিল করলে ইনকোয়ারি কমিটি অভিযোগের বিষয়ে তদন্তপূর্বক গত ৩ জানুয়ারি জেলা নির্বাচন অফিসার, পিরোজপুর-এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন বরাবর প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। প্রতিবেদনে চেয়ারম্যান, ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি (নির্বাচনি এলাকা-১২৮ পিরোজপুর-২) সুপারিশ প্রদান করে যে, তাসমিমা হোসেন অভিযোগকারী রোকেয়া বেগমের বিষয়ে নির্বাচনি প্রচারণাকালে ব্যক্তিগত চরিত্রহনন করে বক্তব্য প্রদান করেছেন মর্মে উল্লেখ করে তার এই বক্তব্যে তিনি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৭৩, ৩(ক) এবং সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮-এর ১১ (ক)(গ) ধারার লঙ্ঘন করেছে মর্মে উল্লেখ করেন এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে মর্মে সুপারিশ করেন। এমতাবস্থায়, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ও ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি কর্তৃক প্রদত্ত সুপারিশের আলোকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ ৭৩ ও সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮ এর ১১ (ক) এর বিধান মতে মামলা দায়ের করার প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।’

ডিসির নির্দেশে মামলা: ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রিটার্নিং অফিসারের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক কোনো ধরনের চিঠি প্রেরণ করা হয়নি। মামলার এজাহারে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ভাণ্ডারিয়া থানায় হাজির হয়ে এই মামলা দায়ের করলাম। এজাহারে বলা হয়, রোকেয়া বেগমের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি অবগত হয়ে নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটির অনুসন্ধানে উক্ত ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করে। উক্ত বিবাদী তাসমিমা হোসেন ঈগল প্রতীকের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করে বিদ্রুপাত্মক বক্তব্য প্রদান করেছেন যা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এর অনুচ্ছেদ ৭৩, ৩(ক) এবং সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ১১(ক) (গ) এর বিধান লঙ্ঘন বিধায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট ধারায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ইসির অনুমতি ছাড়া মামলা নয়: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছে, নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদন পাঠাতে হবে ইসিতে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১-এর বিধান অনুযায়ী নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম সংক্রান্তে অনুসন্ধান করে কমিশনের করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ অনুসন্ধানের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন। এই আদেশের ৯১এ (৬সি)-এর বিধান অনুযায়ী নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি কর্তৃক প্রেরিত অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বর্ণিত সুপারিশ বা প্রস্তাবের আলোকে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বা প্রার্থীকে প্রয়োজনীয় আদেশ বা নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন। তবে ইসির অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি মামলা করতে পারেন না।

অনুসন্ধান কমিটির ক্ষমতা: পরিপত্র-৫-এ  দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে ‘নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম’ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকল্পে পঠিত নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটিসমূহের কর্মকর্তাগণের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা আছে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে প্রত্যেক নির্বাচনি এলাকার অন্য একজন যুগ্ম জেলা জজ বা সিনিয়র সহকারী জজের সমন্বয়ে সারা দেশে ৩০০টি নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে। নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি নিম্নবর্ণিত নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম সংক্রান্ত অনুসন্ধান করে তত্সংক্রান্তে কমিশনের করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব বা সুপারিশসহ অনুসন্ধানের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে প্রতিবেদন প্রেরণ করবেন।

উক্ত নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি তত্কর্তৃক প্রাপ্ত তথ্য বা তার নিকট দাখিলকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে, বা স্বীয় উদ্যোগে বর্ণিত ‘নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম’ সংক্রান্ত বিষয়সমূহ বা ঘটনাসমূহ অনুসন্ধান করতে পারবেন। এমনকি উক্ত ‘নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম’ সংক্রান্ত অভিযোগ ও ঘটনা নির্বাচন কমিশন/রিটার্নিং অফিসার/সহকারী রিটার্নিং অফিসার/নির্বাচনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা কর্তৃক কমিটির নিকট প্রেরিত হলে উক্ত কমিটি তা অনুসন্ধানপূর্বক প্রতিবেদন কমিশনের নিকট প্রেরণ করবেন। অনুসন্ধান কমিটি কোনো ব্যক্তিকে এর সম্মুখে হাজির হতে ও শপথপূর্বক সাক্ষ্য প্রদানে এবং কমিটির নিকট প্রয়োজনীয় দলিল বা বস্তু দাখিল করতে কোড অব সিভিল প্রসিডিউর, ১৯০৮-এর অধীন দেওয়ানি আদালতের ন্যায় একই ক্ষমতাবান হবেন। বর্ণিত কমিটির কার্যক্রম দণ্ডবিধির ১৯৩ ও ২২৮ ধারায় বর্ণিত বিচারিক কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হবে।

বর্ণিত নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটি কর্তৃক দায়িত্ব পালনকালে উপরিউক্ত নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম সংঘটিত হলে তা অনুসন্ধানপূর্বক তত্মর্মে প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন অফিসারের নিকট প্রেরণ করবেন এবং সংশ্লিষ্ট জেলা নির্বাচন অফিসার উক্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদন সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় বরাবর প্রেরণ করবেন এবং অতিসত্বর উক্ত প্রতিবেদন পিডিএফ ফরমেটে অত্র সচিবালয়ের আইন অনুবিভাগের উপসচিব (লিগ্যাল এফিয়ার্স) ও সিনিয়র সহকারী সচিব (আইন বিষয়ক-১)-এর ইন্টারনাল অ্যাকাউন্টে প্রেরণ করবেন।