এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার টানা চতুর্থ বারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা টানা চতুর্থ বারসহ মোট পাঁচ বার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হলেন। অতীতে বাংলাদেশের আর কোনো রাজনীতিবিদ এতবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হতে পারেননি। সে বিবেচনায় এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অন্যন্য রেকর্ড বটে। তবে আগামী দিনগুলোতে বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। কারণ দায়িত্ব গ্রহণের পরই নতুন সরকারকে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে যেসব চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা তাত্ক্ষণিকভাবে সৃষ্ট কোনো সমস্যা নয়, বরং উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সমস্যা বলা যেতে পারে। এসব সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলার ওপর সরকারের জনপ্রিয়তা অনেকাংশে নির্ভর করছে।
নতুন সরকারকে সবার আগে যে সমস্যাটি মোকাবিলা করতে হবে, তা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রায় বছর দেড়েক ধরে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। একইসঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি বাড়ানো। এই দুটি সমস্যা একটি অন্যটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আবার পরস্পর বিরোধীও বটে। করোনা উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পথে ছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই অসম যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি আবারো বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশ্বের অন্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিটি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিতেও ৪০ বছরের রেকর্ড ভঙ্গ করে মূল্যস্ফীতি ৯.১ শতাংশে উন্নীত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) আর্থিক মন্দার কথা বিবেচনায় রেখেও গত দেড় বছরে তাদের পলিসি রেট ১৩ বার বৃদ্ধি করেছে। একইসঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আরো কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ফলে তাদের উচ্চ মূল্যস্ফীতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুসরণে বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট একাধিকবার বাড়িয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এসব দেশের অধিকাংশই তাদের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সমর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েক বার পলিসি রেট বাড়িয়েছে। কিন্তু তার পাশাপাশি অন্যান্য ব্যবস্থা সঠিকভাবে গ্রহণ না করার ফলে মূল্যস্ফীতি এখনো কমেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ করে এই মুহূর্তে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের ক্রম হ্রাসমান ধারা রোধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর নিট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও কম। মার্কিন ডলারের স্ফীতি ধরে রাখার অন্যতম উপায় হিসেবে আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে আমদানি পণ্যের লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলা নিয়মকানুন কঠোর করা হয়েছে। জুলাই-নভেম্বর সময়ে এলসি খোলার হার কমেছে ১৪.০৬ শতাংশ। এর মধ্যে ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলার হার কমেছে ২৭.৪৭ শতাংশ। ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলার হার হ্রাস পাওয়া ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা যেতে পারে। আমাদের মতো দেশে আমদানি ব্যয় যত কমানো যাবে, ততই ভালো। কিন্তু সব আমদানি ব্যয় হ্রাস পাওয়াটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। বিশেষ করে শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং জ্বালানি আমদানি হ্রাস পাওয়াটা কোনোভাবেই আকাঙ্ক্ষিত নয়। কারণ এগুলোর আমদানি কমে গেলে শিল্পের উত্পাদন কমে যাবে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না, এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে। কিন্তু বর্ণিত সময়ে শিল্পে ব্যবহার্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার হার কমেছে ১৬.৯৮ শতাংশ। কাঁচামাল আমদানিতে এলসি খোলা কমেছে ১১.৬২ শতাংশ। মধ্যবর্তী পণ্য এবং জ্বালানি আমদানিতে এলসি খোলার হার কমেছে যথাক্রমে ৭.৫২ শতাংশ ও ১৬.৭৫ শতাংশ। শিল্প উত্পাদন যে হ্রাস পেতে শুরু করেছে, তার একটি বড় দৃষ্টান্ত হচ্ছে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১০ শতাংশের নিচে। শিল্পে ব্যবহার্য উপকরণ আমদানি হ্রাস কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সুতা উত্পাদনের জন্য বাংলাদেশকে তুলা আমদানি করতে হয়। কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণে তুলা বাংলাদেশে উত্পাদিত হয় না। তৈরি পোশাক শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের তুলা আমদানি করতেই হবে। ঢালাওভাবে আমদানি হ্রাস করে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি বাড়ানো যাবে না। এজন্য অন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
পণ্য রপ্তানির প্রবৃদ্ধি খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। আমাদের পণ্য আমদানি কার্যত তৈরি পোশাকনির্ভর। মোট রপ্তানি আয়ের বৃহত্ অংশই আসে তৈরি পোশাক থেকে। কিন্তু এই খাতটি আমদানিনির্ভর বলে জাতীয় অর্থনীতিতে এর মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়া বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-নির্ভর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত জিএসপি সুবিধা দিচ্ছে। এই সুবিধা কাজে লাগিয়েই বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে প্রচুর পরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি করছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই উন্নয়নশীল দেশের প্রাথমিক তালিকায় উত্তীর্ণ হয়েছে। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ চূড়ান্তভাবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হবার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৯ সাল পর্যন্ত জিএসপি সুবিধা অব্যাহত রাখবে। তারপর এই সুবিধা প্রত্যাহার হবে। তখন জিএসপি+ নামে এক নতুন সুবিধা প্রদান করা হবে। কিন্তু জিএসপি+ সুবিধা পাবার জন্য যেসব শর্ত পরিপালন করতে হবে, বাংলাদেশের পক্ষে তা সম্ভব হবে না। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানি ব্যাপকভাবে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ যদি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্ফীতি ধরে রাখতে চায়, তাহলে অন্য খাতের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আর সেই খাতটি হতে পারে জনশক্তি রপ্তানি খাত। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিশেষ করে রিজার্ভ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। একই সঙ্গে এই খাতটি প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, যাদের বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স অর্জনের মাধ্যমে রেমিট্যান্স আহরণকারী দেশগুলোর মধ্যে সপ্তম স্থানে রয়েছে। গত বছর রেকর্ড পরিমাণ ১৩ লাখ বাংলাদেশি কর্মসংস্থান উপলক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গমন করেছে। জনশক্তি রপ্তানির তুলনায় রেমিট্যান্স আহরণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফিলিপাইনের মতো দেশও বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুন, অর্থাত্ ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করেছে। বাংলাদেশ থেকে যদি প্রশিক্ষিত, দক্ষ এবং পেশাজীবী বিদেশে রপ্তানি করা যেত, তাহলে এ খাতে আয়ের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হতো। কিন্তু বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি খাতটি সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে বিকশিত হচ্ছে। প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের উদাসীনতা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা সাম্প্রতিক সময়ে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ প্রেরণ করছেন বলে বিভিন্ন মহল থেকে অভিমত ব্যক্ত করা হচ্ছে। প্রবাসী আয়ের ওপর সর্বশেষ পাঁচ শতাংশ নগদ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া সত্ত্বেও প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ প্রেরণ করছেন। এজন্য মূলত আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই দায়ী। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক দিন ধরেই স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে অতিমূল্যায়িত করে রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার স্থানীয় মুদ্রায় ১১০ থেকে ১১২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। অথচ কার্ব মার্কেটে প্রতি মার্কিন ডলার ২১ থেকে ২২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় মুদ্রায় বেশি অর্থ পাবার আশায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ দেশে প্রেরণ করছেন। ফলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে কোনোভাবেই বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বাড়ানো সম্ভব হবে না।
লেখক: সাবেক পরিচালক, বিএসটিআই ও বিশিষ্ট উদ্যোক্তা
অনুলিখন: এম এ খালেক