খেজুরের রসে কেমিক্যাল মিশিয়ে ‘হাজারি গুড়’!

মানিকগঞ্জের প্রাণের সুর-‘বাউল গান আর ঝিটকার হাজারি গুড়’। সরকারি ব্র্যান্ডের এ ঐতিহ্য যেন ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে। এর মধ্যে নানা কারণে ঐতিহ্য হারাচ্ছে ঝিটকার এ গুড় ।

শীতে বাহারি খাদ্যরসনায় অন্যতম উপাদান হচ্ছে খেজুরের গুড়। বিশেষ করে পিঠাপুলি তৈরিতে এ গুড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। শীতের শুরুতে মানিকগঞ্জের শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলা জুড়ে গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস আহরণ করছেন। ইতিমধ্যে পুরোদমে রস আহরণ করে গুড় তৈরি শুরু করেছেন অনেকেই। এ এলাকার হাজারি গুড়ের কদর সারা দেশসহ বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এ গুড়ের নামকরণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দুটি গল্প প্রচলিত আছে। এর মধ্যে একটি দৈবশক্তিসম্পন্ন কোনো এক দরবেশ ও অন্যটি রানি এলিজাবেথকে ঘিরে। ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ এই গুড় খেয়ে মুগ্ধ হয়ে হাজারি নামের সিলমোহর বানিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ ভেজাল গুড়ের ডামাডোলে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী হাজারি গুড়।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বেশি লাভের আশায় অসাধু গাছিরা খেজুরের রসে চুন, হাইড্রোজ, ফিটকিরি, নুচা গুড়, আখের গুড়, পামওয়েল, সোডা, স্যাকারিন, কেমিক্যাল ও চিনিসহ বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে ভেজাল গুড় তৈরি করছেন। চলছে পুরোদস্তর বাণিজ্য। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ। জানা গেছে, জেলার সবচেয়ে বেশি খেজুরের গুড় উত্পাদিত হয় শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলায়। তবে কি পরিমাণ খেজুরেরবাগান বা গাছ রয়েছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই কৃষি অফিসে। কৃষি অফিস বলছে, প্রতিবছর নতুন নতুন খেজুর গাছের জন্ম হচ্ছে। আবার চাষিরা পুরোনো গাছ কেটে ফেলছেন।

শিবালয় এলাকার গাছি মজিবর হোসেন বলেন, ‘এখন বাজারে যে গুড় কেনাবেচা হয়, তার মধ্যে দুই-একটি বাদে সব গুড়েই ভেজাল রয়েছে। এটা গত কয়েক বছর থেকে শুরু হয়েছে। চিনির দাম কম ও খেজুরের গুড়ের দাম বেশি হওয়ায় গাছিরা গুড়ে ব্যাপক হারে চিনি ও কেমিক্যাল মেশাচ্ছে। এছাড়া আরো কয়েকটি উপকরণ রয়েছে. যা মেশালে গুড় দেখতে সুন্দর দেখায় ও শক্ত থাকে। 

শিবালয় উপজেলা বরংগাইল হাটের গুড়ের আড়ত্দার, তাপস, কাইয়ুম ও মোসলেম বলেন, এ অঞ্চলের খেজুরের গুড় দেশবিদেশে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তারা সরাসরি গাছির কাছ থেকে কিনে প্যাকেটজাত করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে থাকেন। তবে গুড়ে তারা কি ভেজাল মিশ্রিত করেন, তা তারা জানেন না। 

মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ পরিচালক আবু মো. এনায়েত উল্লা জানান, ‘জেলায় উল্লেখযোগ্য কোনো খেজুরগাছ চাষি নেই। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী হাজারি গুড়ের নামে ভেজাল গুড় তৈরি করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘শুধু হাটবাজার বা আড়তেই নয়, ভেজাল প্রতিরোধে প্রয়োজনে গুড় উত্পাদনকারী গাছিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হবে।’